বৌদি উচ্চহাস্য করে উঠলেন। বললেন, বাহ! গৃহিণী না হতেই এমন! আর হলে তো অবস্থা কাহিল।
এমন সময় নোটনকে কোলে ও শিউলিকে হটিয়ে নিয়ে পাশের বাড়ি থেকে ছবি এলো। আমাকে দেখে থেমে পড়ে! বৌদি বলে উঠলেন, এই যে নন্দরানি! তোমার পাত্তাই নেই, এদিকে স্বয়ং উনি এসে বসে আছেন!
যাঃ! ছবির মুখটা আরক্ত হয়ে উঠল, বলল, ক্ষেপিওনা বৌদি! তাহলে কিছছু–
হয়েছে হয়েছে। তোমাকে কিছছু করতে হবে না। একজনকে ধরে রাখতে পারলেই যথেষ্ট!
ছবি জিভ বার করে একটা ভেংচি কেটে ঘরের ভেতরে চলে গেল। বৌদি ডেকে বললেন, ছবি দিদি আমাদের চা খাওয়ানা রে! তোর সব ব্যবস্থা করে দেব দেখি!
যেটুকু বা আশা ছিল তাও নষ্ট করে দিলেন!
না। দেখো ছবি খুব ভালো মেয়ে। আমাদের চা না খাইয়ে থাকতেই পারবে না সে!
কিন্তু চা খাওয়ার জন্য বৌদিকে উঠে গিয়ে ওর কাছে নিজের মন্তব্যের জন্য ঘাট স্বীকার করতে হলো। ছবি চা করে আনে। বেতের টেবিলে ট্রের ওপরে রাখা কাপগুলোতে দু চামচ করে দুধ দিল। আমি উপস্থিত এ বিষয়ে সচেতন কিন্তু ওর গাম্ভীর্যের ঠাণ্ডা দেয়ালের ভেতরে রক্তিম হৃৎপিণ্ডটা দেখতে পাচ্ছিনে। বুকের অতলে চিন্ চিন্ করে একটুখানি ব্যথা খেলা করতে থাকে, একি হলো! ছবির এই পশ্চাদপসরণের অর্থ কি? আমার কোনো ব্যবহারে কি ও ক্ষুণ্ণ হয়েছে অথবা অন্য কোনো কারণ?
নোটন এসে কাছে দাঁড়াতেই ছবি তাড়াতাড়ি ওকে কোলে তুলে নিল। বৌদি বললেন, একদিকে আমার ভালোই হয়েছে ভাই। ছেলেমেয়ের ঝামেলা নেই। নোটন শিউলি তো ছবির! ওর একটা গতি হয়ে গেলে সেটাই হবে বিপদ!
আবার! ছবি শাসনের দৃষ্টিতে তাকাল, বুঝতে পারছি তোমাকে আরো শিক্ষা দিতে হবে, বৌদি।
তুমি আর কি শিক্ষা দেবে। নানা রকম শিক্ষা পেয়ে এখন নিজেই আমি শিক্ষয়িত্রী।
বৌদির কথা শেষ হতেই ছবি যে দরজাটা দিয়ে ও বাড়ি থেকে এসেছিল সেটাই ঠেলে আঠার উনিশ বছরের একটি ছেলে প্রবেশ করল। লম্বা ছিপছিপে গড়ন, সুদর্শন। পরনে ছাইরঙা প্যান্ট, গায়ে হাওয়াই সার্ট, চুলগুলো অবিন্যস্ত। সে আমাদের দেখেই বৌদিকে জিজ্ঞেস করল, বৌদি কেমন আছেন? ছবি আছে?
হ্যাঁ, আছে। বৌদি উৎসাহিত হয়ে বললেন, কি ব্যাপার মিন্টু, এতদিনে এলে তুমি।
বছরে একবার ছুটি পাই। গতবারও তো এসেছিলাম। আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি।
হ্যাঁ আমি তখন অন্যত্র ছিলাম। বৌদি টেবিলের ধারে উল ও কাঁটাগুলো রেখে বললেন, তুমি বোসো মিন্টু। ছবি দেখে যা, কে এসেছে।
ছবি ছুটে এসে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, মিন্টু। আমি গিয়েছিলাম, তুমি বাইরে ছিলে।
মিন্টু চেয়ার থেকে উঠে ওর কাছে গেল। বলল, হ্যাঁ বাইরে একটু কাজ ছিল। আচ্ছা তুমি আমার একটা চিঠির জবাব দাওনি কেন?
ছবির মুখটা যেন ধপ করে নিভে গেল। বলল, কই চিঠি তো আমি পাইনি?
পাওনি? একটা চিঠিও না? মিন্টু উত্তেজিত হয়ে উঠল, সে অ্যাবসার্ড ইনপোসিবল!
বৌদি বললেন, এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, বোস মিন্টু। ধীরে সুস্থে কথা বলো।
না না, বৌদি। যদি তাই হয়ে থাকে আই শ্যাল সি টু ইট। পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের বারোটা বাজিয়ে দেবো না?
আমার কানদুটো কেন ভোঁ ভোঁ করছিল বলতে পারব না। ম্লান পাংশু মুখে বসে আছি। আমার শিরায় এক আগুন জ্বলে উঠেছে, মনে হয় ঈর্ষার আগুন। আরো কিছুক্ষণ উচ্ছ্বাসের খই ফোঁটানোর পর ছেলেটি চলে গেলেও অবরুদ্ধ আক্রোশের প্রাবল্যে আমি স্তব্ধ হয়ে থাকি। বৌদি আমার মনোভাবটা যেন বুঝলেন। তাই হালকা ভঙ্গিতে বললেন, একদম পাগল! রিসালপুর পর্যন্ত গেছে, কিন্তু পাইলট হতে পারবে বলে মনে হয় না! ছবিকে সে এখনো মনে করে সাত বছরের খুকি!
আমি খানিকটা সহজ হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটি কে?
ওই তো ও বাড়ির বোরহান সাহেবের ছেলে। ওর বোন পান্না ছবির বন্ধু!
হুঁ। কতকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই বলে ফেললাম, আমাদের আদাবটা পর্যন্ত দিল না। বেশ উন্নতি হবে ছোকরার!
ছবি ঘরে চলে গিয়েছিল। আমার কথায় একটু বিরস হাসি হেসে বৌদি ডাকলেন, ছবি!
ও ভেতর থেকে বলল, যাই বৌদি!
এরপর বেরিয়ে এলে বৌদি জিগগেস করলেন, আচ্ছা মিন্টু ছোকরা তোর কাছে চিঠি লিখেছিল নাকি?
ছবি আমার কঠিন মুখটার দিকে একবার চেয়ে নিয়ে বলল, হ্যাঁ। তিনটে চিঠি দিয়েছিল।
কোথায় সেগুলো?
সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে ফেলেছি। ছবি পায়ের বুড়ো আঙুলে একটা কি টিপতে টিপতে বলল, যত সব বাজে। ছেলেটা আসলে বোকা!
সেজন্য বুঝি কিছু বলিস্ নি?
তাই!
ঠিক আছে আমিই বলে দেব’ খন। বৌদি বেশ জোর দিয়েই বললেন, বুঝিয়ে দেব, সে খোকা হলেও ধাড়ি খোকা! না বুঝলে গার্জিয়ানদের জানাতে হবে। তা, এভাবে বাসার ভেতরেই বা ঢোকা কেন?
হাতে দু’টো প্যাকেট, মিন্টু আবার ব্যস্তভাবে প্রবেশ করল। ডাকতে ডাকতে এগিলে এলো, ছবি! ছবি!
ও আড়ালে গিয়ে বসেছিল, বেরিয়ে এলো না। মিন্টু কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ছবি কোথায় বৌদি?
বৌদি অবলীলাক্রমে বললেন, কি জানি কোথায় গেল। কেন কিছু কাজ আছে তোমার?
হ্যাঁ। কয়েকটা জিনিস এনেছিলাম ওর জন্য! এই যে। নাইলনের ওড়না ও একটা ব্লাউজ পিস, জরির কাজ করা ভ্যানিটি ব্যাগ একটা, মল থেকে কেনা খাঁটি লাহোরের জিনিস। এদেশে পাওয়া যায় না।
মিছিমিছি এগুলি কেন আনতে গেলে। এ সমস্ত ওর কোনো কাজে লাগবে না।
কাজে লাগবে না? কেন?
