দরজা বন্ধ করেছেন ওরা, কখন বেরিয়ে আসবেন ঠিক নেই। তবু ভালো নাশতার আয়োজন করে ফেললাম।
পকেটে এখনো যা আছে তা দিয়ে দুপুরে পোলাও কোর্মার ব্যবস্থা করা যাবে। না, ঘুষ দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়! ওদের দুজনের যা অবস্থা দু’একদিন না খেলেও কুচ পরোয়া নেই কিন্তু বাড়িতে লোক থাকতে একেবারেই না খাইয়ে রাখা ঠিক নয়।
সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকেল কেমন একটা মত্ততার মধ্য দিয়ে কেটে গেল। দুপুরে গিয়ে ছেলেমেয়ে দুটোকে আনায় খাওয়াটা জমলো ভালো। ওদের কলকাকলিতে বাড়ি ঝক্তৃত। সন্ধ্যার আগে চায়ের টেবিলে জামিল বললেন, তুমি আমাদের এখানে এসেছ অথচ আমরাই দেখছি তোমার অতিথি!
মৃদু হেসে বললাম, সে কিছু নয়। আমি তো রোজই খাই একদিন খাওয়াতে পারব? তাছাড়া আমার বলতে তো আলাদা কিছু নেই!
কথা বলছি বটে কিন্তু আমার চোখজোড়া গোপনে একেকবার চলে যাচ্ছে ওদের মুখের দিকে, ভাবছি এরই নাম বুঝি প্রেম! একটা দিনে কি সুন্দর করে তুলেছে দু’জনকেই! ঠোঁটে মুখে রং ধরেছে, চোখে চাউনির গাঢ়তা। মীরা বৌদির চেহারায় ব্যক্তিত্বের সেই কাঠিন্য নেই বরং লাজনম্র। কথা বলছেন না। দু’একটি শব্দ বললেও বলছেন মৃদুস্বরে একের আত্মাকে অন্যে আজ স্পর্শ করেছেন তাই তারা হয়েছেন পূর্ণ। চায়ে চুমুক দিতে দিতে অর্থহীন আলাপের মধ্য দিয়ে আমি ওদের অজান্তে সেই পূর্ণতার মাধুর্য পান করছি।
আমিও পূর্ণ হতে চাই আর তাই বোধ হয় এই তন্ময়তা। সে উৎস তারা পৌঁছেছেন সেখানে যেতে এখন অন্যকে কি বাধা দিতে পারেন? এ কখনো সম্ভব নয়।
বৌদিকে নিশ্চয়ই সব খুলে বলেছেন জামিল ভাই, নইলে আমাকে দেখলেই মুখ টিপে হাসবেন কেন? কিন্তু একদিন আমি বললে গম্ভীর হয়ে গেলেন বৌদি। বললেন, দেখ জাহেদ, শিল্পীদের আমি বিশ্বাস করি না। এরা একেকটা পাষণ্ড এবং ছোটলোক। স্বার্থ ছাড়া কিছু বুঝতে চায় না। তুমি সেরকম নও তা কেমন করে বলব? তাছাড়া আমার মনে হয় শিল্পীদের বিয়ে না করাই উচিত!
চমৎকার, একেবারে খাসা! দূরত্বের শেকল থেকে এখনো মুক্ত হতে পারিনি তাই বললাম, আপনি নিজেও তো একজন শিল্পী।
একজন ভুল করেছে বলে সকলকেই তার পুনরাবৃত্তি করতে হবে তার কোনো মানে নেই!
আপনাদের বিয়েটা তাহলে ভুল? আমি গুরুত্বের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম। তা নয়তো কি। বিয়ে মাত্রই ভুল!
কথা বলবার সময় বৌদির ঠোঁটের কোণে এমন একটা হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল যাকে দুষ্টুমি আখ্যা দেওয়াই সমীচীন। তাই দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম। বললাম, বেশ, ভুল যদি হয়েও থাকে তবে নিশ্চয়ই তা মহৎ এবং মধুর ভুল! এ ভুল আমিও করতে চাই।
কিন্তু জানো সব জিনিস চাইলেই পাওয়া যায় না?
তা জানি এবং সেজন্যই তো যার কাছে গেলে পাব তাঁর কাছেই এসেছি। লক্ষ্মীর ঘরে তো কোনো অভাব নেই।
বৌদি হেসে বললেন, আমাকে তোয়াজ করে কাজ আদায় করবে ভেবেছো? কিন্তু এত সহজে আমি গলবো না।
সে নিজের চোখে দেখছি বলেই তো আরো ভরসা হচ্ছে! গুণী লোকদের এক জেদ। এক কথা।
বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে রসালাপ করছি বটে কিন্তু মনটা পড়ে আছে অন্যদিকে। কাছে ভিতে ছবিকে দেখছি না তো? জিজ্ঞেস করলে জবাব একটা পাব তবে তাতেও থাকবে ঠাট্টার গাট্টা। কাজেই সুযোগ বুঝে চোরাচোখে এদিক-ওদিক তাকানো। সে যে এখন বাসায় নেই তা সুনিশ্চিত। নইলে অন্তত একটুখানি সাড়া মিলত। কিন্তু যাবে কোথায়? কিছুদিন থেকে একটা জিনিস লক্ষ্য করছি যখনই আসি দেখি নোটন আর শিউলিকে নিয়েই ব্যস্ত ছবি। ভাইয়ের ছেলেমেয়েকে ভালোবাসবে নিশ্চয়ই কিন্তু এমনটা কোথাও দেখিনি। সকালে এলে দেখা যায় দুটিকে নিয়ে পড়াচ্ছে, একটুখানি চেয়ে কাঁধের ওপর আঁচল টেনে আবার মুখ নিচু করে বেলা দশটার আগেই ওদের গোসল করায় আর সেকি যত্ন! যেন ওরা মানব-সন্তান নয় মেজে ঘষে ঝকমকে করে তোলার মতো কোনো ধাতব বস্তু! বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে এলে ওদের খাইয়ে দাইয়ে ওই বারান্দাটুকুর মধ্যে নানারকম খেলায় মেতে ওঠে। সন্ধ্যার বাতি লাগিয়ে বলে কিসসা কাহিনি রূপকথা উপকথা আজগুবি গল্প। আমাকে যেন দেখেও দেখে না, সংক্ষিপ্ত কথাটুকুই সেরে চলে যায়। ডাকলে অবশ্যি কাছে আসে কিন্তু এইটুকুই, নিজেকে প্রকাশ করে না। সে যেন আবার গুটিয়ে গেছে এবং নিজেকে নিয়েই পরিতৃপ্ত।
সিগারেট ধরাবার ভান করে রান্নাঘরে যেতে চাইলে বৌদি হেসে বললেন, ওখানে নেই ছবি!
বাহ্ রে আমি কি সে জন্য যাচ্ছি!
লুকিয়ে লাভ কি ভাই আমি সব জানি। ও পাশের বাড়িতে গেছে ছেলেমেয়েদের নিয়ে। ডেকে দেবো?
না, না। তার দরকার নেই। আমি চেয়ারে বসে পড়ে বললাম, দাদা কোথায় গেছেন?
চাকরির খোঁজে! আমাকে নাকি কাজ করতে দেবেন না। একেবারে পাগলামি।
আমি বলি সত্যি বৌদি অফিসে আদালতে মেয়েদের কেমন বেমানান লাগে।
উলের কাঁটাদুটো থামিয়ে বৌদি বললেন, তোমার মুখে একথা শোভা পায়না, জাহেদ। তুমি শিল্পী। সমাজের সবচেয়ে প্রগতিশীল ব্যক্তি!
যাই বলুন এ-ব্যাপারে আমি পুরোপুরি প্রাচীনই থেকে গেছি। মেয়েদের গৃহলক্ষ্মী হিসেবে দেখতেই আমি ভালোবাসি।
সে অভ্যাসের দোষ।
তা হতে পারে। আমি একটু চুপ থেকে বললাম, এটা অবশ্য বুঝি মেয়েদের অর্থনৈতিক মুক্তি না দিলে দেশ দাঁড়াতে পারবে না। তবু আমার গৃহিণীকে অন্য পুরুষের মাঝখানে দেখতে খারাপ লাগে।
