ছবি বাতিটা রেখে তার হাত ধরে বলল, দাদা! ওঠো, চলো তোমাকে বিছানায় শুইয়ে দিই।
জামিল দ্বিরুক্তি না করে উঠে পড়লেন; ছবির কাঁধে ভর করে বড় কামরার চৌকিটার ওপর গিয়ে গা এলিয়ে দিলেন। আমি হারিকেনটা নিয়ে তেপয়ার ওপরে রাখি। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, উদ্ভ্রান্ত চাউনি। যেন চিনতে পারছেন না। ঘনঘন শ্বাস ফেলছেন। এই অবস্থা আমার অজ্ঞাত নয়। এ যে মৃত্যুর পূর্ব লক্ষণ আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ছবি! মীরাবৌদির ঠিকানাটা বলো।
কেন! ও যেন ঠিক বুঝতে পারছে না।
আমি বললাম, কাজ আছে।
ছবি কম্পিত হাতে ঠিকানাটা লিখে দিতেই ওকে জামিলের মাথায় পানি ঢালতে বলে দ্রুতপদে বেরিয়ে গেলাম। ফাঁড়ির ঘণ্টায় তখন দশটা বাজছে, ঢং ঢং ঢং।
০৫. শিয়রে জ্বলছে বাতি
শিয়রে জ্বলছে বাতি, আর জ্বলছে তিনজোড়া চোখ। ডাক্তার এনেছিলাম, তিনি পরীক্ষা করবার পর কোরামিন ইনজেকশন দিলেন এবং বললেন, অত্যধিক উত্তেজনা ও উইকনেস থেকেই এর উৎপত্তি। হার্টফেল হতেও পারত। কিন্তু এখন আর ভয় নেই। মানসিক উদ্বেগ থেকে দূরে রাখা ও ভালো পথ্য দেয়া এই দুটো জিনিস আপনাদের দেখা দরকার!
ক্রমে সকাল হয়ে আসে। একটি দুটি করে পাখি ডাকল। রোগী তখনো ঘুমাচ্ছেন। বৌদি দরজা খুলে বাইরে গিয়ে বারান্দার ভাঙা রেলিংটা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। পুব আকাশে উষার আভাস। শুকতারাটা দপদপ করে জ্বলছে তখনো। রাতে হাস্নাহেনা ঝাড়ে ফুল ফুটেছিল, ভোরের হাওয়ায় তারই গন্ধের রেশ এসে লাগছে।
বৌদি ঘরে এলে আমরা দু’জন বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের থামিয়ে দিলেন।
আমি এখন আসি জাহেদ! বিপদ কেটে গেছে এখন তোমরাই—
আমি দৃঢ়স্বরে বললাম, সে হয়না বৌদি! আপনাকে আর কিছুতেই যেতে দিচ্ছিনা।
ছবি তাকে আগলে ধরে বলল, বৌদি তুমি এমন কঠিন হয়েছ কিভাবে বুঝতে পারছি না! কেমন করে চলে যেতে চাইছ তুমি!
বৌদির মুখটা একটু কেঁপে উঠল। কণ্ঠ ঠেলে একটা বেদনাকে সংবরণ করতে করতে যেন বললেন, সে তুই বুঝবিনে ছবি। আমাকে যেতেই হবে।
দু’জনে যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছ। ছবি মৃদুস্বরে মিনতি জানাল, ভুলের বোঝা আর বাড়িও না, বৌদি! আমি কি তোমার কেউ নই? অন্তত আমার মুখ চেয়ে তুমি যেয়ো না। দাদাকে কত ভালোবাসতে, কেমন করে সব ভুলে গেলে তুমি!
হ্যাঁ ভুলে গেছি, আসি সব ভুলে গেছি! মীরা বৌদি ফিসৃফিস্ করে বললেন, এবং আরো ভুলে যেতে চাই!
বৌদি আবার বারান্দার দিকে পা বাড়ালে তার শাড়ির আঁচলটা উড়ল হাওয়ায়, প্রান্তটা গিয়ে লাগল জামিলের মুখে আর তৎক্ষণাৎ ধড়মড় করে উঠে বসলেন।
কে? কে ওখানে? দরজার কাছে মীরা ফিরে দাঁড়াতেই আবার জোরে উচ্চারণ করলেন জামিল, কে?
মীরা নড়তে পারছিলেন না, আমরাও কতকটা আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ চেয়ে দেখার পর জামিল ভাই ত্রস্তভাবে খাটের ওপর থেকে নামলেন, ছুটে গিয়ে ব্যাকুল গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বলতে থাকেন, মীরা! আমার মীরা আমাকে রক্ষা করো, মীরা আমি নিঃশেষ হয়ে গেছি আমাকে বাঁচাও!
মীরা-বৌদির মনের কপাটও এক ঝাঁপটায় হয়তো খুলে গেল। স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে শুধু কাঁদছেন। অনেকক্ষণ পরে মুখ না তুলেই বললেন, তুমি আমাকে শাস্তি দাও! আরো শাস্তি!
ছিঃ এমন কথা বলো না, মীরা! ভুল দুজনেই করেছি! তিলে তিলে তার শাস্তিও পেলাম। এখন থেকে তোমার সব কথা আমি শুনবো। তোমার কোনো আফসোস রাখবো না। দেখবে সত্যই আমি ভালো আঁকতে পারছি। অনেক নাম হবে। তুমি পাশে থাকবে আমার!
জামিল দরজার পাট টেনে নিলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ছবি! কোদাল আছে?
ছবি ভাবনায় যেন আচ্ছন্ন ছিল, সচেতন হয়ে বলল, হ্যাঁ ভাঙামতো আছে একটা! দেবো?
দাও! আমি বললাম, আজকের সকালটা সত্যই স্মরণীয়। তুমি স্টুডিও গুছাও গে, আমি বাড়ির জঞ্জালগুলো সাফ করি।
ওমা সে কেন! একটা ছেলেকে ডেকে চার আনা দিলেই সব পরিষ্কার করে দেবে!
আহ্ তুমি বড্ড বেরসিক! বুঝতে পারছ না কাজ করবার জন্য আমার হাত দুটো সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে নিসৃপিস্ করছে!
ছবি আর দাঁড়াল না। কোদালটা নিয়ে এসে মিষ্টি হেসে বলল, দেখ আমার ফুলের গাছগুলোকে আবার সাফ করে ফেলো না। অনেক কষ্ট করে বাঁচিয়ে রেখেছি। শিল্পীদের তো কোনদিকে খেয়াল থাকে না।
তাই বলে ফুলের গাছের দিকেও থাকবে না!
থাকে যদি ভালো তবু সাবধান করে দিলাম। শিল্পীরা ফুল রচনা করে কিন্তু সত্যিকারের ফুলকে ছিঁড়ে দলা পাকাতেই ওদের আনন্দ কি না।
সে কেমন করে বুঝলে তুমি? তোমার ধারণা ভুলও তো হতে পারে?
না, ভুল নয়। এতো বড় দুজন শিল্পীর কাছে থেকে ভুল শিখব আমি? তা ছাড়া ময়রা রসগোল্লা খায়না এতো জানা কথা।
ছবি মুখ টিপে হাসলেও আমি গম্ভীর হয়ে যাই। বললাম, আমি শিল্পী কিনা জানি না, তবে ফুল আমি ভালোবাসি। তোমার ফুলগাছ নষ্ট হবে না এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো!
এবার ছবি খিলখিল্ করে হেসে উঠল। বলল, বাহ! এত অল্পতেই অভিমান! বেশ তুমি আমার সব ফুলগাছ উপড়ে ফেলে দাও।
পাগল! আমি উঠানে নেমে প্যান্ট গুটিয়ে জঞ্জাল সাফ করতে লেগে যাই। ছবি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ, এরপর কোমরে আঁচল জড়িয়ে সেও গেল স্টুডিও ঘরের ভিতর।
মেঘ যখন কেটে গেছে তখন সারা পৃথিবীই আলোকিত হবে সোনালি রুপালি ধারায়। গাছের পাতারা নাচবে, গান গাইবে পাখি। নর্দমা পরিষ্কার করতে গিয়ে আমার মনে গুঞ্জন উঠেছে একটি রাত তো ছবির আরো কাছে এলাম, এর চেয়ে বড় লাভ আর কি হতে পারে। এখনই সুযোগ। যদি কিছু করতে হয় অনেক দিনের পর এই ছোট্ট সংসারে আনন্দধারার উৎস মুখটি যখন খুলে গেছে তখনই করা দরকার। এর মধ্যে ক্ষেত্র সম্পূর্ণভাবে তৈরি করে ফেলা চাই।
