জামিল চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ লক্ষ্য করার পর ঘরে ঢুকে বললেন, কি হে, আজ দেখি তোমার তুলি থামছেই না! কি ব্যাপার, জোয়ার এলো নাহি হঠাৎ
আমার মগ্ন চোখদুটো একবার শুধু ঘুরে আসে কিন্তু হাতের তুলি থামে না। জামিল চৌকির কোণে বসে একটা সিগারেট ধরালেন।
কমপোজিশনে হলুদ চড়ানো শেষ হলে সোজা হয়ে দাঁড়াই। হাত দুটো ওপরের দিকে ছুঁড়ে একটা গভীর শ্বাস বুক ভরে টেনে নেয়ার পর বললাম, নিশ্চয়ই রাগ করেননি, দাদা। জরুরি কাজ ছিল একটা তাই চলে গিয়েছিলাম!
জামিলকে আপনি বলাটা আমি কিছুতেই ছাড়তে পারলাম না। হয়তো পারবও না কোনো সময়।
ছবি বলল, আমার কাজ তো শেষ হলো? এখন আমি ভাতটা চড়িয়ে দিই গে।
বোসো, এত ব্যস্ত কেন। আমি পরিবেশটাকে হালকা করবার জন্য বললাম, ছবি সত্যি কাজের মেয়ে দাদা! কি সিটিংটাই দিল, একটুখানি নড়নচড়ন নেই, একেবারে যেন পাথরের মূর্তি। একটা কিছু প্রেজেন্ট করলে হয় ওকে, কি বলেন?
দাদার মুখের ওপর থেকে গাম্ভীর্যের ছায়াটুকু সরে গেল না দেখে ছবি কাজের অছিলায় বেরিয়ে গেল।
একমুখ ধোয়া ছেড়ে জামিল বললেন-দেখ জাহেদ, তোমাকে একটা কথা বলব, কিছু মনে করো না। জীবনকে গড়ে তোলা সত্যি কঠিন কাজ। বিশেষ করে, শিল্পীর জীবন। শিল্পীর জীবনে প্রেম দরকার, কিন্তু তাতে জড়িয়ে পড়লে চলবে না। অথচ আমরা জড়িয়ে যাই। ফলে নৈরাশ্য এবং ব্যর্থতা। দৃষ্টান্ত আমার জীবন। কিছুই করতে পারতাম না এ আমি মনে করিনে; কিন্তু একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম বলেই সখাদ সলিলে ডুবে গেছি। শিল্পী জামিলের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই, এখন আছে শুধু তার। প্রেতাত্মা।
কিন্তু জামিল তো বেঁচে আছেন! আমি বললাম, এবং কাজও করছেন, তার দ্বারা মহৎ সৃষ্টি হবে না কে বলতে পারে? হয়তো সেই সৃষ্টিরই অগ্নিপরীক্ষা চলছে এখন।
থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইউর কমপ্লিমেন্টস্! জামিল ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি হেসে বললেন, জামিলের দেহটা কবরে যায়নি এখনো একথা ঠিকই; কিন্তু সে যে মরে গেছে। তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। এ যে গায়ের জোরে অস্বীকার করতে চাইবে বুঝব হয় সে তোয়াজ করছে নয় পরিহাস। তুমি নিশ্চয়ই সেরকম ছেলে নও? দেখ জাহেদ, আমি কাউকে গ্রহণ করি না কিন্তু যখন গ্রহণ করি আন্তরিকভাবে করি। তোমাকে আমি অত্যন্ত ভালোবাসি এবং আমি চাই তুমি বড় হও, হও বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী! সেইজন্য বলছি, ভুলপথে পা দিও না!
সুবোধ বালকের মতো বললাম, কথাটা ঠিক বুঝতে পারছি না!
বুঝতে পারছ ঠিকই কিন্তু না বোঝার ভান করছ! জামিল তার প্যাকেট থেকে আমাকে একটা সিগারেট দিতে দিতে বললেন, যাই হোক, তুমি অস্বীকার করবে না কিন্তু ছবির দিকে তুমি এক পা অগ্রসর হয়েছ বলেই আমার ধারণা। তাই শুভাকাক্ষী হিসেবে তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, আর সামনে বেড়ো না। এমন সম্ভাবনাপূর্ণ ভবিষ্যৎটা নষ্ট করে তো কোনো লাভ নেই।
আমি কি বলব হঠাৎ ঠিক করে উঠতে পারিনে। স্বীকার করলেও বিপদ, না করলেও বিপদ। কোন্ দিকে যাই?
একটুখানি ইতস্তত করে বললাম, ছবিকে বললেই ও রাজি হলো। নইলে–
জাহেদ, মিছিমিছি লুকোবার চেষ্টা করো না, পাঁচ বছর একটানা প্রেম করেছি, আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। চেহারা দেখলেই সব বুঝতে পারি; কার মন কোন্ দিকে ঘুরছে।
এবার আমি উত্তপ্ত হয়ে উঠি। বললাম, বেশ, যদি তাই হয়, আমি ভুল পথে পা বাড়িয়েছি বলে আমার মনে হয় না। ছবির মতো মেয়েকে ভালোবাসতে পারাটা যে কোনো ছেলের পক্ষে সৌভাগ্য।
জামিলের চোখমুখ নিমেষে লাল হয়ে গেল। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সটান দাঁড়িয়ে গিয়ে তীক্ষ্ণ তির্যক কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, কিন্তু সে চলবে না। তোমাকে শিল্পী হতে হবে, শিল্পী।
আমি শিউরে উঠে একহাত পিছিয়ে যাই। কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার আগেই কোমর থেকে খুলে নেয়া তার মোটা চামড়ার বেল্টের সপাং সপাং আঘাত আমার গায়ে পড়তে থাকে।
ছবি দৌড়ে এসে উচ্চারণ করল, দাদা!
বাধা দিনে ছবি; বাধা দিনে!
কিন্তু ছবি হাতসমেত ওকে সাপটে ধরল। আত্মরক্ষার স্বাভাবিক তাড়নায় কখন বসে পড়েছিলাম জানিনে, জামিলের উন্মত্ততা শেষ হলে বন্য দৃষ্টিতে তাকাই। একি কাণ্ড!
হাতের বেল্টটা ছেড়ে জামিল কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন চৌকির ওপর। ছবি ছুটে এসে আমাকে ধরে। গায়ে হাতড়াতে হাতড়াতে বলল, ইস দাদা! তুমি একটা পশু।
হ্যাঁ পশু! আমি একটা পশু! বিড়বিড় করতে করতে জামিল বাইরে চলে গেলেন।
ছবি আমাকে ধরে তোলে। সামান্য বেল্টের মার তবু লেগেছে মন্দ নয়। প্রত্যেকটা বাড়ি ফুলে ফুলে উঠেছে। আঘাতের স্থানগুলোতে চিচি ব্যথা, অশেষ যন্ত্রণা। ছবি আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছে বলল, তুমি কিছু মনে করো না, দাদা পাগল! সত্যি পাগল হয়ে গেছেন!
সে আমি জানি ছবি! অতিকষ্টে আমি বললাম, কিন্তু এতটা ভাবতে পারিনা!
কিছুক্ষণ এমনি ভাবেই কাটল, আঘাতের জ্বালা ভুলে একদম হতভম্ব হয়ে থাকি! এমন পরিস্থিতিও সম্ভব?
কিন্তু সেও বেশিক্ষণ নয়! ছবির হাত ধরে চৌকিতে এসে বসেই শুনি হু হু করে প্রবল কান্নার শব্দ। দু’জনে তাড়াতাড়ি বাইরে গেলাম। জামিল কাঁদছেন, বারান্দায় দুই হাঁটুর ফাঁকে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে জামিল ভাই কাঁদছেন। শরীরটা ঝাঁকুনি খেয়ে ওঠে একেকবার। ছবি বাতি নিয়ে এলো! আমার ভেতরটা তখনো অস্থিরতায় আচ্ছন্ন, লোকটাকে ধরতে প্রবৃত্তি হলো না!
