মেসে ফিরে দেখি জামিলের চিঠি আমার চৌকির কাছে টেবিলে ঢাকা দেয়া।
জাহেদ, তুমি আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করবে তা স্বপ্নেরও অগোচর ছিল। আমি তোমার জন্য খাওয়ার জোগাড়যন্ত্র করলাম আর তুমি কিনা না বলেই চলে এলে? সত্যি আমি খুব ব্যথিত হয়েছি। যাই হোক, আশা করি এ চিঠি পাওয়া মাত্র তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে।
বেলা পড়ে এসেছিল, বিছানায় খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ি। ওখানে যাওয়ার জন্য আমার অগোচরেই হয়তো মনটা চিৎকার করছিল। সুযোগ পেয়ে তাই প্রবলতর হলো মাত্র। এখন কি করছে ছবি? নিশ্চয়ই হারিকেনের চিমনিটা দরজার কাছে বসে মুছছে, নয় সে রান্নাঘরে, ঘরে চাল থাকলে ভাত চড়িয়েছে। একটু আগে মাথা আঁচড়ে হাতেই অনেকক্ষণ বেণী পাকিয়েছে, বারান্দার নিচের গাছ থেকে ছিঁড়ে এনে হয়তো চুলে খুঁজেছে একটা ফুল। কাজ করছে, কিন্তু আনমনা। সে কি আমার কথাই ভাবছে?
এখনও বাড়িতে ঢুকে বুঝতে পারি জামিল নেই আমার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে উঠল আবার। এ কি বিপদ!
এবারে ছবি আর নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল না, বহুক্ষণ বুকে মিশে রইল। এরপর দন্দর করে আবার দুই চোখের পানি ছেড়ে দেয়। মৃদুস্বরে বলল, সত্যিই তুমি আমায় ভালোবাস?
হ্যাঁ, ছবি! আমি আবেগ-কম্পিত স্বরে বললাম, সে কি মুখের ভাষায় বলতে হবে? সাক্ষী এই সন্ধ্যা, সাক্ষী এই নীল আকাশ, তোমার মাথার রজনীগন্ধা! তোমাকে বুকে পেয়ে আমার জীবন ধন্য হলো! সার্থক হলো!
এমনভাবে বলো, না লক্ষ্মীটি তাহলে আমি যে চিৎকার করে কাঁদতে চাইব! ছবি একটু থেমে বলল, কিন্তু সবসময় তুমি আমাকে ভালোবাসবে তো?
সবসময় মানে? যদি অন্যজীবন হয় সে জীবনেও তোমাকেই ভালোবাসবো।
কিন্তু জান, মিলন হলে ভালোবাসা টেকে না?
সে আমি বিশ্বাস করি না। মিলন ছাড়া ভালোবাসা সম্পূর্ণ হয় না, টিকবে কি করে। দেহে দেহে আত্মায়-আত্মায় বিন্দু-বিন্দু হয়ে মিশে যাওয়ার নামই প্রেম। প্রেম দেহেরই পরম শিখা, সেজন্য দেহের অবসান ঘটলেও শিখা দাউদাউ করে জ্বলতে পারে। তার মৃত্যু হয় না। তুমি বিশ্বাস করো লক্ষ্মী, আমি কোনদিন তোমার অমর্যাদা করব না।
কিন্তু আমার বড্ড ভয় লাগে!
কেন?
জানি না। মনে হয় তুমি যদি আমাকে বুঝতে না পারো?
সে হবে কেন!
তাইতো সে হবে কেন! আমি তো কিছু গোপন করবোনা তোমার কাছে কিছু গোপন করবো না। তুমিও আমাকে বলবে তোমার কথা, সব। আমরা ঠিক থাকলে কেউ আমাদের সম্পর্ক ভাঙতে পারবে না! কেউ না!
ছবিকে হঠাৎ কেমন যেন বিকারগ্রস্ত মনে হলো, নিজেকে আলতোভাবে ছাড়িয়ে নিয়ে কাছেই দাঁড়াল। স্নিগ্ধ আকাশের ভেতর থেকে নিমেষে বেরিয়ে এসেছে কালো মেঘভার! আমি চেয়ে থাকি। অল্পক্ষণের জন্য ছবি কাছে এসে ধরা দিয়ে সে আবার দূরে সরে গেল। তার ঠোঁটমুখ কাঁপছে শিশির করে, থমথমে ছায়ার শিহরণের মতো। আমি শুধোলাম, এমন করছ যে! কি হয়েছে তোমার ছবি?
কই কিছু হয়নি তো? হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ও বলল, ভাবছিলাম পুরুষমাত্রই একরকম, একেবারে এক ছাঁচে গড়া!
কি রকম?
স্বার্থপর! নিজের স্বার্থটুকু আদায় করতেই সর্বদা ব্যস্ত। না দিলে অভিমান করে, নয় হুমকি দেখায়; কিন্তু সেটাও স্বার্থ আদায়ের ফন্দি। সরল-বিশ্বাসে যে মেয়ে সেই ফাঁদে পা দিল, সে-ই মরল। পুরুষদের কাছে প্রেম জিনিসটা অভিনয়, শিকার ধরবার টোপ মাত্র কিন্তু মেয়েদের সেটাই জীবন।
যেন ছবি নয়, ছবির মুখ দিয়ে অনেক দূরের অচেনা কেউ কথাগুলো বলল মন্ত্রোচ্চারণের মতো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এসব কথা আমাকে বলছো কেন ছবি?
কেন বলছি বুঝতে পারছ না? তুমিও এইরকম বলে। তুমি শিল্পী, তুমি স্রষ্টা, একটু ভিন্ন হতে পারলে না? বন্ধুর বেশে এসে সেই বন্ধুত্বের মর্যাদা নষ্ট করতে এতটুকু তোমার দ্বিধা হলো না? যা ভেবেছিলাম আসলে তা নয়। কিন্তু সাদাসিধে মেয়েটির ভিতরে এমন আগুন লুকিয়ে আছে তা ওর মুখ দেখে অনুমান করাও সম্ভব ছিল না; ওর তিরস্কারে তাই মাথা নিচু করে থাকি। সে বলল, যাক্ গে! আবারো বলছি ভালোবেসে যদি করে থাক তাহলে আমাকে তুমি ছাড়ো। তোমার মঙ্গল হবে।
যে মঙ্গল আমি চাই না ছবি! তুমি বিশ্বাস করো তোমাকে না পেলে জীবন আমার দুঃখময় হবে।
ছবির মুখের মধ্যে আবার সেই পরিচিত রেখাগুলো ফুটে উঠতে থাকে যা করে তাকে স্নিগ্ধ, মায়াময়ী।
ও পূর্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলে আমি তাকে আগলে ধরে বললাম, বলো তুমি আমার হবে।
হ্যাঁ হবো। আমি তোমারই হবো! ঠোঁটের ফাঁকে ফিসফিস্ করে ছবি বলল, কিন্তু একটা কথা দিতে হবে।
কি কথা বলো। মানুষের অসাধ্য না হলে আমি তা রাখব।
অসাধ্য কিছু নয়। ছবি হঠাৎ অদ্ভুত কাণ্ড করল, মাটিতে লেপটে বসার পর আমার মাথাটা বুকে নিয়ে চুলে আদর করতে করতে বলল, কথা দাও বিয়ের আগে তুমি আমাকে স্পর্শ করবে না?
গম্ভীর আনন্দমগ্ন স্বরে আমি বললাম, তা কি করে সম্ভব, লক্ষ্মী!
সম্ভব খুবই সম্ভব। দেখা হবে কথা হবে কিন্তু ওটি নয় কেমন?
খানিকক্ষণ চুপ হয়ে রইলাম। ও জানেনা ওর সান্নিধ্যে এসে আমার মধ্যে কি বিপ্লব ঘটে গেছে এবং তা বাঁধ দেয়া আমার পক্ষে কত কষ্টকর। তবু বললাম, তুমি যদি চাও তাহলে আর আপত্তি করব না। কেমন, হলো তো?
রাত আটটার দিকে বাসায় ফিরে জামিল দেখেন স্টুডিওতে আমি কাজ করছি। কাউকে বলিনি তবে মনে-মনে আছে ছবিটার নাম হবে সোনালি শস্যের ক্ষেতে পল্লীবালা। পটভূমি পরে আঁকব। এখন ছবিকে টুলে বসিয়ে চরিত্রটা শুধু ফুটিয়ে তুলছি। ছবি সত্যি আশ্চর্য মেয়ে, দেড়ঘণ্টা ধরে সিটিং দিচ্ছে একটানা, তবু একটু নড়তেও চাইল না! যেভাবে হাসতে বলেছি সেই মধুর হাসিটুকু লেগেই আছে সারাক্ষণ। দ্বিতীয় মোনালিসা আঁকাই যেন আমার উদ্দেশ্য; কাজ করতে গিয়ে এমন প্রেরণা আর কোনদিন অনুভব করিনি। আমি তন্ময়। এক মোহনায় নদ ও নদীর মতো দুজনে মিশে গেছি একই আবেগের এলাকায়, ছবি সার্থক না হয়ে যায় না।
