মুজতবা প্যালেটটা রেখে বসে পড়ে বলল, তুইই আঁক।
কেন, তুমি আঁকবে না? আমি জিজ্ঞেস করলাম, কমপোজিশনটা ভালো হয়নি?
গেলাসে মদ ঢালতে ঢালতে মুজতবা বলল, তা হয়েছে। কিন্তু আমি দাঁড়ানো ভঙ্গিতে বহু এঁকেছি কিনা। তুই আঁ আমি দেখি!
খানিকক্ষণ স্থিরভাবে থাকার পর রাধা হঠাৎ হাল ছেড়ে দিল। হাত-পা নাড়া দিয়ে বলল, উহ্, রক্ত জমে যাচ্ছে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় নাকি?
তিন ঘণ্টা তো অন্তত থাকতে হবে। আমি বললাম, তুমি তো এ ব্যাপারে অভ্যস্ত!
তা বটে। রাধা একটা ভেংচি কেটে বলল, কিন্তু নাগর, সে অভ্যাস তোমার কাছে অচল হয়ে পড়েছে।
মুজতবা অবিরাম হাসতে থাকে, হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ। নেশার ঝোঁকে মাথা দুলিয়ে বলল, উই ডোন্ট নো মাই ডিয়ার ফ্রেণ্ড শি রিকোয়ার্স সামর্থিং। হিয়ারর্স দি থিং ডাবলিং।
ও ঢেকুর তুলতে সস্তা দিশি মদের ভোটকা গন্ধে বাতাস ভরে যাচ্ছিল। তা না হয় সহ্য করেই নিতাম; কিন্তু ওর দিকে মদের গেলাস দিতে গেলে বাধা দিই। এখন ওর মদ খাওয়া মানে গোটা পরিকল্পনাটাই বানচাল হয়ে যাওয়া। আমার মনোভাবটা বুঝতে পেরে মুজতবা বলল, ড্যাম ইট। ইউ নো নাথিং মাই ফ্রেণ্ড। দু’এক গেলাস মদে ওর কিচ্ছুই হবে না। এই নাও!
রাধা গেলাসটা নিয়ে এক চুমুকে সবটুকু সাবার করে ফেলল!
হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ! দেখলে? একদম মরুভূমি, সবটুকু শুষে নিল। আরো দাও। কুচ পরোয়া নেই। সব হারিয়ে যাবে একদম বেমালুম। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। হাঃ।
মুজতবা মাতাল হয়ে যাচ্ছে। আমি রাধাকে শুধাই, ঠিক আছ তো? কাজ চলবে?
নিশ্চয়ই, লাগাও। কিন্তুই একবারে আধঘণ্টার বেশি রেখোনা। আধঘণ্টা পর একটু বিশ্রাম নিয়ে পরে আবার দাঁড়াব। কেমন?
রাধার কণ্ঠে চপলা বালিকার আব্দারের সুর। আমি হেসে বলি, ঠিক আছে আগের মতো দাঁড়াও!
রাধা স্থির হয়ে দাঁড়ালো, ক্যানভাসের ওপরে চঞ্চল হয়ে ফেরে আমার হাতের তুলি। আমার সম্মুখে উন্মোচিত, বিকশিত নারীদেহ, চোখের দৃষ্টিতে একেবারে আচ্ছন্ন করে দিতে না পারলেও মগজের কোষে শিরশির করে রক্ত চলেছে।
এ ছবি ব্যর্থ হতে বাধ্য। কারণ জীবনের যে সত্যকেই রূপ দিতে চাইনা কেন, এতো পোর্ট্রেট মাত্র? এবং পোর্ট্রেট ঠিক অন্য ছবির মতো নয়। অন্য যে-কোনো ধরনের ছবি আঁকবার সময় একাকিত্ব একেবারে অপরিহার্য না হলেও, আত্মমগ্নতা বজায় থাকে। সর্বদাই; তাই সেই ছবি প্রদর্শনীতে গিয়েই হয় নিরিখের বিষয়। কিন্তু প্রতিকৃতির বেলায় অন্য ব্যাপার। এ শুধু মডেলের হুবহু চিত্রণ নয়, যত সুন্দরভাবেই সেটা করা হোক না। আসলে প্রতিকৃতির সাফল্য যতটা না নির্ভর করে অঙ্কন দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি অন্য একটি কারণের ওপর এবং সেটাই সারবস্তু। সেজন্য অনেক সময় আনাড়ি লোকের হাত দিয়েও এমন প্রতিকৃতি বেরিয়ে আসে যা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য এবং সেই রহস্যটি হলো সহানুভূতি, মনস্তাত্ত্বিক নৈকট্য। মডেলের আত্মার সঙ্গে শিল্পীর আত্মার গভীর সান্নিধ্য। এই সংবেদনশীলতা প্রায় নীরব সংলাপের মতো, যার মধ্য দিয়ে একদিকে মডেলের আত্মিক চেহারা এবং অন্যদিকে বাইরের জগতে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রূপায়িত। আর জীবনকে প্রকাশের বেলায় তো এর ওপরও নৈর্ব্যক্তিক চেতনারও দরকার।
কিন্তু এক্ষেত্রে কিছুই আশা করবার নেই; বরং একে লাইফক্লাসের একটি কাজ বলাই সমীচীন।
তবু যেটুকু সম্ভাবনা ছিল তাও ভেস্তে গেল। মুজতবা আমার পেছনে বিবস্ত্র হয়ে টলতে টলতে গিয়ে মেয়েটিকে ধরে কোলে তুলে নিলে, একটা ধাক্কা খেয়ে থেমে যায় আমার হাতের তুলি। সে নেশাজড়ানো গলায় টেনে টেনে বলল, ইয়ার! এঁকে যা, চুটিয়ে এঁকে-যা। ভেনাস আঁক্-ছি-লি, এবার আঁক্ ভেনাস অ্যাণ্ড-মা-স! পল ভেরোনেজ দি সেকেণ্ড হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।
শত হলেও আমি মানুষ এবং রক্তমাংসেই গড়া আমার শরীর, কাজেই সেখানে থাকা আর সম্ভব হলো না। তুলিটা ওদের দিকে ছুঁড়ে মেরে দ্রুতপদে বেরিয়ে এলাম।
রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি, আনন্দের সত্য কোথায় নিহিত? সে কি মাংসপ্রিয়তায় অথবা কল্পনায়? নগ্নতায় একটা আদিম পবিত্রতা আছে, কিন্তু নগ্নতা যেখানে সভ্যতারই বিকৃতি সেখানে তার রূপও বিকারগ্রস্ত নয় কি? আলো আমি পছন্দ করি সন্দেহ নেই; তবে আলো-আঁধারির খেলাই আমার কাম্য। মানবীকে অর্ধেক স্বপ্ন দিয়ে না ঘিরলে সে তো মাংসেরই এক জলজ্যান্ত যন্ত্রণা? যে অজানা রাজ্য আকৈশোর পরম বিস্ময়ের মতো মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তার ওপর এমন একটা আঘাত আসবে ভাবতে পারিনি। স্পষ্ট দিবালোকে এমন উলঙ্গভাবে আমি তাকে চাইনি; যখনই ভাবি আমি দেখি তাকে আলোছায়ার স্বপ্নেঘেরা, পরনে নীলাম্বরী, আমের বোলের মতো সোঁদা গন্ধেভরা কালো এলোচুল, হাতে চুড়ির রিনিঠিনি, লাজ মুখোনি, প্রতি অঙ্গের সোচ্চার পূর্ণতাই তার সৌন্দর্য। সে আসবে মৃদু পায়ে চুপি চুপি, সে যে শত জনমের আকাক্ষার ধন। ধরা যায় তাকে কিন্তু তবু অধরা, আর সেজন্যই তো অন্তহীন কান্না।
তাকে আমি চিনেছি তাকে পেয়েছি খুঁজে, এরপর আর ভুল করতে পারিনা। নিজেকে নষ্টই যখন করতে চাই সেভাবে করাই ভালো। তার আগুনে দগ্ধ হওয়া পোড়া কয়লার মতো ভস্ম হয়ে যাওয়া ছাড়া আর আমার গতি নেই।
