কেন খুব খারাপ জায়গা নাকি? রসিকতা করে মুজতবা বলল, পতিতালয় প্রতিভার আঁতুড়ঘর এটাই জানিসনে কি ছবি আঁকবি!
দুপুরেও লোকজনের আনাগোনা কম নয়। এক জায়গায় বাইরেই দুজন বালার সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করছে কয়জন। আমরা বড় গলিটা পেরিয়ে এলাম। দুই দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে যাওয়া ছোট্টপথে আরেকটা মোড়ে আসতেই দেখি দরজায় দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে হাসছে। দাঁতে মিশি, ঠোঁটে পানের রং মুখে পাউডার আধভেজা চুলগুলো কোমর অবধি ছেড়ে দেওয়া। দেখতে বেশ পারঙ্গমা। কিন্তু হাসিটাই মারাত্মক। শান দেওয়া ছুরি নয়। ধারালো তুর্কি চাকুর মতো, বসিয়ে দেওয়া মানে খতম। নারীর এ রূপ আমার অকল্পনীয় ছিল। মনে মনে প্রমাদ গুণি। ঘরে ঢোকার পর দাঁড়িয়ে থেকেই মুজতবা বলল, আমার বন্ধু জাহেদ, ভালো আর্টিস্ট। আর ইনি রাধারানি!
পথের আলো থেকে ঘরের আড়ালে এসে বাঁচালাম আমি, কিন্তু তবু চোখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না। রাধা বিশ্রী ভঙ্গিতে আমার মাথার চুলগুলো হাতে নাড়া দিয়ে বলল, নাগর! এই বুঝি প্রথম আসা হলো! খুব লজ্জা হচ্ছে, না?
মুজতবা চৌকির ধারে বসে পড়ে হাসছিল। সে বলল, আস্তে সখি। ওভার ডোজে বিপদ হতে পারে।
রাধা তৎক্ষণাৎ গিয়ে কোলে উঠল ওর, দুই হাতে গলাটা জড়িয়ে ধরবার পর গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, কালকে আসনি কেন? আমার খুব রাগ হয়েছিল!
মুজতবা দুই হাতের তালুতে ওর গাল দুটো চেপে ধরে বলল, মাঝে মাঝে ফাঁক দেওয়াই তো ভালো। টানটা বজায় থাকে!
না সে আমার ভালো লাগে না; রাধা আহ্লাদীর মতো বলল, আমি সব সময় চাই! তুমি যদি নিয়ে যাও আমি এখান থেকে পালিয়ে যাব।
সর্বনাশ। আমার জানটা থাকবে তখন?
কেন থাকবে না? কারও সাধ্যি নেই তোমার গায়ে হাত তোলে।
না। সে হয় না, রাধা! এমনিতেই ভালো আছি! তোমার বাবু হতে পারাটাই তো যথেষ্ট।
ওর গলায় ঝুলতে ঝুলতে রাধা কথাগুলো শোনে, এরপর অভিমান ভরে একটা ঠমক মেরে ছেড়ে দিল। আমি বসে ছিলাম। ক্ষিপ্রগতিতে এসে তেমনিভাবে আমাকে জড়িয়ে বলল, আমার নতুন নাগর! এসো তোমার লজ্জা ভাঙিয়ে দিই।
মুজতবা এতটা নীচে নেমে গেছে এই জিনিসটা ভাববারও ফরসুৎ ছিল না। প্রতি মুহূর্তে একটার পর একটা চরম আঘাত। আমার এতদিনকার ধ্যান-ধারণার স্তম্ভগুলো একে একে ভেঙে পড়তে থাকে। তবে কি সমাজ সংস্কৃতি রুচি নৈতিকতা সবই মিথ্যে? পরলোক পাগলের প্রলাপ, ধর্ম বলতে কিছু নেই, পাপ পুণ্য বাজে উপাখ্যান?
তুমি একটু বাড়াবাড়ি করছ রাধারানি। একটা সিগারেট ধরিয়ে মুজতবা বলল, প্রথম দিনেই–
আমার গলা জড়িয়ে রাধা ওকে ধমকে মেরে উঠল, চুপ। কথাটি বলো না কাপুরুষ। নতুন নাগর আমার অনেক ভালো।
মুজতবা কীর্তনের সুরে গেয়ে উঠল, রাধা আমার রাগ করেছে। সুহাসিনি বিনোদিনী (এবে) বদনজুড়ে মেঘ ভরেছে। রাগ করেছে, রাগ করেছে, রাধা আমার রাগ করেছে।
কিন্তু বিনোদিনী তার নতুন অতিথিকে যেভাবে জড়িয়ে সোহাগ করতে থাকে তাতে রাগের চেয়ে অনুরাগের পরিচয়টাই ছিল বেশি এবং তার উত্তাপে নাগরটি উষ্ণ হয়ে উঠল বটে কিন্তু খুব যে আরাম বোধ করেছে এমন নয় বরং পরিস্থিতির আকস্মিকতায় কতকটা অপ্রস্তুত হয়ে মুষড়ে পড়েছে। তার শ্বাসরোধ হওয়ার জোগাড়। শরীরে শক্তি কম নেই, ইচ্ছে করলে ঝটকা মেরে ফেলে দিতে পারত। কিন্তু শত হলেও নারী কোমল পদার্থ, গায়ের জোরে তার বাঁধন কেটে সব সময় মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়।
অনেকক্ষণে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যখন উঠে দাঁড়ালাম তখন আমার কপালে বিরক্তির রেখা। মাথার চুলগুলোতে আঙুল চালিয়ে ঠিক করতে করতে বললাম, যা দেখালে একদম খাসা! এটা তোমারই উপযুক্ত জায়গা, মুজতবা। আমি চলোম।
মুজতবা দাঁত বার করে হাসছিল, বলল, এজন্যই তোকে আমি আনতে চাইনি। এতক্ষণে বুঝলি?
হ্যাঁ বুঝলাম বৈকি! ভালো মতোই বুঝলাম!
হঠাৎ রাধা আমার গলাটা দুহাতে জড়াবার পর সামনা-সামনি দেহটা চেপে মুখের কাছে মুখ তুলে বলল, আমাকে ভালো লাগছে না নাগর? কি চাও তুমি বলো? নাচ গান অন্য কিছু?
না না কিছু লাগবে না। তোমার কাছে কিছুই আমার চাওয়ার নেই।
মুজতবা তেমনিভাবে হাসতে হাসতে বলল, রাধা তুমি বড্ড বেরসিক। তোমার কাছে প্রথম অভিসার মিষ্টি খাওয়ালে না, নতুন নাগর কি করে থাকবে বলো! এই নাও মিষ্টি ও কিছু মালপানি আনাও। আজকে সহজে যাচ্ছিনে!
দশ টাকার একটা নোট সে বাড়িয়ে দিলে। আমি কটমট করে তাকাই এবং পরক্ষণে বেরিয়ে আসতে চাইলে মুজতবা খপ করে ধরে ফেলে আমার হাতটা, বলল, যাচ্ছ কোথায় বন্ধু। মডেলের ওপর কাজ না করেই চলে যাবে? সে হবে না, বসো!
তুমি এতবড় ছোটলোক তা জানলে নিশ্চয়ই আসতাম না! আমার কথাটা শুনে মুজতবা প্রচণ্ড হা হা শব্দে হেসে উঠল। এরপর পিঠ চাপড়ে বলল, ছেলেমানুষ! ছেলেমানুষ!
০৪. সঙ্গীর মন্তব্য যথার্থ
সঙ্গীর মন্তব্য যথার্থ কিনা জানিনা। তবে ওর মতো তুখোড় যে এখনো হতে পারিনি তাতো ঠিকই। এক চুমুক দুই চুমুক করে অনেকক্ষণ ধরে চা খাওয়ার সময় নিজেকে সামলে নিই। এখানে বিচলিত বোধ করার কোনো কারণ নেই, সার্থকতাও নেই। মওকা। যখন মিলেছে তার সদ্ব্যবহার করা উচিত।
আঁকার সমস্ত সরঞ্জাম ঘরেই রাখা ছিল, আমরা দু’জনে তৈরি হলে রাধা আস্তে আস্তে কাপড় ছেড়ে দেয়। অঙ্গের অলঙ্কারগুলোও খুলে রাখল। আমাদের সম্মুখে এখন সে নিরাভরণা, সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। বহু পীড়নে শরীরটা কিঞ্চিৎ শ্লথ হয়ে পড়েছে, কিন্তু গড়নটা অটুট এবং সুন্দর। চট করে ভেনাসের কথা মনে আসায় আমি কাছে গিয়ে ওকে। সেই ভঙ্গিতে দাঁড় করিয়ে এলাম। মন্দ লাগছে না।
