এমনও হতে পারে, অবনী ভাবল: সুরেশ্বর হয়তো মনে মনে এধারণাও করতে পারে হৈমন্তীকে কলকাতায় ফেরত পাঠানোর মধ্যে অবনীর কিছুটা হাত আছে। হয়তো, অবনী এবং হৈমন্তীর মধ্যে যেরকম ঘনিষ্ঠতা হয়েছে তাতে অবনীর কিছু স্বার্থ থাকতে পারে; স্বার্থের জন্যে এবং সুরেশ্বর ও তার অন্ধ আশ্রমের প্রতি অবনীর বিতৃষ্ণা থাকার দরুন হৈমন্তীকে সে আরও বিরূপ করে তুলেছে। এরকম একটা সন্দেহ অবনীর আগেও হয়েছে, কিন্তু সে গ্রাহ্য করেনি। গ্রাহ্য করলেও বা কী হত, তার করার কিছু ছিল না। আজ, এখন অবনীর মনে হল, সুরেশ্বর যেন তাকে এ ব্যাপারে কোথাও দায়ী করে রেখেছে। চিন্তাটা অবনীর খারাপ লাগছিল। সে এতদিন গোপনে সুরেশ্বরের বিরুদ্ধে কোনও শঠতা বা ষড়যন্ত্র করেছে–এ ধরনের চিন্তা অসহ্য। …অবনী কিছু করেনি, কিছুনা; তবু যদি সুরেশ্বর এরকম কিছু ভেবে নিয়ে থাকে তবে সেটা অন্যায়। অবনী কেমন ক্ষুব্ধ হল।
সুরেশ্বর এল; বলল, ভরতু নেই; একটু চায়ের জল চাপিয়ে দিয়ে এলাম।
অবনী বেশ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ যেন হুঁশ হল, সুরেশ্বরকে বসতে দেখল।
সুরেশ্বর বলল, হেম বোধ হয় দু-চার দিনের মধ্যেই যাবে।
আগামী রবিবার, অবনী বলল, বলে তাকিয়ে থাকল।
হ্যাঁ, ওই রকমই হবে।
অবনী বুঝতে পারল না সুরেশ্বর ইচ্ছাকৃত ঔদাসীন্য দেখাচ্ছে কি না। নয়তো তার জানা উচিত ছিল হৈমন্তী কবে যাচ্ছে।
সুরেশ্বর যেন কী বলতে যাচ্ছিল, অবনী বাধা দিল, বাধা দিয়ে বলল, উনি চলে যাওয়ায় আপনার ক্ষতি হবে না?
হবে প্রথম প্রথম।
না, সেরকম নয়– অবনী কোনও রকমে যেন প্রসঙ্গের মধ্যে আসতে চাইছিল, আপনি বোধ হয় অনেক আশা করে ওঁকে এনেছিলেন। এমনি একটা ডাক্তার জুটিয়ে আনা বলে আমার মনে হয়নি।
সুরেশ্বর সঙ্গে সঙ্গে কোনও জবাব দিল না, তার মুখভাবেরও তেমন কোনও পরিবর্তন চোখে পড়ল না অবনীর। পরে সুরেশ্বর বলল, হ্যাঁ, আশা ছিল। কিন্তু কী করা যাবে, হেম থাকতে পারল না। বলে সুরেশ্বর অল্প থেমে যেন হৈমন্তীর অপরাধের ভার কিছু লাঘব করার জন্যে বলল, কলকাতায় হেমের বাড়ির লোকরাও ওকে ছেড়ে থাকতে পারছে না।
অবনী মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছিল, সুরেশ্বর কীভাবে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে। সরাসরি সে কিছু বলতে চায় না। সুরেশ্বরের চোখমুখ লক্ষ করতে করতে অবনী সিগারেটের বাকিটুকু শেষ করল, করে টুকরোটা জানলা দিয়ে ফেলে দিল।
অবনী বলল, আমি শুনেছি, আপনার ইচ্ছেতেই নাকি ওঁর ডাক্তারি পড়া…
কে বলল? হেম?
গগন।
হ্যাঁ, খানিকটা সেই রকমই। আমার আগ্রহ ছিল, ওরও অনিচ্ছে ছিল না। হেম বেশ বুদ্ধিমতী, পরিশ্রমী। ধীরে সুস্থে বিবেচনা করে দেখতেও পারে। ডাক্তার হিসেবে ভালই। তা ছাড়া ওর অভিজ্ঞতা অল্প; এই তো সবে পাশ করে বেরিয়েছে। দু-পাঁচ বছর পরে আরও ভাল হবে…
অবনী নিরাশ হল; সুরেশ্বরকে হৈমন্তীর বিষয়ে কিছু বলানো যাবে না। বললেও সুরেশ্বর যা বলবে তা অনেকটা মামুলি, যেন হৈমন্তীর চরিত্র এবং ডাক্তারি সম্পর্কে সার্টিফিকেট দিচ্ছে। অবনীর পক্ষেও আর কিছু বলা সম্ভব নয়। তবু শেষবারের মতন, খানিকটা যেন ঝোঁকের মাথায় অবনী বলল, আপনি বোধহয় কোথাও খানিকটা ভুল করে ফেলেছিলেন।
সুরেশ্বর তাকাল।
অবনী বলল, আমার ধারণা, আপনি ঠিক একজন চোখের ডাক্তার চাননি এখানে। আরও কিছু আশা করেছিলেন।
সুরেশ্বর কোনও জবাব দিল না। তার মুখ দেখে মনে হল না, সে অসন্তুষ্ট।
অবনী বলল, আপনার এই আশ্রমের জন্যে আপনার যত মায়া, ওঁর তা ছিল না। আমার মনে হয়েছে, আপনি ডেডিকেটেড, উনি তা নন।
হেম খুব কর্তব্যপরায়ণ… সুরেশ্বর আস্তে করে বলল।
হ্যাঁ, কিন্তু আপনার মতন এই সেবা-টেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেননি।
না, সুরেশ্বর মাথা নাড়ল; তার মাথা নাড়ার মধ্যে হৈমন্তী সম্পর্কে বিরক্তি বা অভিমান ফুটল না। বলল, সকলের স্বভাব এক হয় না; হেমের স্বভাব আলাদা…
আপনি বোধহয় আপনার স্বভাবের মতন কাউকে চেয়েছিলেন।
কী জানি! সুরেশ্বরকে এবার সামান্য বিব্রত দেখাল।
জগতে এই একটা মজা দেখি, অবনী বলল, অনেকে নিজের গরজটা অন্যের গরজ মনে করে নেয়। …
সুরেশ্বর হয়তো কিছু বলত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সংযত করল। তারপর যেন কথাটা হালকা করার জন্যে হেসে বলল, গরজ বড় বালাই। …বসুন, চায়ের জল বোধ হয় ফুটে গেছে। চা নিয়ে আসি৷ আস্তে করে উঠে দাঁড়াল সুরেশ্বর, চেয়ার সরিয়ে চলে গেল।
অবনী বুঝতে পারল না, সুরেশ্বরকে আজ এত নিস্পৃহ এবং উদাসীন দেখাচ্ছে কেন? সাধারণভাবে সুরেশ্বর অনেকটা নিস্পৃহ, কিন্তু কোনও কোনও সময়ে, বিশেষত সাধারণ কথাবার্তায় সে বড় নিস্পৃহ থাকে না। হৈমন্তীর প্রসঙ্গ বলেই কি সুরেশ্বর এত উদাসীন? বা, হৈমন্তী চলে যাচ্ছে–এতে সুরেশ-মহারাজের আত্ম অভিমানে যথেষ্ট ঘা লেগেছে বলেই নিজের ব্যর্থতা এবং আঘাতকে সামলাবার জন্যে ভদ্রলোক এই ধরনের উদাসীনতার আশ্রয় নিচ্ছে।
অবনীর ইচ্ছে হয়েছিল, হৈমন্তীর ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সুরেশ্বরের মনোভাব কী তার একটা আন্দাজ নেবে। নানাভাবে সুরেশ্বরকে বাজিয়েও দেখা গেল সে প্রায় বোবা হয়ে রয়েছে; কিছু বলছে না বলবে না। সুরেশ্বরের যথার্থ মনোভাব বোঝা যাবে বলেও মনে হচ্ছে না। অথচ, অবনী সুরেশ্বরের প্রতি এখন সহানুভূতিও বোধ করছিল। শত হলেও এটা ঠিক, সুরেশ্বর অনেক আশা ভরসা করেই হৈমন্তীকে এনেছিল। শুধু ভেবে দেখেনি, তার বৈরাগ্য হৈমন্তীর চরিত্রে নেই।
