ঠিক কেন যে, অবনী জানে না, কিন্তু হৈমন্তীর কাছে নিজের এই গোপনীয়তা প্রকাশ করার ইচ্ছে। তার হয়। মা কী ছিল, বাবা কে ছিল, কী ভাবে সে মানুষ–এসব কথা এবং ললিতা ও কুমকুমের কথা হৈমন্তীকে জানাতে পারলে ভাল হত। তার সম্পূর্ণ পরিচয় হৈমন্তী জানে না। এখন পর্যন্ত একটা লুকোচুরি থেকে গেছে। হৈমন্তীর তরফ থেকে এরকম কিছু নেই, যেটা ছিল সুরেশ্বরের সঙ্গে তার সম্পর্ক–সেটা অবনীর জানা হয়ে গেছে।
তুমি এসব কথা বলার জন্যে এত ব্যস্ত কেন? অবনী যেন বিড়বিড় করে নিজেকে কথাটা শুধোল। এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা সহজ জবাব পেল। জবাবটা সহজ হলেও তা তার মনঃপূত হল না। কয়েক পা হেঁটে এসে সে অন্য কিছু বলতে যাচ্ছিল, কাছাকাছি গলার শব্দ পেল, কে যেন ডাকল: অবনী দাঁড়াল, তাকিয়ে দেখল সুরেশ্বর।
খোলামেলা মাঠের মধ্যে দিয়ে সুরেশ্বর এল, সামান্য তফাতে ছিল বোধহয়। অবনী খেয়াল করে দেখল তারা আশ্রমের মাঠে মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
কাছে এসে সুরেশ্বর বলল, এদিকে কোথায়…?
এই একটু পায়চারি করছিলাম–অবনী বলল, বলে কী ভেবে আবার বলল, আপনাদের নতুন হাসপাতাল দেখে এলাম।
সুরেশ্বর পা বাড়াল, পাশাপাশি অবনীও হাঁটতে লাগল। সুরেশ্বর বলল, কোনও রকমে তাড়াতাড়ি একটা ব্যবস্থা করা…।
হাঁটতে হাঁটতে অবনী খানিকটা যেন ঠাট্টা করেই বলল, আমার তো আগে বিশ্বাস হয়নি ডাক্তার-টাক্তার আসবে। যাক, শেষ পর্যন্ত এসেছে। আপনার কথাই ঠিক হল।
সুরেশ্বর কিছু বলল না।
মাঠে হালকা জ্যোৎস্না ফুটে উঠেছে, বাতাসে উগ্র গন্ধটা আর আসছিল না। কয়েকটা গাঁদা ফুলের গোল মতন একটা ঝোপ; ঝোঁপের পাশ দিয়ে সরাসরি মাঠ ভেঙে ওরা সুরেশ্বরের ঘরের দিকে এগুতে লাগল।
আপনার কাছেই যেতাম, অবনী বলল, বিজলীবাবু কিছু টাকা পাঠিয়েছে।
সুরেশ্বর ঘাড় ফিরিয়ে অবনীকে দেখল। যেন বলতে চাইল, টাকাটা আপনি বয়ে আনলেন, বিজলীবাবু কই?
অবনী বলল, উনি একটা কাজেকর্মে আটকা পড়েছেন, নয়তো আসতেন।
ওঁর বাড়ির খবর সব ভাল।
খারাপ কিছু শুনিনি।
দুজনেই তারপর হঠাৎ কেমন নীরব হয়ে গেল। দমকা বাতাস এল, ঈষৎ ঠাণ্ডা–মরা শীতের বাতাস, অথচ শুকনো; দুরের গাছপালায় শব্দ হল সামান্য। মাঠেঘাটে কোথাও কুয়াশা নেই, হিমের ঝাপসা ভাবও চোখে পড়ছে না, আকাশ পরিষ্কার।
কাল এখানে একজনের একটু বাড়াবাড়ি গিয়েছে সুরেশ্বর বলল, আজ দুপুর থেকে অবশ্য বেশ ভাল। আমি তারই খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম ডাক্তারের কাছে।
অবনী শুনল। সুরেশ্বরের নতুন হাসপাতাল বা রোগীর কথা সে আর চিন্তা করছিল না। এমনকী বিজলীবাবু তার হাত দিয়ে টাকা পাঠানোয় সুরেশ্বর অসন্তুষ্ট বা ক্ষুণ্ণ হয়েছে কিনা–অবনী তাও ভাবছিল না। সে অন্যমনস্কভাবে হাঁটছিল এবং হৈমন্তীর কথা ভাবছিল। সুরেশ্বরের সঙ্গে হৈমন্তী সম্পর্কে কথাবার্তা বড় কখনও হয়নি। বা যা হয়েছে তা হৈমন্তীর ডাক্তারি হাতযশের। এখন অবনীর জানতে কৌতূহল হচ্ছিল, সুরেশ্বর হৈমন্তী সম্পর্কে আপাতত কী ভাবে! তার কোনও অনুযোগ আছে কি না! থাকা স্বাভাবিক। অথবা সুরেশ্বর নিজের ভুল সম্পর্কে কতটা সচেতন, এমনকী অনুতপ্ত কি না!
যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় অবনী বলল, উনি তো চলে যাচ্ছেন।
সুরেশ্বর কথাটা শুনল, কোনও জবাব দিল না।
অবনী সামান্য অপেক্ষা করল, বলল, আপনার মুশকিলই হল…
সুরেশ্বর এবারও নীরব থাকল। অবনী বুঝতে পারল, সুরেশ্বর প্রসঙ্গটা আলোচনা করতে চায় না। বোধ হয়, অবনীর এবার মনে হল, সে ভুল করেছে; হয় সুরেশ্বর এই ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে আগ্রহী নয়, না হয় সে পরাজিত পক্ষ বলে প্রসঙ্গটায় লজ্জা অনুভব করছে।
অবনী কেমন অস্বস্তি বোধ করল। বোকার মতন এই প্রসঙ্গটা সে কেন তুলল। চুপচাপ, যেন কিছুটা বিব্রত এবং কুণ্ঠিত হয়ে অবনী হাঁটছিল।
সুরেশ্বরের ঘরের কাছাকাছি ওরা পৌঁছে গিয়েছিল। আজ কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না, কলাঝোঁপের দিকে কয়েকটা জোনাকি উড়ছিল, টিমটিমে একটা লণ্ঠনের আলোও যেন সুরেশ্বরের বারান্দায় রাখা হয়েছে।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে সুরেশ্বর হঠাৎ বলল, হেম, অনেকদিন থেকেই যাব যাব করছিল, আমিই তাকে আটকে রেখেছিলাম।
অবনী তাকাল, সুরেশ্বরের গলায় স্বর পরীক্ষা করার চেষ্টা করল। কিছু বোঝা গেল না, বোঝা গেল, সুরেশ্বর মনে মনে বিরক্ত কি না অথবা তার কোনও অনুযোগ আছে কি না।
বাগানের মাঝ দিয়ে তারা ঘরের সিঁড়িতে এসে পা দিল।
অবনী বলল, আপনাকে আবার দেখছি একজন ডাক্তার খুঁজতে হবে…।
খুঁজছি। সুরেশ্বর অন্যমনস্কভাবে জবাব দিল।
ঘরে আসার আগে সুরেশ্বর চৌকাঠের কাছ থেকে লণ্ঠনটা তুলে নিয়েছিল; ঘরে এসে টেবিলের ওপর রাখল। শিষ সামান্য বাড়িয়ে দিল। বলল, বসুন। …আমি আসছি। বলে পাশের ঘরে চলে গেল। অবনী চেয়ার টেনে নিয়ে বসল।
পাশের ঘরে সুরেশ্বরের হাঁটাচলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। মনে হল না, এ বাড়িতে আর কেউ আছে। ভরতুও বোধ হয় নেই। অবনী বসে বসে অন্যমনস্কভাবে একটা সিগারেট ধরাল। হৈমন্তীর প্রসঙ্গটা তুলে সে বোকামি করেছে বলে আগে মনে হয়েছিল, এখন মনে হল–বোকামির কিছু হয়নি। বরং কথাটা না বললে সুরেশ্বর ভাবতে পারত, সব জেনেশুনেও সে কিছু না-জানার ভান করছে। হৈমন্তীর কাছে যার এত আসা-যাওয়া সে কি জানে না হৈমন্তী কলকাতায় চলে যাচ্ছে! জানে নিশ্চয়, জেনেও কথাটা তুলল না। সৌজন্যবশে কিংবা কথার মধ্যেও এ কথাটা একবার বলা স্বাভাবিক ছিল। তবু অবনী কেন বলল না?
