পাশের ঘরে সুরেশ্বর চা তৈরি করতে করতে হঠাৎ গুনগুন করে উঠল। অবনী কান পেতে শোনার চেষ্টা করল, এবং কৌতুক ও কৌতূহল অনুভব করল। সুরেশ্বর গান গাইতে জানে নাকি? সুরেশ্বর যে গান গাইছে তাও ঠিক নয়, একটা সুর গুনগুন করছে।
অবনী ঘড়ি দেখল: সাড়ে সাত। টাকার কথাটা তার খেয়াল হল। পকেট থেকে খামে মোড়া টাকাটা বের করল। ইনসিওরের পুরনো খামে টাকাটা ভরে দিয়েছেন বিজলীবাবু, ওপরে তাঁরই নাম লেখা, পোস্টঅফিসের শিলমোহন। পাঁচশো টাকা সুরেশ্বর ধার করল, বিজলীবাবু অন্তত তাই বললেন। টাকাটা বিজলীবাবু ধার করে এনেছেন, নাকি নিজেই দিয়েছেন–এ-বিষয়ে অবনীর সন্দেহ আছে। সুরেশ্বর যে কিভাবে এই সব টাকা ধার করে, কেমন করেই বা শোধ দেয়, কে জানে। আশ্রমের পেছনে এত খরচ মাসের পর মাস টেনে যাওয়াও কি সহজ কথা!
সুরেশ্বর দুহাতে দুকাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকল, ডান হাতটা অবনীর দিকে বাড়ানো।
অবনী উঠে এগিয়ে গিয়ে চা নিল, নেবার সময় মনে পড়ল, খানিকটা আগে সে হৈমন্তীর ঘরে চায়ের কাপ ভেঙে এসেছে। অকারণে এবার যেন কিছুটা সতর্ক হল।
বসতে বসতে অবনী হেসে বলল, আপনি মশাই গান-টানও গান নাকি?
না, গাই না; কখনও-সখনও ওই একটু সাধ জাগে,সুরেশ্বরও হাসি মুখে জবাব দিল।
এখন কি সাধ জেগেছিল?
সুরেশ্বর হাসল সামান্য, বলল, একটা দোঁহা মনে পড়ে গেল। বলে সামান্য থেমে কেমন আবেশভরা গলায় বলল, গাছের পাতা, মানুষের মতি, আকাশের মেঘ তোমার হাতে ধরা নেই; তোমার হাতে তুমিই শুধু ধরা আছ।
অবনী চায়ে চুমুক দিল; দিয়ে তৃপ্তির শব্দ করল। বাঃ, চা-টি তো দিব্যি করেছেন।
আপনার বাড়িতে আরও ভাল চা খেয়েছি।
অবনীর মনে হল সুরেশ্বরের কথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা ইঙ্গিত রয়েছে, যেন সে বলতে চাইছে– অবনীর বাড়িতে দামি চা আছে, এখানে নেই। হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে টাকার খামটা তুলে নিল অবনী, নিয়ে সুরেশ্বরের দিকে এগিয়ে দিল, টাকাটা..পাঁচশো আছে।
সুরেশ্বর খামটা নিল, নিয়ে পাশ রাখল।
অবনী হঠাৎ বলল, এই আশ্রমের পেছনে আপনি মোটমাট কত টাকা ঢাললেন, মশাই?
সুরেশ্বর তাকিয়ে তাকিয়ে অবনীর মুখ দেখল, তারপর সহজ করে মুখে হাসল, হিসেব করিনি।
কেন, আপনাদের আশ্রমের তো হিসেবের খাতা আছে।
আছে। সে হিসেবের মধ্যে অন্য পাঁচজনের টাকাও আছে।
তা হলে পুণ্যটাও আপনার একার নয়, পাঁচজনের। অবনী হেসে বলল।
সুরেশ্বরও মৃদু হাসল, চা খেতে লাগল।
অবনী একটু পিঠ এলিয়ে বসল, বসে সিগারেট ধরাল। কী যেন ভাবছিল, অন্যমনস্ক। ভাবতে ভাবতে সহসা বলল, শুনেছি, আপনি বেশ ধনী বাড়ির ছেলে।
এ কথা আবার কে বলল? গগন? হালকা করে জবাব দিল সুরেশ্বর।
গগন কেন, বিজলীবাবু বলেছেন, হৈমন্তীও বলেছেন…
কথাটা বাড়িয়ে বলা; আমরা ছিলাম গ্রামের মানুষ, বাবার কিছু জমি-জায়গা সম্পত্তি ছিল।
জমিদারি?
না, তেমন কিছু নয়।
কোথায় বাড়ি ছিল আপনাদের?
সুরেশ্বর নাম বলল দেশের।
অবনী চায়ের কাপে বড় একটা চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখল, এক মুখ ধোঁয়া নিল গলায়; তারপর বলল, আপনার মা বাবা খুব ধার্মিক-টার্মিক ছিলেন নাকি?
ধার্মিক! সুরেশ্বর কেমন বিস্মিত হয়েছিল। বাবার কথা, মার কথা মনে পড়ল। বলল, কেন, ধার্মিক কেন?
না, ছেলেবেলা থেকে সে রকম ক্লাইমেটে মানুষ হলে অনেকের এসব বাতিক হয়। অবনী হালকা ভাবে হেসে হেসে বলল।
সুরেশ্বরও হাসল। কী ভেবে বলল, আমার ছেলেবেলাটা একা একাই কেটেছে বেশি। মার নানারকম ভয়ের বাতিক ছিল। নজরে নজরে থাকতে হত।
ছেলেবেলা থেকেই আপনি তা হলে সুবোধ বালক! অবনী হাসল, ঘরের মধ্যেই বড় হয়ে উঠলেন, জগৎসংসার দেখলেন না।
সুরেশ্বর অবনীর চোখে চোখে তাকাল। যেন সত্যিই ভেবে নিয়েছে সে জগৎ-সংসার দেখেনি।
জীবনটাই চিনলেন না, মশাই। অবনী আবার বলল, নিশ্বাস ফেলল।
সুরেশ্বর বুঝতে পারল না, অবনীর এরকম একটা ধারণা কী করে হয়েছে যে সংসারের কিছুই সে দেখেনি। সংসারে কাকে দেখা বলে? কী চোখে দেখলে দেখা হয়? জীবনের কোন দিকটায় তাকালে তাকে দেখা যায়?
সুরেশ্বর বলল, আপনার এই কথাটা আমি ভাল বুঝতে পারি না। জীবনকে কী চোখে দেখতে হবে?
অবনী প্রশ্নটার কোনও গুরুত্ব দিল না, হালকা করে বলল, মানুষের চোখে।
আমি গাছ নই।
আমাদের মতনও নন।
তফাত খানিকটা থাকে, থাকে না? আপনি আর বিজলীবাবু কি এক?
আমরা সংসারের মানুষ, সাধারণ মানুষের দোষগুণ, অমিল আমাদের আছে। আপনি আমাদের দলে পড়েন না। অবনী এবারও খানিকটা পরিহাস করে বলল।
সুরেশ্বর চায়ের পেয়ালার বাকি চাটুকু শেষ করল। তারপর শান্ত চোখে মৃদু হেসে বলল, অবনীবাবু, আপনাদের চোখে জীবনটা কেমন?
অবনী অনেকটা আলস্যের চোখে তাকিয়ে ছিল, সিগারেটের ধোঁয়ায় মুখ ভরা। ধোঁয়া গিলে নিল অবনী, জিবের সামান্য ধাক্কায় খানিকটা ধোঁয়া বাইরের বাতাসে ছুঁড়ে দিল। সামান্য সময় কোনও জবাব দিল না। পরে ঠাট্টা করে বলল, ফরাসপাতা বিছানা নয়…। বলে সুরেশ্বরের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল, যেন সময় দিল সুরেশ্বরকে, শেষে বলল, আপনি ভাগ্যবান, আমার ভাগ্যটা আপনার মতন হলে কী হত বলা যায় না, তবে আপনার মতন মহারাজ হলে আফশোস থাকত। আমাদের মতন মানুষকে সংসারের পাপতাপে পুড়তে হয় মশাই, সংসারটাকে খুব একটা সুখের জায়গা বলে মনে হয় না।
