হৈমন্তী ঘাড় হেলিয়ে বলল, আসুন।
অবনী চলে গেল।
.
৩০.
নিঃশব্দে বারান্দা পেরিয়ে মাঠে নেমে এল অবনী। মালিনী সিঁড়ির কাছাকাছি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল, অবনী তাকে লক্ষ করল না। মাঠে নেমে কয়েক পা সামান্য দ্রুত হেঁটে আসার পর নিজের চাঞ্চল্য সম্পর্কে যেন সচেতন হয়ে যথাসাধ্য সংযত হবার চেষ্টা করল। চারপাশ তাকিয়ে দেখল, মনে হল যেন চাঁদ উঠেছে কিংবা উঠছে, ঈষৎ জ্যোৎস্না দেখা দিচ্ছে, গাছ এবং ঝোপঝাড়ের ছায়া, অন্ধকুটিরের দিক থেকে একেবারে দেহাতি গলায় গানের মতন একটা সুর ভেসে আসছে। নিজের মনে পায়চারি করার মতন আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল, হাঁটতে হাঁটতে একটা সিগারেট ধরাল।
চায়ের কাপটা যে কী করে হাত থেকে পড়ে গেল, অবনী বুঝতে পারছিল না। এখনও এই সামান্য ঘটনার জন্যে তার অস্বস্তি এবং লজ্জা হচ্ছিল। অবনীর মনে হল, সম্ভবত সে খুব বেশি অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, চায়ের কাপ কাত হয়ে গিয়েছিল একেবারে, তারপর কোনও রকমে গরম চা চলকে তার হাতে পড়তে সে হাত থেকে কাপটা ছেড়ে দিয়েছিল। কাপটা মাটিতে পড়ে ভেঙে যাওয়ায় সে এত লজ্জিত ও বিব্রত হয়ে পড়েছিল যে তার মনে হল, এতটা অন্যমনস্ক হবার কোনও কৈফিয়ত সে হৈমন্তীকে দিতে পারবে না। তার আশঙ্কা হচ্ছিল, হৈমন্তী অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে, কৌতূহল অনুভব করে, বা কোনও কিছু সন্দেহ করে তাকে লক্ষ করছে। অনেকটা যেন উঁকি দেবার মতন করে অবনীকে আড়ালে দেখছে–এ রকম মনে হল। লজ্জায় এবং অস্বস্তিতে, খানিকটা বা গোপনতা প্রকাশ হতে পারে এই উদ্বেগে সে ঘামতে শুরু করেছিল। অবশ্য, অবনীর এখন মনে হল, ললিতা কমলেশকে যেসব কথা বলেছে তা মনে পড়ায় সে ওই মুহূর্তে কিছুটা উত্তেজিত এবং ক্রুদ্ধও হয়েছিল। ললিতা একটা পাঞ্জাবি না সিন্ধি সেলস ম্যানেজারের সঙ্গে বার-এ বার-এ ঘুরে মদ গিলে কাপড়-চোপড় খুলে লুটোপুটি খাচ্ছে কি না, বা সেই সেলস ম্যানেজারের গলা আঁকড়ে পায়ে পা জড়িয়ে বিছানায় ঘুমোচ্ছ কি না– এসব ব্যাপারে অবনীর কোনও আগ্রহ নেই, রাগও নেই। কিন্তু ললিতা অন্য যেসব কথা কুমকুম সম্পর্কে কমলেশকে বলেছে, কিংবা অবনী সম্পর্কে, তাতে অবনী ক্ষিপ্ত হতে পারে, এবং হয়েছে। নিজেকে অপমানিত বোধ করলে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়। কুমকুমের কাছে যদি ললিতা চেঁচিয়ে কুৎসিত ভাবে এসব কথা বলে-তোর ঠাকুমা তো থিয়েটারের মাগী ছিল; তোর বাপের জাত-জন্মের ঠিক নেই…তবে তবে কী হতে পারে! মেয়েটাকে ললিতা এখনও তার বাবার সম্পর্কে বিষিয়ে রাখতে চায়। এতটা বিতৃষ্ণা, বিদ্বেষ এখনও ললিতার থাকা উচিত না। যা হবার হয়ে গেছে; তারপর ললিতা নিজের মর্জি মতন, খেয়াল খুশি মতন দিন কাটাচ্ছে; তার সুখে সম্ভোগে কেউ বাধা দিচ্ছে না; সে তার পছন্দ মতন জীবনের দিকে সরে গেছে; তবু–অকারণ কেন ললিতা মেয়েটাকে তার মতন কুৎসিত কদর্য নোংরা করতে চায়–অবনী বুঝতে পারে না। মানুষের মনে ঘৃণা কত তীব্র হতে পারে, কী ভীষণ ভাবে ভর করতে পারে প্রেত-টেতের মতন, এবং তার ফলে মানুষ কতটা উন্মাদ হতে পারে ললিতা তার উদাহরণ।
অবনী থমকে দাঁড়াল। তাকিয়ে দেখল সে হাঁটতে হাঁটতে সবজিবাগানের দিকে চলে এসেছে। সামনে একটা পেট্রম্যান্স বাতি জলছে। অবনী বুঝতে পারল, নতুন হাসপাতাল-ঘরের সামনে সে এসে পড়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত দেখল: সরু ফালি বারান্দার মাঝামাঝি ঢালু চালের কাঠকুটোর সঙ্গে বাতিটা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে; আলোটা তেমন জোরালো নয়, বারান্দা এবং সামনের মাঠের খানিকটা আলো পাচ্ছে, নীলচে আলো। বারান্দায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না; ঘরের জানলা বন্ধ, দরজা এখনও খোলা; কোনও সাড়া শব্দ আসছিল না। অবনীর মনে হল, বাতিটা সম্ভবত আসা-যাওয়ার সুবিধের জন্যে রাখা হয়েছে। বাতাসে মাঝে মাঝে একটা উগ্র গন্ধ আসছিল, ফিনাইল বা লায়জলের হতে পারে। গন্ধটা অবনীর ভাল লাগল না। এত শান্ত, নিঃশব্দ, অসাড় হয়ে আছে ঘর দুটো যে অবনীর মনে হল, কয়েকটা মানুষ যেন বাতি জ্বালিয়ে কোনও কিছুর ভয়ে নিঃশব্দে বসে আছে।
সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিয়ে অবনী এবার ফিরল। পেছন থেকে পেট্রম্যাক্সের আলোর সামান্য আভা আসছিল; অল্প এগিয়ে আসতেই আবার অন্ধকার, অন্ধকারে খুব পাতলা জ্যোৎস্না ধরেছে। অবনী আবার তার বিহ্বলতার কথা ভাবতে লাগল: আজকাল মাঝে মাঝেই মনে হয় নিজের জীবনের গোপনীয়তা সম্পর্কে সে বেশ উদ্বেগ বোধ করে এবং সতর্ক হয়ে পড়ছে। আগে এসব ছিল। , এটা তো কোনওমতেই নয়। আত্মসম্মান বোধটাও এখন যেন অভিমানের মতন হয়ে উঠেছে। ললিতার সঙ্গে যখন তাকে থাকতে হত তখন ললিতা এমন বহু কথা বলেছে যাতে আত্মসম্মান থাকে না; অথচ অবনী সে সময় বড় একটা ক্ষেপে উঠত না, বরং উপেক্ষা করত, পালটা একটা জবাব দিত– রুক্ষ, তিক্ত, পালটা জবাব। হয়তো তখন জবাব দেবার সুযোগ ছিল বলেই এতটা লাগত না; আজকাল লাগে। মনে হয় তাকে কেউ দেওয়ালে পিঠ লাগিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যেন নির্বিচারে আঁচড়ে কামড়ে খিমচে মুখে থুতু ছিটিয়ে চলে যাচ্ছে–সে পালটা কিছু করতে পারছে না। ফলে রাগটা আরও বাড়ে, আক্রোশ হয়।
না, এসব কিছু না–অবনী মাথা নাড়ল: আক্রোশ, রাগ-টাগ সব বাজে। আসলে সে এখন নিজের জীবনের এইসব গোপনীয়তা নিয়ে কখনও কাতর, কখনও শঙ্কিত, কখনও বা বিব্রত হয়ে পড়েছে। এক এক সময় মনে হয়, যেন কেউ তার দু-হাতে হাতকড়া দিয়ে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে হৈমন্তী, গগন, সুরেশ্বর তাকে দেখছে; নিজের মুখ দুহাতে সে ঢেকে ফেলেছে অবশ্য, তবু হাতকড়ার আলগা শেকল গালে অনবরত ঘষে যাচ্ছে। নিজের মুখ ঢাকলেও সে যে নিজেকে লুকোতে পারছেনা তা নয়, তবু চোখাচোখি হয়ে যাবার ভয়ে বা ওদের বিস্মিত ধিক্কার-দৃষ্টি সহ্য করার গ্লানি সে এড়াতে চাইছে বলে মুখ ঢেকেছে।
