হৈমন্তী চলে গেল। অবনী বসে থাকল। জানলা দিয়ে সন্ধের ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে, বাইরে কোথাও চিপ চিপ করে একটা পোকা ডাকছে, গাছপাতার মৃদু খসখসে শব্দ, অবনী অন্যমনস্ক, শূন্যদৃষ্টি, হৈমন্তীর বিছানার দিকে তাকিয়ে কিছু যেন ভাবছিল।
হৈমন্তী ফিরে এল।
মালিনী বলছিল– হৈমন্তী বলল, অফিসে ওর ভাইকে একটা খবর দিয়ে দিতে: ও ভাল আছে। ওর মা খুব চিন্তা করেন, এখানে অসুখ-বিসুখ…
অবনী তাকাল, হৈমন্তীকে দেখল। ও বাড়ি যায় না?
যায়; তবে এখন আর যেতে পারছে না।
কেন? ও কী করে?
কী আর, এই কাজকর্ম। ওর দাদাকে দেখাশোনা করে… হৈমন্তী যেন একটু ব্যঙ্গ করল।
অবনী বুঝতে পারল। কিছু বলল না।
হৈমন্তী বসল। দু-এক মুহূর্ত চুপচাপ। তারপর বলল, আমি আগামী রবিবার যাচ্ছি। গগনকে চিঠি লিখে দিয়েছি।
আগামী রবিবার ..কত তারিখ পড়ছে?
উনিশ কুড়ি হবে– হৈমন্তী হিসেব করল, করে শুধরে নিয়ে বলল, উনিশ তারিখ।
অবনী যেন মনে মনে দিন-ক্ষণ ভেবে নিল। বলল, যাবার আগে আমাদের ওদিকে আসুন একদিন।
ফেয়ারওয়েল নিতে? হৈমন্তী হাসল।
অবনীও হাসির মুখ করল। এক রকম তাই।
যাব। বিজলীবাবুর বাড়িতে দেখা করে না গেলে খারাপ দেখাবে।
কবে যাবেন?
পরশু দিনও যেতে পারি।
পারি কেন, আসুন। পরশুই আসুন।
আজকাল খেয়াল মতন বাস আসে। প্যাসেঞ্জার না থাকলে দুপুরে আসেই না।
যে কোনও বাসে চলে আসুন। সকালে হলেই ভাল। …আমরা ফেয়ারওয়েলের জন্যে ফুলের তোড়া মালা-টালা ঠিক করে রাখব। অবনী ঠাট্টা করে হাসতে হাসতে বলল।
হৈমন্তী ভ্রূ-ভঙ্গি করে তাকাল। হেসে বলল, কলকাতায় যেতে যেতে ফুল সব শুকিয়ে ঝরে যাবে। গগনকে আমি বিশ্বাস করাতে পারব না, আমার ফেয়ারওয়েল হয়েছিল।
অবনী জোরে জোরে হাসতে লাগল। পরে বলল, আমিও কলকাতা যাচ্ছি। এমনভাবে বলল যেন প্রয়োজন হলে সে গগনের কাছে সাক্ষী দিতে পারে।
আপনিও যাচ্ছেন! কবে?
একটু দেরি আছে। আসছে মাসে।
অফিসের কাজে?
অফিস…! না; কলকাতায় আমাদের অফিসের কিছু নেই, আমাদের সব পাটনায়। বলতে বলতে অবনী থামল, প্রথমে মাটির দিকে তাকাল, পরে ছাদের দিকে। মনে হল সে প্রসঙ্গান্তরে এসে খানিকটা অস্বস্তিতে পড়ছে।
মালিনীর পায়ের শব্দ উঠছিল বারান্দায়; চা নিয়ে ঘরে এল।
হৈমন্তী উঠে মালিনীর হাত থেকে চায়ের পেয়ালা নিল, নিয়ে অবনীর দিকে বাড়িয়ে দিল।
মালিনী চলে গেলে হৈমন্তী নিজের জায়গায় এসে বসল। অবনী চায়ে চুমুক দিয়েছে মাত্র। তার মুখ এখন কেমন গম্ভীর, অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল।
হৈমন্তী বলল, তবে কলকাতায় কেন? বেড়াতে?
অবনী কিছু বলল না, মাথা নাড়ল আস্তে; না বেড়াতে নয়।
হৈমন্তী সপ্রশ্ন চোখে তাকিকে থাকল।
অবনী মুখ ফিরিয়ে দরজায় দিকে তাকিয়ে ছিল। কলকাতা থেকে কমলেশ এসেছিল। চিঠিতে সব হয় না, কথাবার্তা ছিল অনেক। ললিতা এখন পুরোপুরিভাবে অন্যের কাছে থাকছে। কুমকুমকে বাপের বাড়িতে রেখে দিয়েছে, মাসি মামার কাছে। আসে কখনও কখনও। তার নামের টাকাটা নেয়। ললিতা বুঝে ফেলেছে, কুমকুম হঠাৎ বাপের সোহাগী হয়ে গেছে: শয়তানের মেয়ে তো, ওই এক রত্তি হলে কি হবে পেটে পেটে শয়তানি। কমলেশকে ললিতা আরও অনেক কিছু বলেছে: রাখো, রাখো, ন্যাকামি করো না। আমি জানি ওই হারামজাদি তার পেয়ারের বাপকে চিঠি লেখে। … তুমি তো তোমার বন্ধুর স্পাইগিরি করছ। আমি বারে গিয়ে মদ গিলি এসব তুমি বলেছ। মেয়ে জেনেছে তো আমার বয়েই গেছে। পেটে ধরেছি তা কী হয়েছে, আমার অত মা-মা আদুরেপনা নেই। আমি না হলে অন্য কেউ তোমার ওই গুণধর বন্ধুর মেয়ে পেটে ধরত না। আমি কেয়ার করি না, যাও যাও তোমার বন্ধুকে লিখে দিয়ো…ডিভোর্সের ব্যবস্থা করুক..আমি অ্যাডালট্রেস…হ্যাঁ–বেশ করি আমি অন্য লোকের সঙ্গে থাকি। থাকব, থাকব। নিয়ে যাক তার বাপ মেয়েকে। মেয়ে একবার চিনুক কেমন বাপ। কুত্তা, বংশের ঠিক নেই, যার মা থিয়েটারের মাগী ছিল, বাপ…
ঠননন করে শব্দ হল। চমকে উঠল অবনী। তার হাত থেকে চায়ের কাপটা মাটিতে পড়ে ভেঙে ছড়িয়ে গেছে।
হৈমন্তী চমকে উঠেছিল। ভাঙা পেয়ালা, ছড়ানো চা, অবনীর সচকিত বিহ্বল ভাব–দেখতে দেখতে হৈমন্তী অবাক হয়ে বলল, কী হল?
অবনীর কপালে ঘাম ফুটে উঠেছিল। গলার কাছটাও জল। তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে ট্রাউজাসের ওপর থেকে চা ঝেড়ে ফেলতে লাগল; পকেট থেকে রুমাল বের করল। বিব্রত, আড়ষ্ট। না হঠাৎ কেমন হাতটা… বড্ড গরম…। অবনী কপাল মুখ মুছে ফেলল। অতিরিক্ত বিহ্বল যেন।
শরীর খারাপ লাগছে?
না, না। মুখ মুছে অবনী নিজেকে সামলে নেবার চেষ্টা করল, বুঝতে পারলাম না হঠাৎ কেমন…
মাথা ঘুরে গেল?
না।
অন্য দিকে তাকিয়ে কি অত ভাবছিলেন?
কিছু না। তেমন কিছু নয়।
বাঃ ভাবছিলেন–
সেরকম সিরিয়াস কিছু নয়। …হঠাৎ পুরনো একটা কথা মনে পড়ল..অবনী যথাসাধ্য সংযত ও সুস্থ হবার চেষ্টা করল। ছি ছি, কাপ-টাপ ভেঙে একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড করে ফেললাম। অবনী লজ্জিত।
জামা-টামায় যে একরাশ চা ফেললেন– হৈমন্তী উঠে জল গড়িয়ে দিতে গেল।
উঠে যাবে। অবনী বলল।
গেলে ভাল। তবে এমন দাগ যায় না।
অবনী তাকাল, হৈমন্তীর দৃষ্টি লক্ষ করল। মনে হল, হৈমন্তীর বিস্ময় ও কৌতূহল যেন আরও গভীর হয়েছে।
জল দিয়ে চায়ের দাগ মুছতে মুছতে অবনী বলল, আমি সুরেশ্বরবাবুর ওখান থেকে ঘুরে আসি। টাকাটা না দেওয়া পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছি না।
