ডাক্তার-টাক্তার এসেছে?
হ্যাঁ; ডাক্তার, নার্স, সিস্টার, ওষুধপত্র…। ব্যবস্থা ভালই হয়েছে।
রোগী?
আসছে। এখন চারজন রয়েছে। দশটা বেড।
তার কী হল? সেই যে–যে-ছোকরা এসেছিল?
হরিকিষণের ভাই! …বেচারি মারা গেছে।
অবনী মুখ ফিরিয়ে তাকাল, আহত ও ব্যথিত হয়েছে। চুপচাপ। হৈমন্তীর পাশাপাশি বারান্দায় এল। মালিনীর গলা শোনা যাচ্ছে, তার ঘরে কেউ আছে, কথা বলছে জোরে জোরে।
হৈমন্তী নিজের ঘরের সামনে এসে দরজার শেকল খুলল। মালিনী ঘরে বাতি জ্বেলে রেখে গেছে। বাতির শিষ নামানো, আলোর একটু ভাব হয়ে আছে ঘরে; হৈমন্তী এগিয়ে এসে বাতির শিষ বাড়িয়ে দিল, জানলা খোলা, বাতাস আসছিল।
অবনী বলল, আমাদেরও একটা কুলি মারা গেছে শুনলাম। কুলি ক্যাম্পে ছিল, শরীর খারাপ হওয়ায় বাড়ি গিয়েছিল, সেখানেই মারা গেছে।
হৈমন্তী কিছু বলল না; বলার কিছু নেই। অবনী দাঁড়িয়ে আছে।
সামান্য পরে হৈমন্তী বলল, আমার কেমন মনে হচ্ছে, রোগটা এইবার আস্তে আস্তে যাবে।
যাবে!
আবার কী! মাস দুয়েক হতে চলল। …এতদিন কেউ গা করেনি, নয়তো এতটা বাড়াবাড়ি হত না। এখন গা লেগেছে। …ওমা, আপনি দাঁড়িয়ে থাকলেন যে, বসুন… বলে মাঝপথে যে কথাটা ছেড়ে এসেছিল আবার সেটা ধরল, এতদিনে বেশ চাড় হয়েছে। তা ছাড়া, এই রোগটা একেবারে আচমকা, অদ্ভুত ভাইরাস থেকেই হচ্ছে বোধহয়। গোড়ায় গোড়ায় ধরা পড়লে মরার তেমন ভয়ও নেই। কমপ্লিকেশান হয়ে গেলেই মুশকিল।
অবনী বসল। বলল, আপনি কি মত পালটাচ্ছেন নাকি?
না। কেন?
কথা শুনে মনে হচ্ছে, অবনী হাসল, হঠাৎ এতটা অভয় দিচ্ছেন—
না, না। হৈমন্তী মাথা নাড়ল। আমি তো এমনিতেই যাচ্ছি।
অবনী এবার কিছু বলল না। অল্প সময় চুপচাপ। হৈমন্তী বিছানার একপাশে বসেছে।
শেষে অবনী বলল, সুরেশ্বরবাবু এখন কী করছেন? তাঁর ক্রিয়াকর্ম আপাতত কী?
এখন তো খুবই ব্যস্ত। এই এখানে নতুন হাসাপাতালের ব্যবস্থা করা…থাকা-টাকার ব্যাপার ঠিক করে দেওয়া। তা ছাড়া শুনছি, শিবনন্দনজিকে এদিক ওদিক পাঠাচ্ছেন, যেন গাঁ গ্রামে কারও অসুখ করলে সঙ্গে সঙ্গে এখানে চলে আসে৷
অবনী শুনল। শুনতে শুনতে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। সেদিন–আপনার এখান থেকে ওঁর কাছে গেলাম, বিজলীবাবু ছিলেন, মেজাজটা কেন যেন ভাল ছিল না, খানিকটা তর্কাতর্কি হয়ে গেল!
হৈমন্তী অবনীর চোখ মুখ লক্ষ করল। মনে হল অবনী সেদিনের কোনও বিরূপতা অথবা তিক্ততা আজ আর মনে রাখেনি।
কী নিয়ে তর্ক? হৈমন্তী জানতে চাইল।
অবনী সে-কথার জবাব দিল না। বলল, ভদ্রলোক সংসারের কিছু দেখেননি। একেবারে অন্ধ।
হৈমন্তী কিছু বলল না, বরং সকৌতুক চোখে তাকিয়ে থাকল, যেন সংসার সম্পর্কে অবনীর কতটা অভিজ্ঞতা আছে জানার কৌতূহল সে অনুভব করছিল।
অবনী সিগারেট ধরাল; সামান্য হেসে বলল, ভদ্রলোক বোধহয় মনে মনে ক্ষুণ্ণই হয়েছেন। আমি পরে একটু লজ্জাই পাচ্ছিলাম।
ওই একটা তুচ্ছ কথাতেই ক্ষুণ্ণ হবে…
না, একটা নয়; আরও কী যেন সব বলেছিলাম। বলে অবনী যেন নিজের সেদিনের ব্যবহারে লজ্জিত হয়ে হাসল। পরে বলল, আমায় একবার সুরেশ-মহারাজের কাছে যেতে হবে…..
মাপ চাইতে–? হৈমন্তী পরিহাস করে বলল।
না অবনী সরল গলায় হাসল, মাপ চাইতে নয়। ওঁকে কিছু টাকা দেবার আছে।
টাকা? হৈমন্তী বিস্মিত হল।
আমার মনে হয় উনি কিছু টাকার টানাটানিতে পড়েছেন; বিজলীবাবুকে বলেছিলেন। টাকাটা এনেছি।
আপনি কি আশ্রমে দান করছেন নাকি?
আমি! না, আমি দান করব কেন? আমার টাকা কোথায়! বিজলীবাবু দিয়েছেন। …উনি নিজে এসে দিলেই ভাল হত। আসতে পারলেন না।
ও! হৈমন্তী অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিলে।
অবনী সিগারেটের ছাই ফেলতে গিয়ে ট্রাউজার্সে ফেলল, হাত দিয়ে ঝেড়ে নিল। বলল, একবার, এই আশ্রম করার সময় সুরেশ্বরবাবু কিছু চাঁদার জন্যে আমায় বলেছিলেন, আমি দিইনি। ..তখন এসব আমার পছন্দ হত না। ……চাঁদা-টাঁদার জন্যে আর কখনও আমায় কিছু বলেননি উনি। …এই টাকাটা বোধ হয় ধারকর্জ করলেন। আমাদের স্টেশনের দিকে ওঁর কিছু মাড়োয়ারি ভক্ত আছে।
হৈমন্তী নীরব থাকল।
অবনী কিছু সময় অপেক্ষা করে বলল, টাকাটা বিজলীবাবু নিজেও দিতে পারেন, জানি না। আমায় তো তা বললেন না। লজ্জায় বোধহয়।
কী জানি। হৈমন্তী পরিহাস করে বলল, আপনিও দিতে পারেন; লজ্জায় বলছেন না।
না না, অবনী মাথা নাড়ল জোরে, আমি নয়।
অত না না-র কিছু নেই। দিলেই বা– হৈমন্তী হেসে উঠল, সৎ কাজে দিচ্ছেন তো৷
অবনীও হাসল। তখন দিইনি ঠিক, কিন্তু এখন যদি সুরেশ-মহারাজ আমায় বলতেন, হয়তো যথাসাধ্য সাহায্য করতাম।
করতেন! ..তবে তো আপনিও দেখছি ওঁর ভক্ত।
ভক্ত নয়। তবু ভদ্রলোককে কোনও কোনও ব্যাপারে আমার ভাল লাগে।
আগে লাগত না
আগে এতটা পরিচয় ছিল না। জানতাম না তেমন। এখন মোটামুটি একটা ধারণা করতে পারি। অবনী ধীরস্থির গলায় বলল, সামান্য অন্যমনস্ক। দোষ যে নেই তা বলব না, দোষ আছে ভদ্রলোকের, অন্তত আমার চোখে। তবু, মানুষটি ভাল।
হৈমন্তী শেষবারের মতন যেন পরিহাস করার চেষ্টা করল, এত প্রশংসা–।
সুরেশ-মহারাজের নিন্দেও কম করিনি, একটু আধটু প্রশংসা করলে ক্ষতি কী! অবনী হেসে জবাব দিল।
আর কোনও কথা হল না। দুজনেই চুপ করে থাকল। হৈমন্তী বসে থাকতে থাকতে উঠল, বসুন, মালিনী আছে কি না দেখি, চা খেয়ে যান।
