মালিনী চা নিয়ে এল। ততক্ষণে হৈমন্তী এলো করে খোঁপা বেঁধে নিয়েছে।
মালিনী বলল, আজ উনি আসবেন নাকি, হেমদি?
উনি অর্থে অবনী, হৈমন্তী বুঝতে পারল; বলল, কেন?
না–তা হলে… মালিনী বোধহয় দ্বিধায় অথবা লজ্জায় সামান্য ইতস্তত করল। শেষে বলল, বাড়িতে মা বড় ভাবে, হেমদি; এখানে তো অসুখ-বিসুখ। যদি উনি আসেন–একটু বলে দেবেন, আমি ভাল আছি। আমার ভাইকে উনি অফিসে একটিবার বলে দিলেই হবে।
হৈমন্তী ঘাড় নাড়ল, বলল, যদি আসেন, বলে দেব।
মালিনী চলে গেল।
চা খেতে খেতে হৈমন্তী অবনীর কথা ভাবল। অবনী কি আজ আসবে? সেদিনের পর আর আসেনি। বলেছিল, কোন ওপরঅলা নাকি আসবে, সঙ্গে আরও সব লোক–খানিকটা ঘোরঘুরি করতে হবে। আজ প্রায় ছ-সাত দিন হয়ে গেল, অবনীর কাজ যে ফুরোয়নি এমন তো মনে হয় না। তবু কেন আসছে না কে না জানে! কোথাও গিয়েছে, নাকি কোনও কাজে আটকে পড়েছে বোঝা যাচ্ছে না। চা খেতে খেতে অন্যমনস্কভাবে হৈমন্তী অবনীর কথা ভাবছিল, তারপর কী মনে পড়ায় হেসে ফেলল। ভদ্রলোক এলে কথাটা বলতে হবে: কী, আপনি আমার ফেয়ারওয়েলের ব্যবস্থা করছিলেন নাকি? কী দিচ্ছেন-টিচ্ছেন বলুন, আগে ভাগে শুনেনি। এই হালকা চিন্তাটা কয়েক মুহূর্ত মন বেশ সকৌতুক করে রাখল, পরে কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে আসতে লাগল।
ভাল লাগছিল না। ঘরের মধ্যে ছায়ার রং পেনসিলের সিসের মতন কালো ও গম্ভীর হয়ে আসার আগেই হৈমন্তী বাইরে চলে এল, গায়ে পাতলা একটা চাদর, দুপুরের সাদা শাড়িটাই পরনে। মাঠে নামতে আকাশে চোখ পড়ল, আলো প্রায় নেই, মেঘের গা কালচে হয়ে এসেছে, দক্ষিণের এলোমেলো বাতাস, কুয়ায় জল উঠলে–লাটা খাম্বার ওঠানামার শব্দ, এপাশে কয়েকটা গাঁদাফুল, কিচমিচ কিচমিচ শব্দ, নিমগাছের দিকে এক ঝাঁক চড়ুই উড়ে গেল।
হাঁটতে হাঁটতে প্রায় জামতলা, আগে এসময় অন্ধকার হয়ে যেত, হিম পড়ত; এখন হিম পড়ছে না, ঠাণ্ডা নেই, পথ-ঘাটও দেখা যাচ্ছে। মিশনারি থেকে আসা সেই সিস্টার আর পারবতাঁকে দেখা গেল, নদীর দিকটার পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছে।
হৈমন্তী উলটো পথেলাঠটার দিকের পথ ধরে হাঁটতে লাগল। আকাশে কোথাও আর নীলের ভাব নেই, পশ্চিমে সামান্য লালচে ভাব আছে এখনও, সূর্য ডুবে যাবার পর যেন মেঘের গা গড়ানো অবশিষ্ট আলো, এখুনি মুছে যাবে। দৃশ্যটা কেমন বেদনা দিল। সেই বিষণ্ণতা যেন কাটছে না। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, এখান থেকে চলে যাবার সময় হৈমন্তীকে কী যেন ফেলে যাচ্ছে। কিছু খেয়াল না করে হৈমন্তী হাঁটতে লাগল, হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ গুনগুন করে কী যেন গাইবার চেষ্টা করল, অথচ পারল না।
এ-রকম কেন মনে হয়! সে তত বাস্তবিকই কিছু ফেলে যাচ্ছে না। ব্যর্থ, হতাশ, তিক্ত বিরক্ত হয়েই সে চলে যাচ্ছে, তবু এমন কেন মনে হচ্ছে।
আলো ফুরিয়ে অন্ধকার হয়ে আসার সময় হৈমন্তী ফিরছিল, তখন সে গাড়ির শব্দ শুনতে পেল, দূরে। আলো পড়ছিল রাস্তায়।
অবনী আসছে। অবনী আসছে এই চিন্তাটা হঠাৎ যেন এতক্ষণের নৈরাশ্য দূর করল। মাঝরাস্তা থেকে সরে গেল হৈমন্তী, আর সহসা তার খেয়াল হল সে যদি আরও খানিকটা মাঠের দিকে সরে যায় অবনী তাকে দেখতে পাবে না। গাড়ির আলোর বাইরে লুকোবার জন্যে যেন ছেলেমানুষের মতন হৈমন্তী মাঠে নামল, মাঠে নেমে তাড়াতাড়ি সরে যেতে লাগল।
গাড়িটা কাছে এল, একেবারে কাছাকাছি। চলেই যাচ্ছিল যেন, যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখতে পেয়ে গেছে অবনী।
হৈমন্তী হঠাৎ কেমন লজ্জিত হল। নিজের ছেলেমানুষির জন্যে সঙ্কুচিত হয়ে আস্তে আস্তে কাছে এল।
ওদিকে কোথায়? অবনী শুধোল।
জবাব দেবার তেমন একটা আগ্রহ দেখাল না হৈমন্তী; গাড়ির পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল।
আসুন– অবনী গাড়িতে উঠতে বলল।
সামান্য পথ, হেঁটেও যেতে পারত হৈমন্তী; তবু গাড়িতে উঠল।
মাঠের মধ্যে নেমে গিয়েছিলেন কেন? অবনী আবার শুধোল।
এমনি; মাঠে একটু বেড়াচ্ছিলাম।
ডাকলেন না তোত আমায়? অবনী বলল।
হৈমন্তী ভেবেচিন্তে বলল, ডাকার আর কী ছিল, আমিও তো ফিরছিলাম। …
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল।
আপনি কি আমার ফেয়ারওয়েলের ব্যবস্থা করছিলেন নাকি এ কদিন? হৈমন্তী বলল, গলায় খানিকটা পরিহাস, খানিকটা বা গাম্ভীর্য।
অবনী প্রথমটায় বুঝতে পারেনি, পরে বুঝতে পেরে হাসল। বলল, না, এখনও করিনি। …ভাবছি ওটা বিজলীবাবুর কাঁধে চাপিয়ে দেব।
নিজের কাঁধ পরিষ্কার রেখে পরের কাঁধে বোঝা চাপানো! খুব চালাক লোক আপনি। হৈমন্তী বলল, বলে হাসল। অবনীও হাসতে লাগল।
দেখতে দেখতে অন্ধ আশ্রমের ফটকের কাছে গাড়ি এসে পড়ল। হৈমন্তী বলল, আপনার সেই ওপরঅলারা এসেছিল?
এসেছিল।
খুব ব্যস্ত ছিলেন কাজেকর্মে?
না; ওপরঅলারা একদিন থেকেই পালাল। …এপিডেমিকের ভয় দেখিয়ে তাড়ালাম। অবনী হাসল।
তবে?
আমার এক বন্ধু এসেছিল, অবনী বলল, কলকাতা থেকে।
হৈমন্তী তাকাল, কিছু বলল না।
গাড়িটা হৈমন্তীর ঘরের কাছে থামাল অবনী, থামিয়ে স্টার্ট বন্ধ করল। বাতি নেবাল।
হৈমন্তী নামল, অবনীও নেমে পড়ল।
এখানে নতুন হাসপাতাল হয়েছে, জানেন? হৈমন্তী বলল।
নতুন হাসপাতাল। …ও সেই.যা বলছিলেন। ..কোথায়?
হৈমন্তী আঙুল দিয়ে সবজি বাগানের দিকটা দেখাল। এখান থেকে কিছু দেখা যায় না। পেট্রম্যাক্স বাতিটা আজ ওদিকে জ্বলছে।
