নিতে পারলে ভাল ছিল। চল্লিশ মাইল টানা হেঁচড়া। কেই বা নিয়ে যায়?
কাল সকালে একটা ব্যবস্থা করতে পারি।
কী ব্যবস্থা? আপনি পৌঁছে দিয়ে আসবেন?
অবনী অন্যমনস্কভাবে বলল, ভাবছি।
হৈমন্তী কয়েক পলক তাকিয়ে থাকল, পরে বলল, না। …যে এনেছে এ দায়িত্ব তার। রাস্তার মধ্যে রোগী মরলে সে দোষ হবে আমার, আপনার।
অবনী ভাবল; বলল, এখানে এভাবে রোগী পড়ে থাকলেই কি সে বাঁচবে। তা ছাড়া আমার ভয় হচ্ছে যদি আপনার কিছু হয়…! রোগটা এখানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অবনীর গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যা হৈমন্তীকে অকস্মাৎ কেমন দুর্বল ও অভিভূত করল। সুরেশ্বর কোনওদিন এ চিন্তা করেনিঃ ভাবেনি যে হৈমন্তীরও আপদ-বিপদ হতে পারে। মুখে সে অনেক ভাল ভাল কথা বলেছে, কাজে হৈমন্তীর জীবনের মূল্য বড় দেয়নি।
অবনী সিগারেট ধরাচ্ছিল। হৈমন্তী লাইটারের আলোর শিখা দেখল, সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ পেল। কেমন যেন বেহুশে ছিল কিছুক্ষণ, হুঁশ হলে বলল, আমার কিছু হবে না। ডাক্তারদের রোগ হয় না। বলে হাসবার চেষ্টা করল। তারপর আলোর দিকে তাকাল, তাকিয়ে থাকল, যেন কিছু দেখছে; শেষ বলল, যে কয়েকটা দিন আর আছি–অশান্তি করে লাভ নেই। …
এভাবে থেকেও তো আপনার শান্তি হচ্ছে না।
না। তবে..দু-চারদিনের মধ্যেই আমার দায়িত্ব ফুরোবে।
অবনী বুঝতে পারল না, তাকিয়ে থাকল।
হৈমন্তী বলল, কী বলে যে–মেডিকেল রিলিফ–তাই আসছে। দু-একজন ডাক্তার, নার্স, ওষুধপত্র। আপনাদের সুরেশ-মহারাজ এখানে তাদের হাসপাতাল খুলতে ঘর দিয়েছে। তারা আসবে, থাকবে, চিকিৎসা করবে। আমার কোনও দায়িত্ব থাকবে না।
অবনী বিশ্বাস করতে পারছিল না, গুজব, নাকি সত্যি?
হৈমন্তী মাথা নাড়ল, না, গুজব নয়। …আজ বিকেলেই টাউন থেকে সরকারি লোকজন এসেছিল গাড়ি করে। কথাবার্তার সময় আমি কিছুক্ষণ ছিলাম।
অবনীর হঠাৎ সেই স্টেশন ওয়াগনের কথা মনে পড়ল, আসবার সময় পথে যেটা দেখেছে। অবনী বলল, আসবার সময় একটা সরকারি স্টেশন ওয়াগন দেখেছিলাম। সেটা নাকি?
হৈমন্তী ঘাড় নাড়ল। হ্যাঁ, সেটাই।
দুজনেই তারপর নীরব হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে অবনী বলল, আপনাদের চোখের হাসপাতালটা তা হলে এপিডেমিকের হাসপাতাল হচ্ছে?
এখন কিছুদিনের জন্যে। ..আগে প্রাণ, পরে না চোখ.. হৈমন্তী ম্লান হাসল।
অবনী সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দেবার আগে এক মুখ ধোঁয়া গলায় নিল; বলল, এবার বোধহয় আপনি ফিরতে পারেন।
পারি।
কবে?
ইস…আপনি আমায় তাড়াবার জন্যে বড্ড যে ব্যস্ত।
অবনী কী যেন বলতে গিয়েও পারল না। বরং কেমন বিব্রত ও আড়ষ্ট বোধ করল। শেষে সামলে নিয়ে হেসে বলল, না, কবে যাচ্ছেন জানা দরকার, আমরা আপনাকে একটা ফেয়ারওয়েল দেব।
হৈমন্তী হাসল না; অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে থাকল।
.
২৯.
দিন কয়েকের মধ্যে ওরা এসে পড়ল: অল্পবয়সী দুই ডাক্তার, দুজন মেলনার্স, গুটি দুয়েক সিস্টার, আধবুড়ো গোছের এক কম্পাউন্ডার, একজন জমাদার। আর এসেছিল প্যাকিং বাক্সের পেটি করে ওষুধপত্র; সেই সঙ্গে কয়েক টিন ফিনাইল, ব্লিচিং পাউডার, কয়েকটা নতুন লণ্ঠন, একটা পেট্রম্যাক্স বাতি, মাঠে খাটাবার জন্যে তাঁবু–এইসব। সদর থেকে হাকিম এসেছিলেন, সঙ্গে বুঝি সিভিল সার্জন; তদারক করে গেলেন। সরকারি একটা ভ্যানও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ওষুধটষুধ নিয়ে ঘুরে গেল।
সবজিবাগানের দিকে, কিছুটা ফাঁকায় খাপরা-ছাওয়া বড় বড় ঘর ছিল দুটো; এক সময় বেত-তে থাকত, বেতের আর দড়ির কাজকর্ম করত অন্ধরা, এখন বেতের কাজ হয় অন্য ঘরে, ঘর দুটো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিয়ে, কোনও কোনও জায়গায় খাপরা বদল করে সেখানে হল হাসপাতাল; দড়ির খাঁটিয়া পড়ল গোটা দশেক। কাছাকাছি আর কোনও ঘর ছিল না; পুরনো তাঁত-ঘরের একপাশে বসল ডিসপেনসারি। আগে যে-দালানে চোখের রোগীরা দু-চার দিন থাকত–সেই রোগী-ঘর ফাঁকা পড়েছিল এখন; ডাক্তার, মেল নার্স আর কম্পাউন্ডারের থাকার জায়গা হল সেখানে। সিস্টার দুজনের একজন এসেছে মিশনারি থেকে, আদিবাসী-টাসী হবে, কালো বেঁটেখাটো চেহারা, অন্যজন বেহারি মেয়েনাম পারবতী, বছর পঁচিশ বয়েস বড়জোর, লম্বা ছিপছিপে তামাটে চেহারা, মুখে বসন্তের দাগ। সিস্টার দুজনকে হৈমন্তীদের পাশাপাশি, গগন যে-ঘরে ছিল, সেই ঘরটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
অন্ধ আশ্রমে চোখের রোগী আর আসছিল না। চোখের হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আপাতত। যুগলবাবু হাসপাতাল-ঘরে তালাচাবি দিয়ে অন্য কাজে মন দিয়েছেন। তাঁত-ঘরে অন্ধদের কাজকর্ম খুব সামান্যই হয়; বেত বোনা-টোনা, দড়ির কাজ এখন আর হচ্ছে না।
গুরুডিয়ার অন্ধ আশ্রমের জীবন যে আর স্বাভাবিকভাবে বইছে না–এটা বোঝা কষ্টকর ছিল না। সকাল দুপুরে বাসগুলো নিয়মিত আর আসে না, যাত্রী নেই; রোগীও আসছে না; জামতলায় ভিড় হয় না দুপুরে, অন্ধ আশ্রম যেন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে।
নতুন হাসপাতাল খোলার সঙ্গে সঙ্গেই গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে শিবনন্দনজি দুই মরণাপন্ন রোগী এনে হাজির করলেন কোনও গাঁ গ্রাম থেকে। পরের দিন আর-একটা এল। তাঁত-ঘরের হরিকিষণের ভাই ইতিমধ্যে মারা গেল। বহু চেষ্টাতেও বেচারিকে বাঁচানো গেল না। একেবারে মাঝদুপুরে–যখন বাতাস আর ধুলো মিশে একটা আঁধি আঁধি ভাব হয়েছে–দেহাতের লোকজন হরিকিষণের ভাইয়ের মৃতদেহটা কাঁধে নিয়ে জামতলা দিয়ে রামনাম সত হ্যায় করতে করতে চলে গেল।
