সামনের মাঠটুকু পেরিয়ে বারান্দার কাছে আসতেই ঘরের মধ্যে আলো দেখা গেল। দরজা খোলা, পরদা ঝুলছে। হৈমন্তী ঘরেই আছে।
বারান্দায় উঠে আসতেই হৈমন্তীকে দেখা গেল, গাড়ির শব্দে দরজার পরদা সরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
অবনী কাছাকাছি এসে বলল, বিজলীবাবু এসেছেন; সুরেশ্বরকে দেখতে গেলেন।
হৈমন্তী পরদা সরিয়ে নিল, অবনী ঘরে পা বাড়াল।
হৈমন্তী ঘরে বসে বসে কী করছিল বোঝা যায় না। রেডিয়ো বন্ধ; বইপত্রও কোথাও খোলা নেই; মাঝে মাঝে উল নিয়ে বুনতে বসে–উলের গোলা, বোনার কাঁটাও কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। বিছানা পরিষ্কার, কোথাও কোনও ভাঁজ নেই, শুয়েছিল বলেও মনে হল না।
অবনী বলল, কী করছিলেন? বলে হৈমন্তীর মুখের দিকে তাকাল। কেমন আছেন সুরেশ্বরবাবু?
ভাল।
জ্বর ছেড়েছে?
হ্যাঁ; কাল থেকেই আর জ্বর নেই।
যাক, আপনার একটা বড় রকম দুশ্চিন্তা কাটল।
হৈমন্তী তাকাল। অবনী কি তাকে পরিহাস করল? মুখ দেখে মনে হল না, অবনী পরিহাস করে কিছু বলেছে। হৈমন্তী বলল, আমার খুব একটা দুশ্চিন্তা ছিল না।
হৈমন্তীর গলার স্বরে ঠিক রূঢ়তা নয় কিন্তু কেমন একটা কাঠিন্য ছিল, যেন কথাটা তার পছন্দ হয়নি। অবনী বসল। বসে হৈমন্তীকে লক্ষ করল: কেমন শুকনো ও ক্লান্ত দেখাচ্ছে, অসন্তুষ্ট ভাব।
আর কী খবর? অবনী বলল। হৈমন্তী কি সাধারণ একটা কথায় অসন্তুষ্ট হল? তেমন কিছু ভেবে কথাটা অবনী বলেনি।
খবর ভাল না, হৈমন্তী জবাব দিল।
অবনী বুঝতে পারল না। কেন? খারাপের কী হল?
হৈমন্তী সঙ্গে সঙ্গে কথার জবাব দিল না; বিছানার কাছে গিয়ে বসল, আলোর দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত, তারপ অবনীর দিকে। বলল, এখানে আবার একটা রোগী এসেছে–অবস্থা ভাল না।
অবনী বিস্মিত; কেমন যেন বিমূঢ় হল। এই আশ্রমে সেই রোগ ঢুকল নাকি!
হৈমন্তী বলল, মানুষের সাধারণ একটা কাণ্ডজ্ঞান থাকে, এখানকার লোকের তা নেই।
সেই এপিডেমিক–?
হ্যাঁ।
কার হল?
এখানকার কেউ না! তাঁত-ঘরে হরিকিষণ বলে আছে একজন তার ভাই। নদীর ওপারে গাঁয়ে থাকত। তাকে নিয়ে এসেছে।
এখানে?
আর কোথায় যাবে! এটাই তো যত জঞ্জাল ফেলার জায়গা।
কবে? বলেই অবনীর মনে পড়ল, সেদিন সে যখন সুরেশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে গেল তখন বাইরের ভেঙে যাওয়া জটলার মধ্যে বোধহয় এই রোগী আনা নেওয়ার কথাটা হচ্ছিল। শিবনন্দনজি সম্ভবত তাই অত ব্যস্ত ছিলেন। হয়তো সেদিন অবনী যখন চলে আসে শিবনন্দনজি ওই বিষয়েই কিছু বলতে এসেছিলেন। অবনী বলল, সেদিন আমি যখন সুরেশ্বরবাবুকে দেখতে গেলাম বোধ হয় এরকম একটা কথাবার্তা চলছিল।
মাথা নাড়ল হৈমন্তী। পরের দিন বেলায় গোরুর গাড়িতে নদী পার করে নিয়ে এসেছে।
অবনী বুঝতে পারল না কী বলবে।
হৈমন্তী বিরক্ত গলায় বলল, এদের মাথায় যে কী আছে আমি ভেবে পাই না। কাণ্ডজ্ঞান থাকলে কেউ এভাবে ওই রোগী এখানে আনে!
এ-রকম একটা রিস্ক উনি নিলেন কেন?
দয়া।
কিন্তু এখানে…! এটা তো জেনারেল হাসপাতাল নয়…
এটা কিছুই নয়।
আপনি কিছু বললেন না?
আমার বলার অপেক্ষায় ওরা ছিল না। হৈমন্তী রাগে বিরক্তিতে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। মানুষের সাধ্য অসাধ্যের জ্ঞান থাকা দরকার, সুরেশ্বরের সে জ্ঞান নেই। সে জানে না তার ক্ষমতা কতটুকু অক্ষমতা কত বেশি।
অবনী বলল, রোগটাকে আবার আপনারা আশ্রমে ছড়াবেন।
আমি না, উনি–ওঁরা।
আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এতে কী লাভ হল?
কিছু না। …দয়ায় গলে মহত্ত্ব দেখানো হল।
বরং টাউনে নিয়ে গিয়ে সরকারি হাসপাতালে দিতে পারতেন।
হৈমন্তী কোনও জবাব দিল না। মানুষ যদি নির্বোধ হয়, না বোঝে তাকে কে বোঝাবে! এখানে যার চিকিৎসা হবে না, হওয়া সম্ভব না–তাকে রেখে কী লাভ? এমনিতেও যে মরত তাকে এখানে এনেও সেই মারছ। চোখের সামনে মনোহর মরল, বুড়ো তিলুয়া মরল–তোমরা দেখনি? তবে? গিরজা তো বেঁচেছে, হেম…। হ্যাঁ বেঁচেছে; কিন্তু সে কপাল জোরে, হৈমন্তীর হাতযশে নয়। সুরেশ্বর এসব বুঝেও বুঝবে না। কী করব হেম, ওরা বড় ধরেছে।
সুরেশ্বরের এই হঠকারিতা অবনীরও পছন্দ হচ্ছিল না। কী করে একজন বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এমন নির্বোধের মতন কাজ করে কে জানে! নিতান্ত দায়িত্বহীন না হলে এভাবে মরণাপন্ন, সংক্রামক রোগীকে আনত না। হৈমন্তীর তিক্তবিরক্ত হবার সঙ্গত কারণ রয়েছে: সে চোখের ডাক্তার, এই হাসপাতালটাও চোখ দেখবার, এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা কিছু নেই, তবু কেন তুমি রোগী আনলে?
অসন্তুষ্ট হয়ে অবনী বলল, ভদ্রলোক নিজের মর্জিতে কাজ করেন। ..উচিত অনুচিত বোধটাও বোধহয় তাঁর সবসময় থাকে না।
হৈমন্তী বলল, দয়া দেখানো খুব সহজ; ও শুধু দয়া দেখাতে শিখেছে, দায় নিতে নয়। …আমি হাজার বার করে বলেছি, এসব আমি পারি না, বুঝি না, আমি যা জানি না তার দায় আমি ঘাড়ে করতে পারব না। তবু…। মানুষের জীবন নিয়ে এই ছেলেখেলা আমার ভাল লাগে না।
অবনী তাকিয়ে থাকল। হৈমন্তীর চোখে এমন একটা অসহায়, অক্ষম ভাব ফুটে উঠেছিল যে মনে হচ্ছিল সে যেন কোনও অপরাধে অপরাধী হবার ভয়ে শঙ্কিত হয়ে আছে। সম্ভবত এই দায়িত্ব তার পক্ষে দুঃসহ ভারের মতন মনে হচ্ছে। নিজের অক্ষমতায় সে পীড়িত, বিব্রত।
অবনী কিছু ভাবল; লোকটার অবস্থা এখন কেমন?
ভাল না।
বয়স কত?
বছর পঁচিশ।
কোনও রকমে টাউনের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেত না?
