গাড়িটা আরও সামান্য পথ এগিয়ে আসতে রামনাম আর শোনা গেল না। লণ্ঠনের আলো দুলছে পেছনে; মাঠ ভেঙে ওরা নদীর দিকে চলেছে।
বিজলীবাবু এবার বললেন, মিত্তিরসাহেব, স্ত্রী না হয় আপনার পছন্দ-অপছন্দর ব্যাপার ছিল, কিন্তু মেয়েটা? সে তো আর আপনার পছন্দের মুখ চেয়ে জগতে আসেনি, কপালে পেয়েছিলেন। তাকে ফেলে এলেন কেন?
অবনী এই প্রশ্নটার প্রত্যাশা করছিল। বিজলীবাবু যেদিন প্রথম কুমকুমের কথা জানতে পারেন সেইদিন থেকেই তাঁর মনের কোথাও যেন একটা প্রবল আপত্তি ছিল, এবং দু-চারবার তিনি যে প্রকারান্তরে অবনীকে অভিযোগ না করেছেন এমন নয়। নিজে সন্তানহীন, সন্তানের প্রতি এই অবহেলা যেন তাঁকে খুব বেশি আঘাত দিয়েছে, মর্মাহত করেছে।
অবনী বলল, কুমকুমকে তার মা তখন ছাড়েনি।
জোর করে নিয়ে এলেন না কেন?
বিজলীবাবুর আন্তরিকতা ও উষ্ণতা অবনী অনুভব করতে পারল; উনি যে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছেন তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু অবনী কী বলবে! কী করে বিজলীবাবুকে বোঝাবে-কুমকুমকে কেন আনতে পারেনি! বিজলীবাবুকে বোঝাতে হলে প্রসঙ্গটা দুকথায় বোঝানো যাবে না। অবনীর তেমন কোনও ইচ্ছেও হল না। অল্প সময় চুপচাপ থেকে শেষে অবনী বলল, তা হয় না, বিজলীবাবু। অসুবিধে ছিল। বলে থামল, পরে আবার বলল, কুমকুমকে আমার আনার ইচ্ছে আছে। ..
বিজলীবাবু তাকিয়ে থাকলেন। যেন অপেক্ষা করছিলেন।
অবনী কিছু ভাবছিল, ভাবতে ভাবতে বলল, ডিভোর্সের মামলায় কী দাঁড়াবে আমি জানি না। মানে, কোর্ট থেকে কাকে মেয়ে দেবে কে জানে। জেনারেলি মাদের কাছেই দেয়। …এখানে অবশ্য আমার একটা অবজেকশান আছে–থাকবে…। দেখি..কী হয়!
বিজলীবাবু আর কিছু বললেন না। অবনীর মুখ দেখে তাঁর মনে হল, মেয়ের সম্পর্কে কিছু ভাবছেন হয়তো।
দেখতে দেখতে বেশ অন্ধকার হয়ে এল। পাতলা কুয়াশা ধোঁয়ার মতন দুলছে, গাড়ির আলোয় কখনও কখনও ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মতন দেখাচ্ছিল; সন্ধ্যার মাঠে গন্ধ উঠেছে, তারা ফুটেছে আকাশে, বাতাস বড় শুকনো। এই স্তব্ধতার মধ্যে যেন অতিদূরের বাতাস রামনাম সত হ্যায়-এর গুঞ্জন আনল।
অবনী গাড়ি থামিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। বিজলীবাবুও নরম সিগারেট নিলেন অবনীর।
আবার গাড়ি চলতে শুরু করলে বিজলীবাবু ইতস্তত করে বললেন, মিত্তিরসাহেব, আমার মন একটা কথা বলে। বলব?
অবনী ধোঁয়া টেনে নিয়ে সিগারেটটা বাঁ হাতের আঙুলে রাখল। বিজলীবাবু এবার কী বলতে পারেন অবনী যেন তা অনুমান করতে পারছিল। হৈমন্তীর কথা বলবেন কি! বিজলীবাবুকে প্রসঙ্গটা তুলতে দিল না, তার ভয় হল, সরাসরি তিনি কী বলবেন, কী জিজ্ঞেস করবেন কে জানে!
অবনী বলল, সুরেশ-মহারাজের আশ্রমে নতুন ডাক্তার আসছে জানেন নাকি?
নতুন ডাক্তার! বিজলীবাবু অবাক হলেন।
হৈমন্তী চলে যাচ্ছেন– অবনী বলল। বিজলীবাবুকে এ-যাবৎ সে কথাটা বলেনি।
বিজলীবাবু অবাক হলেন না। বললেন, উনি যে থাকবেন না তা বুঝেছিলাম, মিত্তিরসাহেব। কিন্তু নতুন ডাক্তার আসছেন জানতাম না। কে আসছেন?
জানি না। শুনছিলাম নতুন ডাক্তারের খোঁজ হচ্ছে।
ভাল। বিজলীবাবু বললেন, বলে নিশ্বাস ফেললেন দীর্ঘ করে।
নিবিড় নীরবতা; গাড়ি চলছে।
গগনের সঙ্গে আমার নানা গল্প হত– বিজলীবাবু কিছু পরে বললেন, আমি খানিকটা জেনেছি শুনেছি, মিত্তিরসাহেব। …মানুষের মতি এই রকমই। না না, আমি ওঁর দোষ দিচ্ছি না। তবে, এও তো কেমন একরকম ভালবাসা। আমরা বলতাম প্রণয়, আপনারা বলেন ভালবাসা। কে জানে আপনাদের আজকালকার ভালবাসা কী রকম! সেই গানটার মতন: সুধার কলসি অলসে ভাসালি…
অবনীর কী মনে হল, হেসে বলল, আপনার বাড়িতে এবার একদিন ফেয়ারওয়েলের ব্যবস্থা করুন।
ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন বিজলীবাবু, যেন বোঝাতে চাইলেন–তা তো ঠিকই, যাবার আগে ওঁকে একদিন বাড়িতে আনতেই হয়। ঠোঁটে সিগারেট রেখে পর পর কয়েকটা টান দিলেন; শেষে সিগারেট সরিয়ে মৃদু হেসে বললেন, সে না হয় হবে একদিন মিত্তিরসাহেব, কিন্তু আপনি? আপনিও কি ফেয়ারওয়েল দিচ্ছেন নাকি?
অবনী নীরব; বিজলীবাবুর দিকে তাকাল না, একটু বেশি রকম মনোযোগ দিয়ে সামনের রাস্তা দেখতে লাগল যেন। তারপর অকারণে হর্ন দিল বার দুই।
বিজলীবাবু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে বললেন, আপনার স্বভাবে তেমন জোর নেই, মিত্তিরসাহেব। পুরুষ মানুষের কবজি হবে জোরালো, মুঠো করে ধরবেন যখন তখন আর ছাড়বেন না। আলগা মুঠোতে কিছু হয় না।
অবনী কিছু বলল না। বিজলীবাবু পুরুষমানুষের কবজির কথাটাই জানেন, তার বেশি জানেন না। ললিতাকে ধরার সময় তার কবজি জোরালো ছিল, কিন্তু কী হল, ললিতাকে রাখা গেল, নাকি রাখতে ইচ্ছে হল! …তবু, অবনী ভাবল, তার চরিত্রে বরাবর এই জিনিসটা আছে–দুর্বলতা; সে পারে না ধরে রাখতে পারে না; তার মুঠো–এক ললিতার বেলায় কিছুটা শক্ত হয়েছিলনয়তো সব সময় আলগা, দুর্বল। কেন?
অন্ধ আশ্রমের মধ্যে গাড়ি ঢুকে পড়ল।
হৈমন্তীর ঘরের কাছাকাছি গাড়ি থামাল অবনী। বলল, আমি একটু পরে যাচ্ছি, বিজলীবাবু। আপনি কি আসবেন না সুরেশ-মহারাজের কাছে যাবেন?
আপনি আসুন, আমি যাই, বিজলীবাবু বললেন; বলে গাড়ি থেকে নামতে লাগলেন।
অবনীও নেমে পড়ল। বিজলীবাবু গায়ের চাদরটা ঝেড়েঝুড়ে গুছিয়ে আবার গায়ে দিলেন, দিয়ে এগিয়ে গেলেন। অবনী দুমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে হৈমন্তীর ঘরের দিকে পা বাড়াল।
