নিজের হাতে পাকানো সিগারেটের একটা নেড়েচেড়ে বেছে নিয়ে বিজলীবাবু দেশলাই জ্বাললেন। সিগারেটের অল্প একটু ধোঁয়া গলায় টেনে নিয়ে সামান্য পরে বললেন, আপনি যতই কেননা বলুন মিত্তিরসাহেব, এক হাতে সংসারের খেলাটা ঠিক জমে না। …যদি জমত তবে ভগবানের এই বাড়তি খরচটা হত না।
অবনী ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল, হাসল সামান্য, বাড়তি খরচ?
অবনীর নির্বুদ্ধিতায় যেন কত হতাশ হয়েছেন বিজলীবাবু সেইভাবে মাথা নেড়ে জিবের শব্দ করলেন; বললেন, বাড়তি খরচটা বুঝলেন না–! হায় হায়, মিত্তিরসাহেব, বিধাতা পুরুষের এমন সৃষ্টি যার সব দিকেই বাড়তি–সেই ফেমিনাইন জেন্ডার চিনলেন না।
অবনী হেসে উঠল।
হাসির কিছু নয়, বিজলীবাবু বললেন, জগতে এই বাড়তি খরচটা না থাকলে বাঁচার কোনও সুখ ছিল না।
অবনী বলল, তা ঠিক, আপনাকে দেখেই বেশ বুঝতে পারি।
ওই তো, শুধু দেখেনই : শিক্ষা-টিক্ষা নেন না। বিজলীবাবু বেশ জোরে জোরে হাসলেন। হাসি থামলে বললেন, একটা কথা বলব, মিত্তিরসাহেব?
বলুন।
আপনি তো আর সুরেশ-মহারাজ নন যে ব্রহ্মচারী হয়ে হরতুকি খেয়ে পড়ে থাকবেন আজীবন। বয়েস-টয়েসও বেশ হল, অর্ধেক বেলা তো কবে শেষ, এখন একটু….মানে ধরুন গৃহসুখ বলেও তো একটা কথা আছে।
গৃহসুখ…! অবনী কৌতুকের স্বরে বলল।
হাসবেন না, মিত্তিরসাহেব, সংসারে এসেছেনসুখ-অসুখ শোক-দুঃখ, আরাম-বিরাম এ সবই প্রয়োজন; আপনি না চাইলেও এরা ছাড়বে না। তা ছাড়া স্নেহ-মমতা!
অবনী চুপচাপ থাকল। বিজলীবাবু যে আর রঙ্গরসিকতা করছেন না–বেশ বোঝা যাচ্ছিল। দিনে দিনে বিজলীবাবুর সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক হয়ে গেছে যে তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধুজনের মতন এখন অনেক কিছুই অক্লেশে বলতে পারেন, বলতে সঙ্কুচিত হন না।
বিজলীবাবু বললেন, আমি মাঝে মাঝে ভাবি মিত্তিরসাহেব, আপনি বড় বিচিত্র লোক।
অবনী ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল, বিচিত্র লোক! কেন?
বিচিত্র বই কি! দেখছি তো! ..ইচ্ছে করলে আপনি, সাধারণ লোক যা চায়, যাতে সুখ শান্তি পায় সবই প্রায় পেতে পারতেন, অথচ এমন বাউণ্ডুলে হয়ে থাকলেন যেন আপনার কিছুই জোটেনি। এটা কি আপনার শখ! তাও তো নয়।
অবনী সঙ্গে সঙ্গে কথার জবাব দিল না, পরে বলল, আপনি খানিকটা বেশি বেশি ভাবছেন, বিজলীবাবু।
বিজলীবাবু নিবে যাওয়া সিগারেটটা আবার ধরাতে লাগলেন, গাড়ি প্রায় লাঠটার মোড়ে এসে পৌঁছল।
সিগারেট ধরিয়ে বিজলীবাবু বললেন, মিত্তিরসাহেব, আমি কোনওদিন আপনার ফ্যামিলির ব্যাপারে কথা তুলিনি। ..দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করব, অপরাধ নেবেন না।
অবনী চুপচাপ থাকল। বিজলীবাবু যে প্রসঙ্গটা কোনওদিন তোলেননি তা নয়, কিন্তু স্পষ্ট করে কোনওদিন বলেননি, প্রকারান্তরে এক-আধবার তিনি বিষয়টার উল্লেখ করেছেন।
বিজলীবাবু বললেন, স্ত্রীকে কি আপনি আদপেই পছন্দ করেন না?
না। আমার স্ত্রী নেই–এক সময়ে ছিল; এখন সে অন্য কারও স্ত্রী…
মিত্তিরসাহেব!
রাগের কথা নয়, বিজলীবাবু; সত্যিই তাই। …কলকাতায় আমার দু-একজন বন্ধু আছে; তার মধ্যে একজনের সঙ্গে আমার চিঠিপত্রে যোগাযোগ রয়েছে। আমি না জেনে কথাটা বলিনি।
বিজলীবাবু কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে থাকলেন, পরে বললেন, আপনি বর্তমানে তিনি কী করে অন্য লোকের স্ত্রী হতে পারেন?
পারেন–, অবনী এবার যেন ইচ্ছে করেই সামান্য পরিহাসের চেষ্টা করল, বেআইনি স্ত্রী হতে বাধা থাকে না। …কথাটা তা নয়, আমাদের মধ্যে আর কোনও সম্পর্ক নেই, হবে না; কাজেই তার পক্ষে অন্য কারও স্ত্রী হতে বাধা নেই।
হাতের সিগারেটটা ঠোঁটে তুলেও বিজলীবাবু ধোঁয়া টানতে পারলেন না; আবার নিবে গেছে। মুখের কাছ থেকে হাত নামিয়ে বললেন, আপনি যে কী বলেছিলেন সেবার, ডাইভোর্স…তাই নাকি?
অবনী মাথা নাড়ল। না। হয়নি। হবে। আমি কলকাতায় আমার বন্ধুকে ডিভোর্সের ব্যবস্থা করতে লিখেছি।
বিজলীবাবুর কাছে যেন প্রসঙ্গটি বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছিল। অল্প সময় কী যেন ভাবলেন, বললেন, মিত্তিরসাহেব, আপনাকে আমি অনেকটা চিনি, এই ব্যাপারটায় চিনতে পারলাম না। স্ত্রীকে আপনি ভালবাসেননি?
না।
সম্বন্ধ করে বিয়ে?
না, না। সম্বন্ধ কে করবে, আমার সঙ্গে কারও সম্বন্ধ ছিল না। …নিজেই করেছিলাম।
পছন্দ করে, ভালবেসে?
পছন্দ করে বই কি!
ভালবেসে নয়?
না।
অবনী গাড়িটা ধীরে করে আনল, রাস্তার মাঝমধ্যিখান থেকে একটা মোষ সরে যাচ্ছে; মাত্র শ দেড়েক গজ দূরে লাঠটার মোড়।
বিজলীবাবু যেন কোনও ধাঁধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। মিত্তিরসাহেব যে কী বলছেন! এই বলেন পছন্দ করে বিয়ে করেছি, এই বলেন ভালবেসে নয়। পছন্দ করার সময় কি ভালবাসাটা ছিল না! না-ভালবেসে পছন্দ! সেটা তবে কী?
মিত্তিরসাহেব–, বিজলীবাবু গলার স্বর নামিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, আপনি বোধ হয় কোথাও ভুল করেছিলেন। ভালবাসা ছাড়া কি পছন্দ হয়!
অবনী কথার কোনও জবাব দিল না। ললিতাকে তার কেন পছন্দ হয়েছিল, কোথায় ললিতার আকর্ষণ ছিল বিস্তৃত করে তা বলার আগ্রহও অবনীর হল না। অথচ একটা জবাবেরও বুঝি প্রয়োজন ছিল। অবনী বলল, হ্যাঁ, ভুল করেছিলাম, যৌবনের ভুল…।
বিজলীবাবু কান পেতে কথাটা শুনলেন, হয়তো ভাবছিলেন। ছায়া গাঢ় হয়ে অন্ধকার হল, লাঠটার মোড় ছাড়িয়ে গুরুডিয়ার পথে চলেছে গাড়িটা, কিছুটা দূরে–বোধহয় পঞ্চাশ-ষাট গজ তফাতে কোনও শবযাত্রা চলেছে। রামনাম সত হ্যায়. রামনাম সত হ্যায়…ধ্বনিটা শোনা যাচ্ছিল, প্রায় ঝিল্লিস্বরের মতন ভেসে আসছে। ক্রমশ সেটা নিকট হতে লাগল, ধ্বনিটা জোর হচ্ছে; অবনী গাড়ির গতি ধীর করল, শবযাত্রা আরও কাছে, রাস্তা ছেড়ে মাঠে নামছে, রামনাম সত হ্যায়..গাড়ি পাশ কাটিয়ে হেডলাইটের আলোয় ভিজিয়ে চলে গেল। বিজলীবাবু মাথা নত করে মৃতের উদ্দেশে নমস্কার জানিয়ে শ্রদ্ধা দেখালেন, এটা তাঁর অভ্যেস। নিশ্বাস ফেলে আপনমনে কথা বলার মতন করে বললেন, আর একটা গেল।
