ঠকতেও হয়। হয় না? অবনী সুরেশ্বরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
সুরেশ্বর অবনীর দৃষ্টি থেকে কথাটার অর্থ হয়তো বুঝতে পারল। বলল, অনেকে তাই মনে করে।
আপনি করেন না?
সুরেশ্বর আস্তে মাথা নাড়ল, না–সে মনে করে না। বলল, আপনি যে ধরনের ঠকার কথা বলছেন, আমি তেমন কিছু ভাবছি না।
অবনীর ইচ্ছে হল বলে, আপনার হয়তো এমনও মনে হতে পারে আপনি কাউকে ঠকাচ্ছেন না!
অবনী সুরেশ্বরের অসুস্থ অথচ সংযত ধীরস্থির মুখভাব লক্ষ করতে করতে বলল, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আপনি আমাদের জীবনের খুব কমই দেখেছেন। …কখনও কিছু হারাননি, কিছু পাননি।
কিছু হারাইনি?
না; তেমন কিছু হারাননি; যে জিনিস হারালে মানুষ তার ক্ষতির মূল্য বোঝে অন্তত তেমন কিছু হারাননি।
সুরেশ্বর অপলকে অবনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার চোখের তারা মুহূর্তের জন্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, যেন ফুলিঙ্গের স্পর্শ পেয়েছিল, পরে সেই উজ্জ্বলতা মরে গেল, দৃষ্টিতে অন্যমনস্কতা এবং বেদনার ভাব এল। চোখের পলক ফেলে সুরেশ্বর অন্যদিকে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় মৃদুস্বরে বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন, বড় কিছুনা হারালে মানুষ নিজেকে বুঝতে পারে না। তার দুঃখ যন্ত্রণার বোধ থাকে না… সামান্য সময় নীরব থাকল; তারপর হঠাৎ বলল, আপনি কি কিছু হারিয়েছেন…
আমার কথা আলাদা– অবনী বলল, জন্ম থেকেই আমি হারের খেলা খেলছি। …ধাতে সয়ে গেছে। বলার পর সে কৌতুক অনুভবের ভান করে হাসার চেষ্টা করল।
সুরেশ্বর মুখ ফিরিয়ে তাকাল। আপনি তা হলে খারাপ খেলোয়াড়। সুরেশ্বরও হাসবার চেষ্টা করল।
একেবারে রদ্দি। …এ ব্যাড প্লেয়ার উইথ এ ব্যাড লাক, স্যার। অবনী এবার সামান্য জোরেই হেসে উঠল।
সুরেশ্বর যেন না হেসে পারল না। হাসি থামলে বলল, মাঝে মাঝে আপনার সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করে। …আজ শরীরটায় তেমন জুত নেই। আর একদিন যদি… বলতে বলতে সুরেশ্বর থামল, ভাবল, তারপর বলল, অবনীবাবু, আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা বলতে পারলে ভাল হত। অন্য আর একদিন..
সুরেশ্বরের কথা শেষ হবার আগেই শিবনন্দনজি এলেন। সুরেশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। চিন্তিত। কিছু বলার আছে। প্রয়োজনীয় কথা। অবনীর জন্যে যেন বলতে পারছেন না।
অবনী উঠে পড়ল।
.
২৮.
দিন দুয়েক পরের কথা।
অবনী গুরুডিয়ায় আসছিল, সঙ্গে বিজলীবাবু। সুরেশ্বরের অসুখ শুনে বিজলীবাবু আসতে চেয়েছিলেন। আজ আসার পথে বাস-অফিস থেকে অবনী তাঁকে তুলে নিয়েছে।
বিকেল পড়ে গিয়েছিল, শীতের বাতাস বুঝি আজ সারাটা দিনই থেকে থেকে দিগভুল করে দক্ষিণ দিয়ে আসছিল, কয়েক ঝলক আসে আবার থেমে যায়, বাতাসে শিহরণ আছে, শীতের ধার নেই, ঈষৎ যেন উষ্ণ। ফাল্গনের মুখোমুখি এসে বাতাস বুঝি দোনা-মোনা করে কখনও মাঘ কখনও ফাল্গুনের মন রেখে বইছিল। রাস্তাটা শুকনো পাতায় ভরা, দুপাশে অজস্র ঝরা পাতা, গরগল গাছগুলোর মাথা প্রায় নিষ্পত্র হয়ে এল, মাঠেঘাটে ধুলো উঠছে, ঝোপঝাড়গুলো ধূসর, বিজলীবাবু কখন যেন ঝোপ থেকে বুনো কুলের গন্ধ পেয়ে নাক টেনে গন্ধ নিলেন।
যাই যাই করেও বিকেলটা কিছুক্ষণ ছিল, তারপর অপরাহ্ন ফুরোল।
বিজলীবাবু বললেন, শীতটা এবার গেল মিত্তিরসাহেব; আর কটা দিন।
অবনী মুখে কিছু বলল না, বার দুই ঘাড় নাড়ল আস্তে, অর্থাৎ, হ্যাঁ, শীত যাচ্ছে।
বিজলীবাবু দেশলাই কাঠি দিয়ে দাঁত খুঁচিয়ে কাঠিটা ফেলে দিলেন। ইদানীং পানের সঙ্গে তিনি যে নতুন জরদাটা খাচ্ছেন সেটা নেশার পক্ষে জুতের নয়, কিন্তু গন্ধটা ভাল। নিজের মুখের গন্ধ যেন নিজেকেই মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক করে দেয়। বিজলীবাবু বোধহয় মুহূর্ত কয় মুখ হাঁ করে সেই গন্ধ নিচ্ছিলেন, তারপর নিজের ছেলেমানুষিতে নিজেই মুখ বন্ধ করে হেসে ফেললেন। বললেন, মিত্তিরসাহেব, একটু পান-টান অভ্যেস করুন। … জীবনটা একেবারে বিধবার ঠোঁট করে রাখলেন…!
অবনী হেসে জবাব দিল, পানের অভ্যেস তো আমার আছে, বিজলীবাবু।
বিজলীবাবু নিজের ভুলটুকু যেন সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরে হেসে উঠলেন। বললেন, আরে না, সে হল কি না জলপান, আর এ হল স্থল পান। বলে বিজলীবাবু হাসতেই থাকলেন; পরে আবার বললেন, পানের কত রকমফের আছে জানেন?
অবনী মাথা নাড়ল; জানে না।
বিজলীবাবু একটা ছড়া কাটলেন, তার খানিকটা হিন্দি হিন্দি শোনাল, বাকিটা উর্দু-টুর্দু হবে। বললেন, আয়ুর্বেদের অনুপানের মতন নানা অনুপান আছে পানের; অনুপান মেশালে কোনও পানে মন-সুখ কোনও পানে রতিসুখ। বলে হাসতে লাগলেন।
বিজলীবাবুর যাবতীয় বিষয়ে জ্ঞান মাঝে মাঝে অবনীকে চমৎকৃত করে। আপাতত সে তেমন চমৎকৃত হল না, পানশাস্ত্রে আপনি বরাবরই পণ্ডিত।
শাস্ত্র-টাস্ত্র না, এ হল নিজের মুখে ঝাল খাওয়া। সমঝদার হলে বুঝতেন।
পরিহাসটা অবনী উপভোগ করল কি না বোঝা গেল না।
বিজলীবাবু অল্পসময় যেন অবনীর জবাবের অপেক্ষায় থাকলেন, তারপর সহাস্যমুখে বললেন, কথাটা আপনার মনে ধরল না মিত্তিরসাহেব; কিন্তু যা বললাম–এ হল খাঁটি কথা।
অবনী হাসল না; সামনাসামনি একটা গাড়ি এসে পড়েছে, স্টেশন ওয়াগন; রাস্তার দিকে চোখ রাখল।
বিজলীবাবু পকেট থেকে তাঁর সিগারেট কেস বের করছিলেন।
মুখোমুখি গাড়িটা পাশ কাটাল : অবনীর মনে হল গাড়িটা সে টাউনে অনেকবার দেখেছে, সরকারি গাড়ি, গাড়ির মধ্যে বেশ কয়েকজন যেন ছিল।
