হৈমন্তী হঠাৎ বলল, আপনাদের সুরেশ-মহারাজ নতুন ডাক্তার আনছেন।
বললেন? অবনী যেন কথার কথা বলল।
কাল বললেন। …অনেক দিন থেকেই নাকি খোঁজাখুঁজি করছেন… হৈমন্তীর ঠোঁটের প্রান্ত কুঁচকে এল, চোখে কেমন উপহাস উপচে উঠছিল। আমাকে কেউ আর জানাননি অবশ্য, কিন্তু তলায় তলায় চিঠি লেখালেখি, বিজ্ঞাপন দেবার কথাও ভেবে রাখা হয়েছিল। নেহাত নাকি এই অসুখটা এসে পড়ায় সব গোলমাল হয়ে গেল। নয়তো, এতদিনে আমায় তাড়াতেন। কথার শেষে হৈমন্তী বিদ্রূপ করে হাসবার চেষ্টা করল, হাসল, অথচ সে হাসি করুণ দেখাল।
অবনী কী বলবে ভেবে পেল না। হৈমন্তীর কোথায় লেগেছে তা অনুমান করার চেষ্টা করে বুঝতে পারছিল : সম্মানে লেগেছে। লাগা অসম্ভব নয়। সে অক্ষম এই অপরাধে সুরেশ্বর নিশ্চয় নতুন ডাক্তারের খোঁজ করছে না, হৈমন্তীকে রাখা যাবে না বা হৈমন্তী থাকবে না বুঝেই হয়তো নতুন ডাক্তারের খোঁজ করছিল; কিন্তু হৈমন্তীকে কথাটা না জানিয়ে সুরেশ্বর ভাল করেনি। অবশ্য অবনী ভাবল, জানালেই কি হৈমন্তী প্রসন্ন হত?
হৈমন্তীকে শান্ত ও সুস্থির করার আশায় অবনী সামান্য হেসে হালকা গলায় বলল, না, আপনাকে তাড়াতেন না। ভদ্রলোক এতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন নন। আপনি থাকবেন না বুঝেই একটা ব্যবস্থা করছিলেন আর কী!
হৈমন্তী তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাসার মুখ করল।
সামান্য সময় চুপচাপ আবার। অবনী শেষে বলল, সুরেশ্বরবাবুকে একবার দেখে আসা দরকার। …চলুন, যাবেন নাকি?
চা খেয়ে যাবেন না? বসুন একটু চা করে আনছি–মালিনী বোধ হয় এদিকে নেই। হৈমন্তী বলল : সামান্য অন্যমনস্ক, বোধ হয় এতক্ষণে তার খেয়াল হয়েছে সে খুব অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিল, নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করছিল এবার।
হৈমন্তী উঠছিল, অবনী বাধা দিল, বলল, এখন থাক, দেখাটা করে আসি, এসে চা খাব। আপনি যাবেন?
মাথা নাড়ল হৈমন্তী, না। আমি বিকেলেও গিয়েছি। আপনি ঘুরে আসুন।
অবনী কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল, যেন শেষ পর্যন্ত হৈমন্তী মত বদলাতে পারে। পরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমি তা হলে ঘুরে আসি।
.
সুরেশ্বরের ঘরের বারান্দায় ছোটখাটো ভিড় ভেঙে গিয়েছে, তারা কেউ সিঁড়িতে, কেউ বাগানে, কেউ বারান্দায় অবনী এসে পৌঁছল। শিবনন্দনজি তখনও বারান্দায় দাঁড়িয়ে। অবনীর সঙ্গে চোখের পরিচয়, সরে দাঁড়িয়ে পথ দিলেন এবং নমস্কার জানালেন। অবনী মাথা সামান্য নিচু করে প্রতিনমস্কার জানাল, হাত তুলল না। কেমন আছেন সুরেশ্বরবাবু?
ভাল, শিবনন্দনজি জবাব দিলেন।
ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে অবনী শুনল শিবনন্দনজি বারান্দা দিয়ে নামতে নামতে কী যেন বলছেন অন্যদের : মনে হল তিনি কোনও বিষয়ে কিছু ব্যস্ত এবং ভেঙে যাওয়া ভিড়ের কাউকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছেন। কাউকে কোথাও থেকে আনা না-আনার কথা বলেই মনে হল।
মাঝের ঘরে লণ্ঠন জ্বলছিল। অবনী কয়েক পা এগিয়ে এসে ডাকল, সুরেশ্বরবাবু।
পাশের ঘর থেকে সুরেশ্বর সাড়া দিল, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মালিনী ভেতরের বারান্দা থেকে ঘরে এল। মালিনী এবাড়িতেই আছে তা হলে।
মালিনী কিছু বলল না, কিন্তু এমন ভাব করল যেন অবনীকে পথ দেখিয়ে সুরেশ্বরের ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে।
সুরেশ্বর বিছানার ওপর উঠে বসতে বসতে বলল, আসুন।
অবনী ঘরের মাঝামাঝি এসে বলল, কী হল মশাই, আপনি আবার জ্বর বাঁধিয়ে বসলেন কেন? ..কেমন আছেন?
ভাল। জ্বর বাঁধিয়ে সুরেশ্বর যেন অপ্রস্তুতে পড়েছে, সেই রকম হাসল একটু, বলল, বসুন। মালিনী, ওই চেয়ারটা… সুরেশ্বর মালিনীকে চেয়ার এগিয়ে দিতে বলছিল, তার আগেই অবনী নিজে চেয়ার টেনে নিল।
ঠাণ্ডা-টাণ্ডা লাগিয়েছেন খুব… অবনী বসতে বসতে বলল, কোল্ড ফিভার।
মালিনী ঘর ছেড়ে চলে গেল।
সুরেশ্বর বিছানার পাশ থেকে মোটা গরম চাদর টেনে নিয়ে গায়ে জড়াল, পায়ের দিকে কম্বল। বোধ হয় শুয়ে ছিল, অবনীর গলা পেয়ে উঠে বসেছে। বলল, হেম তো তাই বলছে, সর্দিজ্বর। আমার মনে হচ্ছে বেতোজ্বর–বলে সুরেশ্বর তার অসুখের প্রসঙ্গটা আরও লঘু করার চেষ্টা করল, বয়েস হচ্ছে, বাত ধরেছে। হাড়ে হাড়ে ব্যথা… হাসল। আপনাদের খবর কী? বিজলীবাবু কেমন আছেন?
ভাল, অবনী বলল, তার মনে হল সুরেশ্বরের চোখমুখ বেশ ফুলে আছে।
আপনাদের দিকে এখনও অসুখ-বিসুখটা ছড়ায়নি।
এক-আধটা দেখা দিয়েছে, শুরু বলতে পারেন।
সুরেশ্বর এমনভাবে তাকিয়ে থাকল, মনে হচ্ছিল যেন সে ভেবেছিল কোনও সুসংবাদ শুনবে, অথচ দুঃসংবাদ শুনল।
অবনী বলল–এই এরিয়ায় এরই মধ্যে কম করে আশি নব্বইটা এই রোগে মারা গেছে। কিন্তু দেখছেন না, কারও কোনও গা নেই। …এইভাবেই অসুখটা চলবে–আরও একশো দেড়শো মারা যাবে–তারপর নিজের থেকে থামবে। ততদিনে একটা ন্যাচারাল ইমিউনিটি গ্লো হয়ে যাবে মানুষের।
শুনেছি পাটনা থেকে কিছু ডাক্তার-টাক্তার আসছেন—
আসছেন…! আসুন আগে… অবনী যেন কথাটার কোনও গুরুত্ব দিল না।
সুরেশ্বর সামান্য সময় চুপ করে থেকে বলল, শিবনন্দনজি খবরটবর রাখেন, তিনি বলছিলেন আসবে, শীঘ্রিই আসবে। …হয়তো এই সপ্তার মধ্যেই।
আপনি বিশ্বাস করেন আসবে?
বিশ্বাস তো করতেই হয়।
আপনি একটু বেশি রকম বিশ্বাসী।
বিশ্বাস ছাড়া চলে কই। …হয় কাউকে না হয় কিছুকে তো বিশ্বাস করতেই হয়।
