হৈমন্তী বলল, ভয়ের কিছু নয়; সর্দিজ্বর বলেই মনে হচ্ছে।
অবনীর চমকিত ভাবটা কাটল; চোখের পলক ফেলে দৃষ্টি হৈমন্তীর চোখের তলা থেকে নামাল।
সর্দিজ্বর।
তবে বলা যায় না, চিকেন পক্সও হতে পারে… এখনও কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
কেমন আছেন এখন?
ভাল। দুপুরে জ্বর সামান্য বেড়েছিল, এখন বিকেলে দেখলাম, কমেছে।
কত?
একশো।
অবনী চুপ করে থাকল।
আপনি আমায় যা অপদস্থ করেছেন- হৈমন্তী সামান্য হেসে বলল, তিরস্কারও যেন রয়েছে।
অপদস্থ! কেন?
গগনকে আপনি চিঠি লিখেছেন?
লিখেছি। অবনী অবাক হচ্ছিল।
গগন আবার ওকে লিখেছে। … ও ভাবল, আমি গগনকে লিখেছি।
না, আমি লিখেছিলাম। …এখানে খুব প্যানিক। রোজই দু-চারটে করে মারা যাচ্ছে শুনি। অবনী চিন্তিত মুখে বলল।
আপনি কী যে লিখলেন, ও ভাবল–আমি এখান থেকে পালিয়ে যাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে গগনকে লিখেছি। হৈমন্তী যেন এখনও এই বিষয়ে তার ক্ষুব্ধ ভাবটা সম্পূর্ণ ভুলতে পারেনি।
অবনী হৈমন্তীকে দেখতে দেখতে এবার পকেট থেকে সিগারেট বের করল। সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলল, গগন আপনাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিতে লিখেছে?
হ্যাঁ।
আমি তাই লিখেছিলাম।
হৈমন্তী এবার কৌতুক করেই বলল, গগন আবার আপনাকে আমার গার্জেন করে দিয়ে গেছে, কিছু তো আর বলা যাবে না।
অবনী কৌতুকটা উপভোগ করল হয়তো, গার্জেনের রেসপনসিবিলিটি বড় বেশি। …কিন্তু তা নয়। আপনি কি অবস্থাটা সব জানেন?
কী?
অবনী এবার আর হাসল না, বলল, এখান থেকে মাইল চার দূরে একটা গ্রাম আছে, মোটামুটি বড়ই, সেই গ্রামে দিন তিনেকের মধ্যে পাঁচজন মারাই গেছে, ভুগছে যে কত কে জানে! …ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার নয়। বিজলীবাবুর কাছে আমি খবরাখবর পাই, তাঁর বাসের ড্রাইভার কন্ডাক্টররা তো সারাটা তল্লাটে রোজ ঘুরছে, তাদের খবরে রিলাই করা যায়। …আপনি জানেন না কোনও কোনও গ্রাম থেকে তোক পালাচ্ছে।
হৈমন্তী শুনল। অবনীর উদ্বেগ অকারণ নয় হয়তো, কিন্তু গগনকে কি এইসব কথাও লিখেছে নাকি! সর্বনাশ, তা হলে বলা যায় না–কোনও রকমে মার কানে কথাটা উঠলে, হয় পত্রপাঠ ফিরে যাবার টেলিগ্রাম না হয় গগনকেই মা পাঠিয়ে দেবে তাকে নিয়ে যেতে। হৈমন্তী চোখ তুলে বলল, সর্বনাশ, আপনি কি গগনকে একথা লিখেছেন?
খানিকটা লিখেছি, অবনী হেসে ফেলে জবাব দিল।
দুপলক অবনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হৈমন্তী বলল, তা-ই। …এখন বুঝতে পারছি, গগন কেন অত তাড়া দিয়েছে।
অবনী কথা বলল না, ধোঁয়া গিলে আস্তে আস্তে নাক মুখ দিয়ে বের করতে লাগল।
খানিকটা চুপচাপ থাকার পর হৈমন্তী বলল, আমি তো যাচ্ছি।
অবনী তাকিয়ে থাকল, খুব একটা বিস্মিত হবার মতন কিছু যেন নয়, অথচ বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বিধা রয়েছে দৃষ্টিতে। যাচ্ছেন?
হ্যাঁ মাথা নাড়ল হৈমন্তী।
কখন?
দিন পনেরোর মধ্যেই। বলে হৈমন্তী আরও কিছু বলার জন্যে ঠোঁট ভেঙে তাকিয়ে থাকল; পরে কী মনে করে কিছু বলল না।
সুরেশ্বরবাবু জানেন?
হ্যাঁ–জানেন।
কিছু বললেন না?
প্রথমে আরও কিছু দিন থাকার কথা বলেছিল, পরে আর বলেনি। হৈমন্তী সামান্য বাঁকা হয়ে টেবিলের দিকে ঝুঁকে বাতির শিষ ঠিক করতে লাগল। আলো তার মুখে, চোখ নাক চিবুক আলোময় হয়েছিল, চুলের খোঁপা, ঘাড় পিঠ ছায়ায়। সোজা হয়ে বসতে বসতে এবার বলল, আগে যাবার কথা আমি কিছু ঠিক করিনি, বলিওনি; কিন্তু পরে ওর ভাবসাব দেখে আমার খারাপ লাগল। আরও আগে চলে যাওয়া উচিত ছিল, নেহাত– হৈমন্তী থেমে গেল, খানিকটা ঝোঁকের মাথায়, খানিকটা উন্মাবশে সে কথাটা বলে ফেলেছে। কাল থেকেই কথাটা সে ভুলতে পারছে না : সুরেশ্বর কী করে ধরে নিল হৈমন্তী প্রাণভয়ে ভীত হয়ে পালাতে চাইছে, কেনই বা সুরেশ্বর ঘুণাক্ষরেও হৈমন্তীকে নতুন ডাক্তার খোঁজার কথা জানায়নি! নিজেকে অন্তত এ ব্যাপারে এত অপমানিত ও আহত বোধ করেছে হৈমন্তী যে রাগ, অভিমান, অসম্মানের জ্বালা যেন কিছুতেই ভোলা যাচ্ছিল না। অন্য কাউকে কথাটা শোনানোর জন্যে তার ভেতর থেকে একটা উত্তেজনা ছিল। অবনীর কাছে নিজের ব্যক্তিগত বিষয় হৈমন্তী আগে কখনও আলোচনা করত না, পরে কখনও কখনও নিজের বিরূপতা জানিয়েছে যদিও তবু সেই বিরূপতায় সুরেশ-মহারাজ ছিল, আশ্রম ছিল সুরেশ্বর ছিল না। তারপর ভাসাভাসাভাবে সুরেশ্বরও হয়তো এসেছে–তবু স্পষ্ট করে ধরাছোঁয়ার কিছু থাকত না। ইদানীং, বিশেষ করে সেদিন, মাদাউআলের সেই ইনসপেকশান বাংলোয় অবনী যেন আর কোনও অস্পষ্টতা না রেখেই সুরেশ্বরের কথা তুলেছিল, হৈমন্তী বাধা দেয়নি, দিতে পারেনি। সেদিনের পর ব্যক্তিগত কথাটা আর চাপা রাখার চেষ্টা অকারণ; বিসদৃশ বলেই যা উচ্চকণ্ঠে ওরা–অবনী বা হৈমন্তী কথাটা তোলে না, নয়তো মনে মনে আজ আর কোনও বাধা অনুভব করে না।
আজ, এখন হৈমন্তী সুরেশ্বরের ব্যবহারের প্রসঙ্গটা উম্মাবশে হঠাৎ তুলে ফেলার পর অনুভব করল, অবনীর কাছে কথাটা পুরোপুরি বলতেও তার দ্বিধা বা সঙ্কোচ হচ্ছে না। বরং বলার বাসনা জাগছে, ভাল লাগছে। হৈমন্তী বলল, আমি তাড়াতাড়ি চলে যাই এটা ওর ইচ্ছে ছিল না। আরও কিছুদিন থাকতে বলেছিল। …আশ্রমে আবার যদি কারও অসুখ-বিসুখ করে তাই রাখতে চেয়েছিল। …যে যার নিজের দিকটাই দেখে।
অবনী হৈমন্তীর আচরণের মধ্যে উত্তেজনা এবং বিরূপতা অনুভব করতে পারছিল। কিছু বলল না।
