তা হলে তুমি যাও। মালিনী এলে আমি জ্বর দেখে তোমায় খবর পাঠাব।
দেখি আর-একটু। …রুগি-টুগিও তো আসে না বড় একটা আজকাল.. হৈমন্তী মাঠে মালিনীতে দেখতে পেল। ছুটে ছুটে আসছে। ওই তো আসছে হৈমন্তী বলল।
অল্প পরেই মালিনী এল। তার মুখ দেখে মনে হল, কী একটা অপরাধ করে ফেলেছে। হৈমন্তী হাত বাড়িয়ে থার্মোমিটার নিল, এত দেরি? বলার সময় হাতের থার্মোমিটারের খাপ দেখেই বুঝতে পারল, এই থার্মোমিটার তার নয়।
মালিনী মুখ নিচু করে অপরাধীর মতন বলল, আপনারটা হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল।
হৈমন্তীর রাগ করা উচিত ছিল না; তবু তার কেমন রাগ হল। হুড়োহুড়ি করে আনতে গিয়ে যে মালিনী হাত থেকে থার্মোমিটার ফেলেছে তাতে সন্দেহ নেই। এত ছটফট করার কী আছে! সুরেশ্বরের জ্বর হয়েছে তার জন্য তুমি যে একেবারে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছ, যেন তোমার আর হাতে-পায়ে জোর নেই।
হাসপাতালের থার্মোমিটার ব্যবহার করার আগে হৈমন্তীর মন খুঁত খুঁত করল কিনা কে জানে, ধুয়ে মুছে সুরেশ্বরের দিকে বাড়িয়ে দিল।
জ্বর উঠল একশো এক। ছিটেফোঁটা বেশি; সেটা কিছু নয়।
হৈমন্তী সুরেশ্বরের দিকে আধা-আধি তাকিয়ে বলল, মালিনীর হাতে দু-একটা ওষুধ দিয়ে দিই। অল্পতেই সাবধান হওয়া ভাল। বলে মালিনীকে আসতে বলে চলে গেল। যাবার সময় সাবধান করে দিয়ে গেল, ঠাণ্ডা যেন না-লাগানো হয়।
বাইরে এসে মাঠ দিয়ে রোদে হেঁটে যেতে যেতে হৈমন্তীর এখন আর তেমন দুর্ভাবনা হচ্ছিল না। বরং কিছুক্ষণ আগে যে ভীষণ আতঙ্কের ভাবটা এসেছিল তা কেটে যাওয়ায় যেন মনস্থির করে ভাবতে পারছিল, চোখে দেখতে পাচ্ছিল। মাঠে অফুরন্ত রোদ, ঘাসের শিশির প্রায় শুকিয়ে এল, আকাশ নীল, আশ্রমের দু একজন সুরেশ্বরের ঘরের দিকে যাচ্ছে, তাদের কানে খবরটা যে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে সন্দেহ নেই, তাঁত-ঘরের দিকে কটা অন্ধ রোদ পোয়াচ্ছে, সবজি ক্ষেতে বুঝি জল দিচ্ছে কারা, কোণাকুণি বাতাসে গন্ধ ভেসে আসছে, কয়েকটা শুকনো পাতা উড়ে আসছে, দূরে শিমূল গাছটার পাতা হয়তো।
একটা কথা ভেবে হৈমন্তীর খুব অবাক লাগছিল। সুরেশ্বর আজ আগাগোড়া কীভাবে অম্লান বদনে সব স্বীকার করে গেল। কাল তার অন্য রকম কথাবার্তা ছিল, অন্য ধরনের যুক্তি, প্রতিবাদ; এমনকী কাল সে ক্ষুব্ধও হয়েছিল, আজ সকালে একেবারে আলাদা কথাবার্তা : মনে হল, রাতারাতি পালটে গেছে। সুরেশ্বর যে রাতারাতি অন্য মানুষ হয়ে যায়নি তা ঠিকই, বা তার কথাবার্তায় এতটা পালটে যাওয়া যে স্বাভাবিক তাও নয়, তবু-হৈমন্তীর মনে হল সুরেশ্বর যতই চাপা দেবার চেষ্টা করুক খানিকটা ঘা সে খেয়েছে। আজ সকালে যা করল, তা হল অনেকটা ভদ্রভাবে বিদায়-পর্ব সারা :বচসা, তর্কাতর্কি না করে, মনোমালিন্য আরও না বাড়িয়ে কাউকে বিদায় দেবার সময় আমরা যেমন বিনয় করে আচ্ছা আচ্ছা করি সে রকম। সুরেশ্বরের এটা স্বভাব; সে বিরোধের শেষ পর্যন্ত যেতে চায় না, তার আগেই প্রতিপক্ষকে এড়িয়ে যায়। এক্ষেত্রে, হৈমন্তীর ধারণা, সুরেশ্বর তার স্বভাব মতন কাজ করেছে। তা ছাড়া সে বুঝতে পেরেছে জোর করে বলার মতন তার কিছু নেই, এমন একটাও যথার্থ কারণ সে দেখাতে পারবে না যা তার আচরণকে সমর্থন করবে।
হৈমন্তীর কেমন অদ্ভুত এক সুখ এবং দুঃখ হচ্ছিল। সুখ হচ্ছিল এই ভেবে যে, সুরেশ-মহারাজকে সে আহত ও ক্ষুণ্ণ করতে পেরেছে; শিক্ষা না হোক অন্তত বিব্রত ও কুণ্ঠিত করতে পেরেছে। তবু তো সব কথা-হৈমন্তীর মনে যা ছিল, যা ভাবে হৈমন্তী বলতে পারল না; নোকটার মনে যে আত্মমোহ, ভীরুতা, অহংকার, আধিপত্যের ভাব ছিল তা তাকে চিনিয়ে দেওয়া গেল না। দিলে ভাল হত। সে যে সঙ্গে সঙ্গে চিনে নিত তা নয়, তবু কাঁটার মতন বিধত। সেই জ্বালা সে ভোগ করত।
আবার হৈমন্তীর দুঃখ হচ্ছিল এই ভেবে যে, মানুষটা তার নিরাসক্ত, দৃঢ়, আত্মম্ভর চরিত্রবা চরিত্রের সেই ভান নষ্ট করে হঠাৎ যেন নিজেকে নুইয়ে দিল। বলতে গেলে, হৈমন্তী বেশ বুঝতে পারছিল, তার ঘায়ে সুরেশ্বর নুয়ে পড়েনি, ইচ্ছে করে নিজেকে অনেকটা নুইয়ে দিয়ে হৈমন্তীর সন্তোষ বিধান করল যেন। এরকম না করলেই সুখী হত হৈমন্তী। এক এক সময় এত সহজে নুয়ে পড়া দেখে মনে হয়, সুরেশ্বর যেন প্রতিপক্ষকে অযোগ্য মনে করে লড়ল না, মাথা অবনত করে উপহাস করল।
হৈমন্তী হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। রোগী দেখতে পেল না বারান্দায়। ফাঁকা পড়ে আছে সব। এই দৃশ্যও তার কেন যেন মনঃপূত হল না।
যুগলবাবুও বাইরে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে। হৈমন্তী বুঝল, সুরেশ্বরের সংবাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
বিকেলের পর অবনী এল।
হৈমন্তী বলল, আসুন। এ কদিন কী হল। কাজ?
না অবনী মাথা নাড়ল হেসে, কাজের জন্যে অতটা নয়, গাড়িটা বিগড়ে গিয়েছিল।
ও গাড়ি আবার খারাপ হয় নাকি? হৈমন্তী হেসে বলল।
ঘরে এসে বসতে বসতে অবনী বলল, সব গাড়িই বিগড়োয়।
নিজের হাতেই বাতি জ্বালিয়ে নিল হৈমন্তী। সন্ধে হয়ে আসছে।
তারপর, কী খবর বলুন? অবনী শুধোল।
আপনাদের সুরেশ মহারাজের জ্বর, হৈমন্তী বলল।
জ্বর। অবনী চমকে উঠতে গিয়েও তেমন চমকাল না। হয়তো হৈমন্তীর গলার স্বরে কোনও গুরুত্ব না থাকায় এবং হালকা করে কথাটা বলায় অবনী অতটা আতঙ্কিত হল না। তবু সে উদ্বেগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
