হৈমন্তী হ্যাঁ-না কিছু বলল না। মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, এখন সে অনেকটা নিশ্চিন্ত। মালিনী যে রকমভাবে গিয়ে খবর দিয়েছিল তাতে ভয় পাবারই কথা।
সুরেশ্বর জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিশ্বাস ফেলে মুখ ফেরাল সামান্য; বলল, হেম, আমার সত্যি লজ্জাই করছে; জ্বরটা আসার পর কেমন মনে হয়েছিল তোমায় আবার বুঝি বিব্রত করতে হল…। কিছুই তো বলা যায় না; জ্বর এসেছে দেখে দুশ্চিন্তাই হয়েছিল। এখন ভালই লাগছে; সর্দিজ্বর এমন-কিছু নয়।
হৈমন্তী কথাগুলো শুনল। তার মনে হল, সুরেশ্বর এখন বিব্রত হবার কথাও ভাবছে। কেন? সে কি ভেবেছিল, তেমন কিছু হলে হৈমন্তী আটকা পড়বে? হৈমন্তীকে তবে আর আটকে না রাখার ইচ্ছেই হয়েছে সুরেশ্বরের।
হৈমন্তী কী স্থির করেছিল সে কথা এখানে তোলার প্রয়োজন মনে করল না। সুরেশ্বরের এই জ্বর, এখন পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে, সাধারণ; এই জ্বরের জন্য তার আটকে পড়ার কোনও কারণ নেই। গগনকে অনায়াসেই হৈমন্তী কাল-পরশু নাগাদ চিঠি লিখতে পারবে।
সুরেশ্বর বলল, আমি আজই গগনকে চিঠি লিখব ভেবেছিলাম। …তুমি শীঘ্র যাচ্ছ–ওকে জানিয়ে দিতাম।
হৈমন্তী মুখ ফিরিয়ে সুরেশ্বরকে দেখল। তা হলে তুমিও ভেবে নিয়েছ শেষ পর্যন্ত! যাক্, ভাল; ভালই হল। এখানে কৌতুক বা পরিহাস করা শোভা পায় না নয়তো হৈমন্তী হয়তো শুধোত, তোমার ডাক্তারের ব্যবস্থা তা হলে হয়ে গেছে!
কাল সুরেশ্বর বলল, আমি তোমায় আরও কয়েকটা দিন থাকার কথা বলছিলাম। পরে ঘরে ফিরে এসে আমার মনে হল, সত্যিই তোমাকে আর থাকতে বলা উচিত না।
হৈমন্তী অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল, সরাসরি মুখ ফিরিয়ে সুরেশ্বরকে দেখল না–আড়চোখে চকিতের জন্য একবার দেখে নিল। সুরেশ্বর কি অভিনয় করতেও শিখেছে! বরং কাল, সুরেশ্বরের স্বার্থচিন্তাও এমন কটু লাগছিল না হৈমন্তীর; এখন লাগছে। এখন মনে হচ্ছে, সুরেশ্বর বিনীত হবার এবং উদার হবার চেষ্টা করছে। এই উদারতার মধ্যে কৃত্রিমতা, বিনয়ের মধ্যে অক্ষমতা আছে। কী প্রয়োজন ছিল তোমার এসব কথা বলার! তোমার কী মনে হল, না হল, তাতে আমার যাওয়া আটকাচ্ছে না। আমি ফিরে যাচ্ছি। নিতান্ত তোমার মুখরক্ষা করার জন্য আরও দশ-পনেরোটা দিন আছি। তারপর আর নয়।
সুরেশ্বর বালিশে ভর দিয়ে আধশোয়া হল। বলল, কাল তুমি ঠিকই বলেছ, হেম। এখানে থাকলে তোমার অসুখ-বিসুখ হতে পারে; হলে সে দায়িত্ব আমার ঘাড়ে এসে পড়বে। যদি কিছু হয়। এ-অসুখের কিছুই যখন ঠিক নেই তখন তোমার জীবনের দায়িত্ব আমার নেওয়া উচিত নয়। …আমি যা দিতে পারব না, তা আর নেব না।
জানলার কাঠ ছুঁয়ে রোদের পা সামান্য এগিয়েছে, দু-তিনটে চড়ুই একে অন্যের গা ঠুকরোতে ঠুকরোতে এবং কিচমিচ শব্দ করতে করতে ঘরের মধ্যে ঢুকে পাক খেয়ে আবার ফরফর করে উড়ে গেল। যাবার সময় কার একটা পালক খসে গেল, পালকটা বাতাসে ভাসতে ভাসতে সুরেশ্বরের বিছানার ওপর এসে পড়ল।
সুরেশ্বরের শেষ কথাগুলো হৈমন্তীর কানে লাগল, যেন অনেক কিছু লেখার পর রাবার দিয়ে আর সব মুছে শেষের কয়েকটা কথা রেখে দেওয়া আছে, আর ক্রমাগত কেউ তার উপর পেনসিল বুলিয়ে সেটা মোটা করছে। সুরেশ্বর কী বলতে চাইল? জীবনের দায়িত্বের কথাটা তুলে সে কি খুব সাবধানে এবং লুকিয়ে একটা খোঁচা দিল হৈমন্তীকে? সে কী বোঝাতে চাইল : সুরেশ্বর শুধু জীবন নয়, আরও কিছু–যেমন ভালবাসা দিতে পারবে না বলে ভালবাসা নেবে না!
নিজের ওপর হঠাৎ কেমন বিরক্ত হল হৈমন্তী। মনে হল, সে ছেলেমানুষের মতন যা-তা ভাবছে। ভালবাসার কথা আর ওঠে না। কীসের ভালবাসা! সুরেশ্বরকেই কি আর ভালবাসে হৈমন্তী? না। দেওয়া-নেওয়ার কথা অবান্তর।
হৈমন্তী বিরক্তির মধ্যেই বলল, আমি যাবার মোটামুটি সময় ঠিক করে ফেলেছি।
সুরেশ্বর যেন কথাটা শুনেও গা করল না। বলল, হেম, আমি কাল তোমায় বলেছিলাম–তোমায় আমি ছকের খুঁটি করিনি। রাত্রে আমি ভেবে দেখেছি, তুমি অন্যায় কথা বলোনি, ঠিকই বলেছ। সত্যিই ততা, আমার স্বার্থ ছাড়া তোমায় আমি আনব কেন? সামান্য চুপ করল সুরেশ্বর, পরে বলল, কাল তোমার অনেক কথাই আমার বড় লেগেছিল, হেম। কী জানি তুমি বলেছিলে বলেই লেগেছিল। মনটা বড় খারাপ হয়ে গিয়েছিল। …যাকগে–ভালই হয়েছে। নিজেকে মাঝে মাঝে অন্যের চোখ দিয়েও দেখতে হয়। সুরেশ্বর এবার হাসবার চেষ্টা করল। সে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল, কথার শেষে বারকয়েক হাঁপাল, সর্দিতে গলা ভারী হয়ে আছে।
হৈমন্তী অস্বস্তি বোধ করে উঠে দাঁড়াল। মালিনী থার্মোমিটার আনতে গিয়ে হারিয়ে গেল নাকি! থার্মোমিটার খুঁজে পাচ্ছে না? কি মুশকিল, হৈমন্তী তো বলেই দিয়েছে টেবিলের ওপর সেলাই করার বাক্সের মধ্যে থার্মোমিটারটা আছে। তবু পাচ্ছে না! কথাটা কানে শুনেছে কি না মালিনী কে জানে! ওই রকমই ওর স্বভাব। বা, কে জানে থার্মোমিটার আনার ফাঁকে আরও সাত জায়গায় সুরেশ্বরের অসুখের খবরটা পৌঁছে দিয়ে আসছে কি না! হৈমন্তী অস্থির হয়ে জানলার দিকে গেল।
হৈমন্তীর চাঞ্চল্য লক্ষ করছিল সুরেশ্বর। বলল, তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, না?
হাসপাতালে যাচ্ছিলাম। জানলার কাছ থেকে হৈমন্তী বলল, গলার স্বর অনুচ্চ এবং বিরক্তি সত্ত্বেও কেমন উদাসীন।
