রাত্তির থেকে, মালিনী বলল।
হৈমন্তীর হাত-পা যেন কাঁপছিল সামান্য। মালিনীর বিহ্বলতা তাকে ভীত করেছিল। কিছু খেয়াল না করেই বলল, কত জ্বর?
কত জ্বর মালিনী জানে না। বলল, গা বেশ গরম।
তুমি দেখেছ?
মাথা নাড়ল মালিনী, দেখেছে। তার ধারণা, গা পুড়ে যাচ্ছে।
হৈমন্তী হাসপাতালে যাবার জন্যে ধীরে-সুস্থে তৈরি হচ্ছিল। আজকাল তাড়াতাড়ি হাসপাতাল যাবার দরকার হয় না, রোগীই আসেনা প্রায়। কয়েক মুহূর্ত কেমন যেন বিমূঢ়তার মধ্যে কাটল; তারপর স্টেথস্কোপটা খুঁজে নিয়ে হৈমন্তী বলল, চলো দেখি।
বারান্দায় এসে হৈমন্তী শুধোল, কী করছে? শুয়ে আছে?
বিছানায় বালিশ হেলান দিয়ে বসেছিলেন, মালিনী বলল। এতক্ষণে যেন খেয়াল হওয়ায় কাপড়ের অগুছোলো ভাবটা সামলে নেবার চেষ্টা করল মালিনী।
হৈমন্তীর মনে হল, জ্বরটা হয়তো তা হলে তেমন বেশি নয়; বেশি হলে কি বসে থাকতে পারত। কী হল হঠাৎ? মনোহর, বুড়ো তিলুয়ার মতন কিছু যদি হয়–অশুভ চিন্তাটা শিখার মতন যেন দপ করে জ্বলে উঠে তখন থেকে কাঁপছে। কথাটা ভাবতে সর্বাঙ্গ অসাড় হয়ে আসছিল।
মাঠে নেমে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হৈমন্তী বলল, গায়ে মুখে কিছু দেখলে?
না।
কিছু বলল? কোনও কষ্টটষ্ট?
মাথায় যন্ত্রণা, গায়ে হাতে ব্যথা।
হৈমন্তী আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। তার কপালে কি শেষ পর্যন্ত এখানে আটকে যাওয়া আছে? কাল রাত্রে সে স্থির করে ফেলেছিল, সপ্তাহ দুয়েকের বেশি আর সে থাকবে না। আর নয়। এই পনেরো বিশ দিনের মধ্যে সুরেশ্বর যদি পারে অন্য ব্যবস্থা করে নিক। আজ গগনকে চিঠি লিখবে বলেও ঠিক করেছিল, অথচ এ কী বাধা এসে জুটল!
মালিনী পাশে পাশে যাচ্ছিল; যেতে যেতে কিছু ভাবছিল, কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আমার মাথা খুঁড়তে ইচ্ছে করছে। এত লোক থাকতে দাদারই শেষ পর্যন্ত অসুখটা হল, হেমদি? কী হবে এখন কে জানে!
মালিনীর ছেলেমানুষি আকুলতায় কান দেওয়া উচিত নয়, তবু হৈমন্তী ভাবল : ভাবল সুরেশ্বরের যদি কিছু হয় তবে এই আশ্রমের কী হবে? কী আর থাকবে? সুরেশ্বরকে বাদ দিয়ে মালিনীদের কল্পনা করা যায় না। একটা মাত্র মানুষ অথচ তার অস্তিত্বই যেন সব। হৈমন্তীর কেমন যেন বেদনা বোধ হচ্ছিল। মন থেকে এই চিন্তাটা সরিয়ে দেবার জন্যে এবং হতাশা দমনের চেষ্টায় হৈমন্তী বলল, অত ব্যস্ত হবার কী আছে, চলো আগে দেখি। জ্বর হলেই কি খারাপ ভাবতে হবে!
মালিনী বিড়বিড় করে কিছু বলল, তার কথা ভাল করে শোনা গেল না, মনে হল সে ভগবানের শরণাপন্ন হচ্ছে। ডান হাতের আলগা মুঠো বার বার কপালে ঠেকাতে লাগল, ঠোঁট নড়ছিল।
সুরেশ্বরের ঘরের বারান্দায় পা দেবার সময় হৈমন্তীর সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল, হঠাৎ কেমন হাতে পায়ে অসাড় ভাব এল, বুকের মধ্যে ধক ধক করছিল। ভরতু বোকার মতন দাঁড়িয়ে আছে দরজায়।
সুরেশ্বর বিছানায় শুয়ে; গায়ের কম্বলটা গলা পর্যন্ত ঢাকা। পায়ের শব্দে চোখ খুলে তাকাল।
হৈমন্তী সুরেশ্বরকে লক্ষ করল। লক্ষ করার সময় তার দুরকম মনোভাব হল। প্রথম তার মনে হল, সে যে-সুরেশ্বরকে দেখছে, সেই সুরেশ্বর তার অতি অন্তরঙ্গ ও প্রিয় ছিল, যার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে যাবার পরও কোথাও যেন একটা বন্ধন আছে, দায়িত্ব। এই সুরেশ্বর তাকে ব্যাকুল, বিচলিত ও ভাবপ্রবণ করে তুলেছিল। পরে, সামান্য পরে, বিছানার মাথার কাছে এসে পিঠ নুইয়ে সুরেশ্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় তার চোখের ওপর থেকে কয়েক মুহূর্তের আগেকার সুরেশ্বর যেন কোথায় অদৃশ্য হল, পরিবর্তে সে অসুস্থ এক রোগীকে দেখতে পাচ্ছিল। মিলিয়ে আসা ধোঁয়ার মতন পূর্বের আবেগ হয়তো ছিল সামান্য, কিন্তু এখন তা হৈমন্তীকে অত কাতর অথবা বিহ্বল করছিল না। সুরেশ্বরের মুখ লক্ষ করতে করতে হৈমন্তী হাত বাড়াল, কখন জ্বর এল?
মাঝরাতে– সুরেশ্বর বলল, বলে কম্বলের তলা থেকে হাত বের করে দিল।
হৈমন্তী সযত্নে, একটু বেশি সময় নিয়ে নাড়ি দেখল। হঠাৎ এল?
কাল সারাটা দিনই শরীরটা ভাল লাগছিল না। সন্ধের দিকে খুব শীত করছিল।
সুরেশ্বরের কপালে একবার হাত দিল হৈমন্তী, দেখল। থার্মোমিটার আছে এখানে?
না, সুরেশ্বর হাসবার মতন মুখ করল, ছিল একটা, ভেঙে গেছে।
হৈমন্তী মালিনীকে থার্মোমিটার আনতে পাঠাল। তার ঘরে থার্মোমিটার আছে, হাসপাতালে যেতে হবে না।
দেখি, বুকটা.. জড়ানো স্টেথস্কোপ খুলতে খুলতে হৈমন্তী বলল।
বুক পিঠ দেখল হৈমন্তী, জিব দেখল সুরেশ্বরের। এখনও শীত করছে?
কখনও-সখনও।
মাথার খুব যন্ত্রণা?
মাথাটা বড় ধরে আছে।
আর কী কষ্ট–?
গায়ে হাতে ব্যথা, কোমর পিঠে৷
হৈমন্তী কিছু ভাবছিল, বলল, দেখি, তোমার গা পিঠ দেখি আর-একবার।
সুরেশ্বর সকালে গায়ে জামা দিয়েছিল, জামাটা তুলল; হৈমন্তী নিজের হাতে সুরেশ্বরের গেঞ্জি তুলে গা পিঠ খুঁটিয়ে দেখল। দেখার সময় অকস্মাৎ তার মনে হল, সুরেশ্বরের গায়ের চামড়ায় যেন বয়সের নিষ্প্রভ এসেছে, অনেক ময়লা হয়ে গেছে রং।
সুরেশ্বর আবার গুছিয়ে গায়ে ঢাকা নিয়ে বসল।
হৈমন্তী বলল, দেখো, আবার চিকেন পক্স না হয়!
চিকেন পক্স!
দু তিনটে দিন না গেলে বোঝা মুশকিল। নয়তো, আর কিছু না; সর্দি-জ্বরের মতন মনে হচ্ছে।
সুরেশ্বর কয়েক মুহূর্ত হৈমন্তীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। পরে বলল, এখানে আমার জ্বর জ্বালা আগে কখনও হয়নি। গত বছরে একবার হাঁপানির মতন হয়েছিল। কাল থেকেই কী রকম হাঁপ ধরছে, হাঁপানিটা আবার হবে না তো?
