হৈমন্তী কোনও জবাব দিল না। মনে হল বলে, তুমি কী ভেবেছিলে সেটা তোমার ব্যাপার, আমার নয়। আমি কখনও তোমায় বলিনি, আমি সাধারণ সংসারের বাইরে যেতে চাই। আমি বলিনি, আমি তোমায় তেমন কিছু অনুমান করতেও দিইনি। অথচ তুমি আমায় এমন স্পষ্ট করে কোনওদিন বুঝতে দাওনি যে, আমায় তোমার শুধুমাত্র অন্ধ হাসপাতালের ডাক্তার হয়ে থাকার জন্য দরকার। কবে আমি অসুখে ভুগেছি, দুঃখে পড়েছি–তার জন্য আমার সমস্ত জীবন তোমার এই আশ্রমের অন্ধ-আতুরের সেবায় ব্যয় করতে হবে। কেন? কী করে তোমার মনে হল, আমার জীবন তোমার শখ মেটাবার সামগ্রী? বেশ, শখ না বললুম, তোমার অভিমানে লাগবে, বরং তোমার আদর্শই বলি, তোমার আদর্শের জন্য আমার জীবনটাকে তুমি লাগাম পরিয়ে তুলি এঁটে ছুটিয়ে দিতে পার না। আমি আলাদা, আমার মন আলাদা, আমি তোমার মতন অন্ধ কোলে করে জীবন কাটাতে চাই না। …তুমি তো আমার সঙ্গে প্রবঞ্চনা করেছ, তুমি কোনওদিন আমায় স্পষ্ট করে বলোনি, আমায় আর ভালবাস না, এ-ভালবাসায় তোমার সুখ নেই। আমাদের মতন সাধারণ মানুষের ভালবাসাবাসিতে তোমার সুখ না থাকতে পারে, কিন্তু কেন তুমি স্পষ্ট করে আগে বললে না? কী হিসেবে তুমি ধরে নিলে, তোমার সুখ আমার সুখ হবে? তোমার ইচ্ছে আমার ইচ্ছে হবে? তোমার সাধ মেটাবার জন্যে আমার জীবনটা নষ্ট করতে হবে কেন? আসল কথা কী জানো, সেই যে কথায় বলে–যে রাঁধে সে কি চুল বাঁধে না, তেমনি যে অন্ধ হাসপাতাল করে, গরিব দুঃখীদের আশ্রয় দেয় সে কী আর নিজের জন্যে ছোট একটু ঘর বাঁধতে পারে না? পারে। দয়া ধর্ম সংসারে অনেক লোক করেছে, হাসপাতাল করতে বাড়ি ঘর টাকা অনেকেই দিয়েছে, যদি বলো জীবন উৎসর্গ তাও অনেকে করেছে, কিন্তু তার জন্যে তাদের নিজের একটু ঘর রাখতে আটকায়নি। …আমার বয়েস হয়েছে, বেশ বুঝতে পারি, আমায় তুমি তোমার আশ্রমের জন্য প্রত্যাখ্যান করোনি, অন্য কোনও কারণ আছে, গগন যা বলছিল। কিন্তু সেটা কী, আমি জানি না, তুমি গোপন রেখেছ।
.
হৈমন্তী অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে স্থির অথচ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে এত কথা ভাবছিল। সুরেশ্বরও অনেকক্ষণ অন্য চিন্তা করছিল। শেষে হৈমন্তীর দিকে তাকাল, তাকিয়ে থাকল কিছু সময়, শেষে কোমল করে ডাকল, হেম।
হৈমন্তী শুনেও শুনতে পেল না।
সুরেশ্বর অপেক্ষা করল : পরে বলল, আমি তোমায় আমার স্বার্থের জন্যে চেয়েছিলাম কি না– জানি না; তবে একটা কথা ঠিক, আমি ভাবতাম তুমি আমার বড় সহায় হবে।
হৈমন্তী সামান্য মুখ ফেরাল, তুমি অনেক কিছুই ভেবেছ; যখন যা ভেবেছ নিজের দিকে তাকিয়ে ভেবেছ। …যাক, এসব কথা আমার আর ভাল লাগছে না। ছেড়ে দাও।
সুরেশ্বরের মনে হল উত্তেজনার শেষে হৈমন্তী ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার মুখে চোখে কেমন অবসন্ন ভাব ফুটে উঠেছিল। হয়তো আরও কিছু বলার ছিল সুরেশ্বরের, অন্তত বলতে পারলে ভাল হত, অথচ বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। চুপচাপ বসে থাকল সুরেশ্বর, অশান্তির মতন লাগছে, কোথাও যেন কোনও গভীর কষ্ট থেকে গেল, বলা গেল না, বলা হল না; সম্ভব হল না।
হৈমন্তী হঠাৎ বলল, তুমি যা চাও এখানে সব পেয়েছ, আমি কিছুই পাইনি। … কিন্তু এ বয়সে তা নিয়ে ঝগড়া করে লাভ কী!
আমি কি চেয়েছি, হেম? ।
সুরেশ্বরের গলার স্বরে যে কাতরতা ছিল, অর্থ ছিল হৈমন্তী তা শুনল, কিন্তু অনুভব করল না। বরং বিরক্ত হল। অনেক দিন থেকে তার মনে হয়েছে কথাটা সুরেশ্বরকে বলবে; বলবে কারণ নিজের সম্পর্কে সুরেশ্বরের বড় বেশি মোহ। হৈমন্তীর ইচ্ছে হল বলে: তুমি প্রতিষ্ঠা, সম্মান চেয়েছ; তুমি কর্তৃত্ব চেয়েছ; তোমার মধ্যে ক্ষমতা পাবার কাঙালপনা আছে; এই আশ্রমে তোমার আধিপত্য আমি দেখেছি। …সাধারণ মানুষের জগতে তোমার এ সব আশা মিটত না, তুমি ব্যর্থ হতে। সেই ভয়ে তুমি পালিয়ে এসেছ, পালিয়ে এসে এইবুনো জংলি দেশে নিজের জগৎ গড়েছ, সাধ আশা মেটাচ্ছ। তোমার সাধ্য ছিল না, খোলা সংসারের মাঠে ময়দানে দাঁড়িয়ে এত কিছু পাও। তুমি ভীরু, নিজের সঙ্গে নিজেকে ঠকিয়ে আজ সান্ত্বনা পেয়ে বেঁচে আছ।
এত কথার কিছুই হৈমন্তী বলল না। বরং শত দুঃখের মধ্যেও কেমন ম্লান হেসে, ঈষৎ বিদ্রুপের গলায় বলল, কেন, তোমার সেই বড় সুখ।
সুরেশ্বর স্থির শান্ত হয়ে বসে থাকল। বিদ্রুপে সে আহত হয়েছে কি না বোঝা গেল না।
কিছুক্ষণ আর কোনও কথা হল না।
সুরেশ্বর অবশেষে উঠে দাঁড়াল। গগনকে একটা জবাব দিতে হবে চিঠির।
আমি দিয়ে দেব।
আমারও একটা চিঠি দেওয়া উচিত।
দিও।
কী লিখব?
তোমার যা খুশি হয় লিখো।
সুরেশ্বর আস্তে আস্তে ঘরের বাইরে এল। বাইরে এসে অনুভব করল তার খুব শীত করছে। শীতে সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে উঠেছে, গা কাঁপছে, ঠোঁট থরথর করছিল। দাঁতে দাঁত চাপল সুরেশ্বর। মাথাটা ধরে গেছে বেশ।
সুরেশ্বর দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে যাবার চেষ্টা করছিল।
.
২৭.
পরের দিন সকালে মালিনী ছুটতে ছুটতে এল, মুখে থমথম করছে উদ্বেগ, দু চোখে ব্যাকুলতা; এমন উদভ্রান্তের মতন এসেছে যে তার কাঁধের ওপর কাপড় নেই, বুকের পাশ থেকেও শাড়ি পড়ে গিয়েছিল, আঁচলটা কোনও রকমে দুহাতে জড়ো করে ধরে আছে।
হেমদি, দাদার খুব জ্বর, ছুটতে ছুটতে এসে মালিনী বলল।
জ্বর! হৈমন্তীর বুকের কোথায় যেন ভয়ংকর একটা ভয়ের ঘা লেগে হৃৎপিণ্ড ধক করে উঠল, উঠে দোলকের মতন ভয়ে দুলতে লাগল। বিমুঢ় দৃষ্টিতে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে হৈমন্তী ভীত গলায় বলল, জ্বর! কখন জ্বর এল?
