তা ছাড়া কী! …এইসব আশ্রম-টাশ্রমে অন্ধ-টন্ধদের মধ্যে তোমার কোনও আদর্শ থাকতে পারে, বিশ্বাস থাকতে পারে। আমার নেই।
জানি, সুরেশ্বর ছোট্ট করে বলল।
হৈমন্তী মুহূর্তের জন্যে চুপ করে থাকলেও ঝোঁকের মাথায় বলল, তা হলে কি! এবার আমায় যেতে দাও।
সুরেশ্বর কোনও জবাব দিল না। কথা বলতে বলতে তারা অন্ধকারে হৈমন্তীর ঘরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। অন্ধকার হয়ে গেছে। মালিনী বাতি জ্বেলে রেখেছে বলে মনে হল, তার ঘরে বাতি জ্বলছিল, হৈমন্তীর ঘরের দরজা ভেজানো।
ঘরের সামনে এসে হৈমন্তী দাঁড়াল না, তবু মুহূর্তের জন্য তার পা থেমেছিল, যেন তার মনে হয়েছিল, সুরেশ্বর এখান থেকেই বিদায় নেবে। সুরেশ্বর গেল না, হৈমন্তীর পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। বারান্দায় উঠে মালিনীকে দেখতে পেল না হৈমন্তী; ঘরে এসে ভেজানো দরজা খুলল। ভেতরে বাতি জ্বলছে।
সুরেশ্বর ঘরে এসে চৌকাঠের কাছে সামান্য দাঁড়াল। হৈমন্তী এগিয়ে গিয়ে টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর বোধহয় খেয়াল পড়ায় বাতিটার শিস বাড়িয়ে দিল।
এপাশ ওপাশ তাকিয়ে সুরেশ্বর জানলার দিকে চেয়ারের কাছে এসে বলল, হেম, তুমি বড় উত্তেজিত হয়ে পড়েছ। শান্ত হয়ে বসো একটু। এভাবে তো কোনো কথা বলা যাবে না।
সুরেশ্বরের দিকে পিঠ আড়াল করে ছিল। তার যে উত্তেজনা রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু সুরেশ্বরকে তার ভাল লাগছিল না। মানুষটার সমস্ত ব্যবহারের মধ্যে আজ এমন এক হিসেবি, চালাক, প্রভুত্বপরায়ণ, সুবিধেবাদীর চেহারা ফুটে উঠেছে যে, হৈমন্তীর অসহ্য ঘৃণা হচ্ছিল। আশ্চর্য, এই মানুষ ভেতরে ভেতরে এত ভেবেছে : ভেবেছে হৈমন্তীকে সরিয়ে নতুন ডাক্তার আনবে, ডাক্তারের জন্যে চিঠি লিখেছে, বিজ্ঞাপন দেবার কথা ভেবেছে, সবই ঠিকঠাক প্রায়–অথচ ঘুণাক্ষরেও হৈমন্তীকে কিছু জানায়নি। নেহাত একটা রোগ বেধে গিয়ে সব গোলমাল করে দিল, নয়তো এতদিনে হয়তো সুরেশ্বরের নতুন ডাক্তার জুটে যেত। তখন বিনয় করে বলত : হেম, আমি ভেবে দেখলাম, তোমার এখানে অসুবিধে হচ্ছে, তুমি বরং কলকাতায় ফিরেই যাও।
চেয়ারে বসতে বসতে সুরেশ্বর বলল, বোসো, দুটো কথা বলি।
হৈমন্তী বসল না, বলল, আমি ঠিক আছি।
তুমি না বসলে আমার খারাপ লাগছে। বোসো।
হৈমন্তী বাধ্য হয়ে বসল।
সুরেশ্বর অল্প সময় কিছু বলল না, পরে বলল, তুমি যখন এসেছিলে, তখন আমি তোমায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, থাকতে পারবে? তুমি বলেছিলে, পারবে। পরে আমার মনে হয়েছিল, তুমি হয়তো শেষ পর্যন্ত থাকতে পারবে না। আমি তোমায় আগেও বলেছি, এখানে তোমার মন যদি না টানে, আমি জোর করে ধরে রাখব না। …তুমি যাবে, আমি তো তোমায় আটকাচ্ছি না। কদিন আরও থেকে যেতে বলেছিলাম। যদি না পার, থেকো না। এতে তুমি রাগ করছ কেন? অসহিষ্ণু হবার তো কোনও কারণ নেই।
হৈমন্তী চোখ তুলে না তাকিয়ে পারল না। সুরেশ্বর এমনভাবে কথা বলছে যেন হৈমন্তীর এখানে আসা, থাকা, যাওয়া–এর কোনওটাই তেমন করে গায়ে মাখার মতন নয়; সহজ একটা অঙ্ক যদি যোগে না-হয় বিয়োগ করলেই হল। কী করে, কেমন নির্বিকারভাবে একটা মানুষ এসব কথা বলতে পারে, হৈমন্তী ভেবে পাচ্ছিল না। কপালের শিরা এবং মাথায় কেমন একটা দপদপে কষ্ট হচ্ছিল।
তোমার কাছে– হৈমন্তী কী বলতে গিয়ে কথা হারিয়ে ফেলল; তার চোখের দৃষ্টি তীব্র ও সমস্ত মুখ কালশিরে পড়ার মতন কালচে হয়ে এসেছিল। নিষ্পলক কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর হৈমন্তী বলল, তোমার কাছে জীবনটা যত হাওয়া বাতাসের, আমার কাছে তা নয়।
হাওয়া বাতাসের? সুরেশ্বর আপনমনে বলার মতন করে বলল, বলে জিজ্ঞাসুর মতন তাকিয়ে থাকল। কথাটা আমি ভাল বুঝলাম না, হেম।
হৈমন্তীর গলার স্বর সামান্য খসখসে এবং তীক্ষ্ণ হয়ে এসেছিল, গলার নীচে একটি শিরা ফুলে আছে। হৈমন্তী বলল, না বুঝলে বুঝো না; আমিও তো অনেক কিছু বুঝতে পারলাম না। হৈমন্তী চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকাল।
সুরেশ্বর স্থির হয়ে বসে থাকল, ভাবছিল। হৈমন্তীর শেষ কথার অর্থ সে বুঝতে পারছে। অথচ বলার মতন কিছুই যেন খুঁজে পাচ্ছে না। মাথা ধরে যাচ্ছিল। আজ সারাটা দিন কেমন ভাল লাগছেনা,শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে।
হৈমন্তী বলল, তোমার অন্ধ-সেবা তোমার সুখ, আমার কিছু নয়। তুমি আমায় কেন তোমার ছকের খুঁটি করেছিলে আমি জানি না।
সুরেশ্বর আহত হল। তার চোখে ক্ষণিকের জন্য আঘাত এবং বেদনার, মুখে বিষণ্ণতার ময়লা দাগ ফুটল। এই অভিযোগ সত্য হোক না হোক, তার বলার কিছু নেই। কিন্তু হেম যেভাবে কথাটা বলছে, সেভাবে ভাবতে সুরেশ্বরের কষ্ট হচ্ছিল। সুরেশ্বর অনুচ্চ, দুঃখিত স্বরে বলল, আমার ভুল আমি মেনে নিয়েছি, হেম। তবে তুমি যে কেন ও কথাটা বললে, আমি বুঝতে পারলাম না। আমি কি তোমায় সত্যিই ছকের খুঁটি করেছিলাম?
আর কী! হৈমন্তী বাঁ পাশের গলা টান করে বলল, ভঙ্গিটা দুঃখের অথচ উপহাসের।
দুজনেই নীরব হয়ে গেল তারপর। ঘরের মধ্যে কেমন জনহীনতার নিস্তব্ধতা সৃষ্টি হচ্ছিল, বাতির আলো ফ্যাকাশে সাদা, শীত ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে, কখনও হৈমন্তীর, কখনও সুরেশ্বরের দীর্ঘ নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছিল। নিঃসম্পর্কের মতন, অপরিচিতের মতন দুজনে বসে থাকল।
অবশেষে সুরেশ্বর বলল, হেম, আমি তোমায় ছকের খুঁটি করব, একথা আমি ভাবিনি কখনও। আমার মনে হত, তুমি অল্প বয়সে মানুষের দুঃখের দিক দেখেছ, নিজেও সেই অসহায়তার স্পর্শ পেয়েছ, হয়তো তুমি সাধারণ সংসারের বেড়ার বাইরে আসতে আপত্তি করবে না।
