সুরেশ্বর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল কিনা বোঝা গেল না। কিছু বলছিল না। নীরবে দুজনে আরও একটু হেঁটে এল। দেখতে দেখতে কেমন অন্ধকার হয়ে এল। দূরে নদীর দিকে শূন্যতায় ধুলোর গায়ে বুঝি কুয়াশা জমতে শুরু করেছে।
সুরেশ্বর বলল, তুমি যাবার ব্যাপারে কিছু ঠিক করেছ?
হৈমন্তীর পা থমকে স্থির হয়ে গেল, বাঁ পা বাড়িয়ে সে দাঁড়াল, ডান পা আর তুলতে পারল না। সুরেশ্বরের দিকে তাকাল, সুরেশ্বর দুপা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ যেন কেমন একটা আক্রোশ ও ঘৃণা হৈমন্তীকে কিছুক্ষণের জন্যে কিছু দেখতে দিল না, ভাবতে দিল না। জীবনে বোধহয় আর কখনও এমন তিক্ততা সে অনুভব করেনি। সুরেশ্বরকে অত্যন্ত ইতর,কপট ও স্বার্থপর মনে হচ্ছিল। কী ভাবছে সুরেশ্বর? সে কি ভেবে নিয়েছে, হৈমন্তী পালিয়ে যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে রেখেছে?
সুরেশ্বর দাঁড়িয়ে পড়েছিল। হৈমন্তী আসছে না দেখে অপেক্ষা করছিল।
শেষ পর্যন্ত হৈমন্তী পা বাড়াল।
সুরেশ্বর বলল, হেম, আমি কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, তোমার সঙ্গে কটা কথা বলব। ..গগন থাকতে থাকতেই ভেবেছি কথাটা বলি। বলা হয়নি। তারপর এই রকম একটা অবস্থা দাঁড়াল।
হৈমন্তী সামান্য দ্রুত পায়ে হাঁটার চেষ্টা করছিল, যেন সুরেশ্বরের সঙ্গ তার আর পছন্দ হচ্ছিল না, সহ্য হচ্ছিল না। দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করতে গিয়ে উত্তেজনার মাথায় হৈমন্তীর শরীর কাঁপছিল, পা এলোমেলো হয়ে পড়ছিল।
হৈমন্তী ঝোঁকের মাথায় তিক্ত গলায় বলল, যাবার দিন আমি এখনও ঠিক করিনি কিছু কাল পরশুর মধ্যে করব।
সুরেশ্বর হৈমন্তীর ক্রোধ এবং তিক্ততা অনুভব করতে পারছিল। অল্প সময় কথা বলল না। পরে বলল, তুমি আরও কয়েকটা দিন থাকলে ভাল হয়।
হৈমন্তীর ইচ্ছে হল দাঁড়ায়, সুরেশ্বরের নির্লজ্জ মুখের চেহারাটা একবার দেখে, বলে : কেন? তোমার এই আশ্রমের আবার কে অসুখে পড়বে তার চিকিৎসা করতে নাকি?
সুরেশ্বর যেন আগেই কিছু ভেবে রেখেছিল, এখন তা বোঝাবার চেষ্টা করছে–এমনভাবে বলছিল, আমি একজন ডাক্তারের খোঁজ করছি, হেম। পাটনায় উমেশবাবুকে লিখেছি, রাঁচিতে শিবনন্দনজির এক ভাই থাকেন ডাক্তার, তাঁকেও বলা হয়েছে। ভেবেছিলাম, কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেব–পাটনার কাগজে। কলকাতা থেকে ডাক্তার এনে লাভ হবে না, তারা এ জায়গায় থাকতে পারবে না। গগন থাকতে থাকতেই এসব ভেবেছিলাম। হয়তো এ ব্যাপারটায় এতদিনে মন দিতে পারতাম, একটা কিছু ব্যবস্থাও হত, কিন্তু হঠাৎ এই অসুখটা এসে সব গোলমাল হয়ে গেল। …আমার আর কদিন সময় দরকার।
সুরেশ্বরের কথার মধ্যে কোনও লুকোচুরি নেই, আবেগ নেই, রহস্য নেই, একেবারে সাদামাটা, সরল কাজের কথা। নিজের অসুবিধে, সমস্যা এমনকী প্রয়োজন সম্পর্কেও সে সচেতন; নিজের স্বার্থটুকু প্রকাশ করতে তার কোনও রকম সঙ্কোচ হল না।
হৈমন্তীর পক্ষে এই নির্লজ্জতা অসহ্য হল যেন। বলল, তুমি আমায় কী মনে করো?
সুরেশ্বর কোনও জবাব দিল না। হাঁটতে লাগল।
হৈমন্তীও হাঁটছিল। বলল, তোমার সুবিধে অসুবিধে বুঝে আমায় চলতে হবে?
সুরেশ্বর কী যেন বলার চেষ্টা করল; হৈমন্তী বলতে দিল না। বিতৃষ্ণায় এবং ক্রোধে প্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে হৈমন্তী বলল, এখানে এই এপিডেমিকের মধ্যে আমি কেন থাকব? কী লাভ আমার থেকে? যদি আজ আমার অসুখ হয়, কে দেখবে? তুমি?
সুরেশ্বর হৈমন্তীর গলার স্বরে অস্বস্তি বোধ করছিল, বলল, হেম, তুমি মাথা গরম করছ। একটু শান্ত হয়ে ভাবো। বলে সুরেশ্বর যেন হৈমন্তীকে মাথা ঠাণ্ডা হবার সময় দিল সামান্য, বলল, এই অসুখ তোমার আমার মালিনীর–এখানের যে-কোনও লোকের হতে পারে। আবার না-ও হতে পারে। আমরা কিছু জানি না। যদি আমাদের হয় তুমি দেখবে যদি তোমার হয় আমরা কি তোমায় দেখব না?
তোমরা! হৈমন্তী যেন উপহাস করে হাসবার চেষ্টা করল।
সুরেশ্বর অপ্রতিভ হল না; বলল, আমরা ডাক্তার নই; কিন্তু চিকিৎসার ব্যবস্থা তোমার বেলায় হবে না বলেই কি তোমার মনে হয়!
অন্ধ আশ্রমের ফটকের সামনে এসে পড়েছিল ওরা।
সুরেশ্বর বলল, মনোহর, তিলুয়া, গির্জার বেলায় তুমি যথাসাধ্য করেছ। একজনকে তুমি বাঁচিয়ে তুলেছ…
তার জন্যে কি আমি তোমাদের কাছে বাঁধা পড়ে গেছি?
না না; তা কেন! …এখন এ অবস্থায় তুমি এতগুলো মানুষের ভরসা।
তোমার অন্ধ আশ্রমের মানুষদের, তোমার।
হ্যাঁ; আমাদের।
তাতে আমার কোনও গরজ নেই। তোমার অন্ধ আশ্রমের কার কী হল, তাতে আমার কী যায় আসে?
হেম… সুরেশ্বর যেন কোনও ছেলেমানুষের মুখে বোকার মতন কোনও কথা শুনে শুধরে দেবার মতন করে হাসল, বলল, হেম, এ তোমার রাগের কথা। মানুষের জন্যে মানুষেই করে, একের রোগে শোকে অন্যে ভাবে।
আমি ভাবিনি। আমি তোমার এখানের কারও কথা ভাবি না।
তুমি তাদের জন্যে অসুখের সময় ভেবেছ।
ওকে ভাবা বলে না। আমার কর্তব্য করেছি। উপায় ছিল না বলে করেছি।
এভাবে কি সংসারে বাঁচা যায়?
বাঁচার কথা উঠছে কেন! তোমার এই আশ্রম আমার সংসার নয়। হৈমন্তী রূঢ় গলায় বলল, নেহাতই আমি ডাক্তার, এখানে আর কোনও ডাক্তারবদ্যি নেই, তাই বাধ্য হয়ে আমায় আমার কর্তব্য করতে হয়েছে।
এদের জন্যে তোমার মমতা হয়নি?
না।
না?
জানি না; দুঃখ হলেও হতে পারে, কিংবা কষ্ট…।
তুমি শুধু ডাক্তারি নীতি মেনেছ?
