শিবনন্দনজি বলছিলেন– সুরেশ্বর বলল, এখন আর কোথাও মেলা বসতে দিচ্ছে না, পুলিশ গিয়ে দোকানপসার তুলে দিচ্ছে। কোথায় যেন মেঠাইমণ্ডা সব ফেলে দিয়েছে টান মেরে, চাটাই ছাউনির ঢাকা-টাকা পুড়িয়ে দিয়েছে।
মনে মনে হৈমন্তী বলল : ভালই করেছে। হতভাগার দল যত! মরছে, তবু মেলায় যাবে, গিয়ে ওই মেঠাইমণ্ডা খাবে। কিন্তু সুরেশ্বর কি এইসব কথা বলার জন্যে তার কাছে এসেছে? হৈমন্তীর মনে হল না, পাটনা থেকে ডাক্তার আসছে, পুলিশ মেলা বন্ধ করে দিচ্ছে–এসব তুচ্ছ কথা শোনাবার জন্যে বা তা নিয়ে গল্প করার জন্যে সুরেশ্বর এসেছে।
অন্ধ আশ্রমের ফটক পেরিয়ে তারা জামতলার সামনে এসে দাঁড়াল। গোধূলি নামছে। হৈমন্তী লাটুঠার দিকের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল। শীত মরে আসছে, তবু বেশ ঠাণ্ডা আছে এখনও। ধুলোয় মাঠঘাট ধূসর, আলোর অভাবে এবং ছায়ার জন্যে ছোট ছোট ঝোপঝাড়গুলো কালচে দেখাচ্ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে সুরেশ্বর এবার বলল, কলকাতা থেকে কোনও চিঠি পেয়েছ হেম?
হৈমন্তী মুখ তুলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। এতক্ষণে যেন সুরেশ্বরের আসার কারণটা সে বুঝতে পারল।
কদিন আগে পেয়েছি, হৈমন্তী বলল।
সামান্য অপেক্ষা করে সুরেশ্বর বলল, আমি আজ গগনের একটা চিঠি পেলাম।
হৈমন্তী মুখ তুলে সুরেশ্বরকে দেখল না; না দেখেও অনুমান করতে পারল গগন কী লিখেছে। অন্যমনস্কভাবে আকাশে গোধূলির মেঘ দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগল।
সুরেশ্বর অল্প সময় নীরব থাকল, পরে বলল, গগনকে তুমি কিছু লিখেছিলে?
হৈমন্তী ঘাড় ফিরিয়ে সুরেশ্বরকে বলল, কীসের কী লিখব।
এখানের অসুখ-বিসুখের কথা?
গগন নিজেই দেখে গেছে।
তখন এতটা বাড়াবাড়ি এদিকে হয়নি। সুরেশ্বর যে প্রতিবাদ করল তা নয়, তবু মনে হল সে বলতে চাইছে, গগন যখন গেছে তখন এমন কিছু হয়নি যাতে খুব একটা ভয় পাবার মতন অবস্থা হয়েছিল। হৈমন্তী বুঝতে পারল গগন বেশ ভয় পেয়ে কিছু লিখেছে।
সুরেশ্বর মাঠঘাট দেখতে দেখতে বলল, গগন তোমায় কলকাতায় পাঠিয়ে দেবার কথা লিখেছে।
হৈমন্তী প্রথমটায় মুখ ফেরাল না, যেমন হাঁটছিল সেই রকম আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল, পরে মুখ তুলে সুরেশ্বরকে দেখল। গগন যে কিছু অন্যায় করেনি সে সম্পর্কে হৈমন্তীর সন্দেহ ছিল না। সে বেচারির দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা হতেই পারে; তার ওপর যদি মা আর মামা সব শোনে তবে কলকাতার বাড়িতে খুব একটা উৎকণ্ঠা যাচ্ছে যে তাতে সন্দেহ নেই।
গগনের চিঠি পড়ে আমার মনে হল– সুরেশ্বর বলল, তুমি কিছু লিখেছ। … এখানের অবস্থা যা হয়ে দাঁড়িয়েছে–দেখলাম সে প্রায় সবই জানে।
হৈমন্তী কেন যেন বিরক্তি বোধ করল। সুরেশ্বরের কথার ধরন থেকে তার মনে হচ্ছিল, হৈমন্তী যেন লুকিয়ে লুকিয়ে গগনকে ভয় পাইয়ে দেবার মতন কিছু লিখেছে। বিতৃষ্ণা অনুভব করল হৈমন্তী, সুরেশ্বরের দিকে কয়েক পলকের জন্যে তাকাল, মনে মনে বিরক্তির সঙ্গে বলল : তোমার বুঝি মনে হচ্ছে আমি এখান থেকে পালাবার মতলব করে গগনকে সব লিখেছি? গগন আমার কথা মতন তোমায় লিখেছে?
গায়ের গরম চাদরটা ঘন করে জড়িয়ে নিতে নিতে হৈমন্তী বিরক্ত গলায় বলল,তোমার মনে হলে আমার আর কী করার আছে। আমি তেমন কিছু লিখিনি। বলে একটু থামল হৈমন্তী, আবার বলল, সাধারণ একটা বুদ্ধি আমার আছে :কলকাতায় ওদের উদ্বন্ত করে তুলে কী লাভ।
হৈমন্তীর গলার স্বরে বিরক্তি ও অপ্রসন্নতা অনুভব করে সুরেশ্বর হৈমন্তীর দিকে তাকাল। ঈষৎ যেন অপ্রস্তুত হয়েছে, বলল, তা ঠিক; আমিও তাই ভাবছিলাম–দুরে যারা রয়েছে তারা কিছু জানছে না দেখছে না, অযথা ওদের ব্যস্ত করে ভয় পাইয়ে কী লাভ! … গগন বেশ ভয় পেয়েছে, মাসিমাকেও কিছু কি আর জানায়নি। … গগনটা এত কথা জানল কী করে।
হৈমন্তীর এতক্ষণে সন্দেহ হল, অবনী নিশ্চয় গগনকে লিখেছে।
সুরেশ্বর বলল, গগন তোমায় কিছু লেখেনি?
কথাটা তেমন খেয়াল করে শুনল না হৈমন্তী। সে অবনীর কথা ভাবছিল : ভাবছিল, গগনকে সবিস্তারে কেউ কিছু লিখে থাকলে অবনীই লিখেছে। তার পক্ষে লেখা সম্ভব। হৈমন্তী ভাবল, কথাটা সুরেশ্বরকে বলবে নাকি? পরে মনে হল, থাক বলবে না। অথচ হৈমন্তীর খারাপ লাগছিল; সুরেশ্বর হয়তো মনে মনে ভেবে রাখল, হৈমন্তী কিছু গোপন রাখছে।
সামান্য অপেক্ষা করে সুরেশ্বর আবার বলল, গগন তোমায় কিছু লেখেনি, হেম?
কলকাতায় যাওয়ার কথা?
হ্যাঁ। সুরেশ্বর মাথা নাড়ল।
লিখেছে।
সুরেশ্বর চুপ করে থাকল, যেন অপেক্ষা করছে হৈমন্তী আরও কিছু বলবে বলে। হৈমন্তী কিছু বলছিল না। আকাশে গোধূলি ফুরিয়ে এল; পশ্চিমের আকাশে অন্ধকারের জোয়ার আসছে, অবশিষ্ট একটু লালের আভার ওপর কালোর ছায়া। মাথার ওপর দিয়ে নিঃসঙ্গ কোনও পাখি ভীত হয়ে উড়ে যাচ্ছিল।
হৈমন্তী এই নিঃশব্দতায় কেমন আড়ষ্ট বোধ করল। আসন্ন সন্ধ্যার মতন কোনও কিছুর বিষণ্ণ ভার তাকে আচ্ছন্ন করে আনছিল। হৈমন্তী বলল, সন্ধে হয়ে গেল; ফিরি। শীত করছে।
অন্যমনস্কভাবে সুরেশ্বর বলল, চলো-ফেরা যাক।
ফেরার পথে হৈমন্তী বলল, গগন যখন যায়, তখনই তার বেশ ভাবনা হয়েছিল।
জানি। আমায় বলেছিল।
এখনকার অবস্থা আরও খারাপ! …আমি তাকে ব্যস্ত করার মতন কিছু লিখিনি; তবে চারপাশে খুব অসুখ-বিসুখ চলছে এখন–এরকম কিছু লিখেছিলাম। হয়তো তাতেই আরও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মা…
