সুরেশ্বর রীতিমতো উদ্বেগের মধ্যে একদিন শিবনন্দনজিকে সঙ্গে করে টাউনে গেল। সেখানে সরকারি হাসপাতাল আছে, ডাক্তার আছে, হেলথ-ডিপার্টমেন্ট আছে। ঘুরে এসে বলল, রোগের খবরটা হেলথ-ডিপার্টমেন্টেরও কানে গেছে, তারা খোঁজখবর শুরু করেছে। সরকারি হাসপাতালে এধরনের রোগী গোটা চারেক এসেছিল। দুটো মারা গেছে, একটা বেঁচেছে; একটা ভুগছে এখনও। রোগটা অদ্ভুত, কী রোগ কেউ বলতে পারছে না। কেউ বলছে, টাইফাস, কেউ বলছে অন্য কিছু।
আরও দশ পনেরোটা দিন এই ভাবেই কাটল। গির্জা কেমন করে যেন বেঁচে গেল।
তারপর বেশ বোঝা গেল, রোগ যাই হোক–মহামারীর চেহারা নিয়েই সেটা এ তল্লাটে দেখা দিয়েছে। প্রথমে যদি বা সন্দেহ ছিল, এখন অন্তত মনে হয় রোগটা যতই বিচিত্র হোক সংক্রামক রোগের মতনই সেটা ছড়িয়েছে। এই সময়টা এদিকে মেলা-টেলার সময়, নানা জায়গা থেকে ব্যাপারি আসে, কেনাবেচার জন্যে লোকে এ-মেলা থেকে ও-মেলা যায়, কিছু ধুনিঅলা সাধুবাবা থেকে ছেঁড়া তাঁবুতে ম্যাজিক দেখানো ম্যাজিসিয়ান পর্যন্ত মেলায় মেলায় টহল দিয়ে বেড়ায়, রামলীলার দল আসে, নাওটাঙ্গির নাচ–তাও থাকে। মেলাতেই প্রথমে রোগটা কেউ বয়ে এনেছিল, তারপর এ-মেলা ও মেলা হয়ে সেটা ছড়িয়েছে, এখন মেলা-ফেরত মানুষের সঙ্গে ক্রমশই গাঁ-গ্রাম গিয়ে ঢুকেছে। শহরটহর হলে, ঘন বসতি থাকলে হয়তো রাতারাতি রোগটা মারাত্মক হয়ে ছড়িয়ে পড়ত, দূরদূরান্তে বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো গাঁ-গ্রামের বসতি, হয়তো তাই ব্যাধিটা ছড়াতে বিলম্ব হচ্ছিল। এক পক্ষে এটা ভাল, অন্য পক্ষে মন্দ। মন্দ এই জন্যে যে, শহরে-নগরে হলে একটা রইরই বাঁধত, মিউনিসিপ্যালিটির টনক নড়ত, ডাক্তার বদ্যি ছোটাছুটি করত, সরকারি নজর পড়ত। তাতে দশটা মরত বাকি নব্বইটাকে বাঁচাবার চেষ্টা হত। এ-জায়গাটা শহর নয়, না মিউনিসিপ্যালিটি না ইউনিয়ন বোর্ড, কোথাও কোথাও নামে নাকি পঞ্চায়েত আছে, ডাক্তার বদ্যির বালাই নেই, কাজেই কোথায় কোন দেহাতে কে মরছে, কী রোগ হচ্ছে–কে তার খবর রাখে। সরকারি নজরটাও এতদিনে পড়েনি। গা এলিয়ে কে কী দেখছে কিছুই বোঝা যায় না। শোনা যাচ্ছে, হাকিম নাকি মেলা-টেলা বন্ধ করার হুকুম দেবেন। হেলথ-ডিপার্টমেন্টের লোক কতক মুদ্দোফরাশ জোগাড় করে কিছু ব্লিচিং পাউডার আর মশা মারা তেল দিয়ে কয়েকটা গাঁ-গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে কয়েকজন টিকাদার বেরিয়েছে। বসন্তের টিকে দিতে। বসন্তের টিকে এরা বড় কেউ নেয় না, টিকাদার দেখলে ঘর ছেড়ে ক্ষেতিতে পালায়, মেয়ে বউরা কান্নাকাটি শুরু করে, বাচ্চাগুলো চুহার মতন লুকোয়।
শিবনন্দনজির কাছ থেকে এই সব খবর পাওয়া যাচ্ছিল। একদিন তিনি বললেন, এ অঞ্চলে কলেরা বসন্তের মহামারী হতে আগে তিনি দেখেছেন, মহামারীটা আসে যেন পঙ্গপাল আসছে : প্রথমে ফড়িংয়ের মতন পাঁচ দশটা কোথা থেকে ছিটকে আসে, কেউ খেয়াল করে না, বোঝেও না, তারপর দেখতে দেখতে হঠাৎ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি আসার মতন এক ঝাঁক পঙ্গপাল এসে পড়ে; তখন খেয়াল হয়, সামাল দেবার জন্যে ছুটোছুটি শুরু হয়, কিন্তু ততক্ষণে আকাশ কালো করে অন্তহীন এক মেঘের মতন তারা এসে গেছে। সেই ভয়ংকর দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আর কিছু করার সাধ্য মানুষের থাকে না।
কথাটা শিবনন্দনজি বোধহয় ঠিকই বলেছিলেন, মহামারীটা আকাশ কালো করা পঙ্গপালের মেঘের মতনই এসে পড়ল। গাঁ-গ্রাম থেকে চোখ দেখাতে অন্ধ আশ্রমে রোগী আসার সংখ্যাও ক্রমশই কমে গেছে। এখন দু-একজন যদি বা আসে। ততদিনে মাঘ ফুরিয়ে আসছে।
.
সেদিন বিকেলের শেষ দিকটায় সুরেশ্বর এল। হৈমন্তী বাড়ির সামনে মাঠে পায়চারি করছিল, মালিনী ছিল এতক্ষণ, কাছাকাছি, এইমাত্র ঘরে গেছে।
সুরেশ্বর এসে বলল, তোমার কাছেই এলাম।
হৈমন্তী দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সে বুঝতে পারল না দাঁড়িয়ে থাকবে, হাঁটবে, নাকি ঘরে যাবে। সুরেশ্বর কেন এসেছে তা জানতে তার তেমন কোনও আগ্রহ ছিল না। আজকাল মাঝেমাঝেই সুরেশ্বরকে তার কাছে আসতে হচ্ছে, তাগিদ হোক প্রয়োজন হোক–এ সবই সুরেশ্বরের; অসুখটা আশ্রমে ঢুকে না পড়লে সুরেশ্বরের হৈমন্তীকে প্রয়োজন হত না; সুরেশ্বর বিপাকে পড়েছে, হৈমন্তীও আজ হঠাৎ প্রয়োজনীয় মানুষ হয়ে উঠেছে। হৈমন্তী মনে করে না, এর কোনও মূল্য আছে, তার ভালও লাগে না। বরং কখনও-সখনও সে কৌতুক অনুভব করে, উপহাসের ইচ্ছে জাগে, বিতৃষ্ণা আসে।
সুরেশ্বর বলল, এখনও সন্ধে হয়নি, চলো একটু হাঁটি। বলে পা বাড়াল সুরেশ্বর।
হৈমন্তীও বাধ্য হয়ে হাঁটতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে সুরেশ্বর বলল, একটা খবর শুনেছ?
এখনকার সব খবরই রোগ-মহামারীর মৃত্যুর। হৈমন্তী কোনও উৎসাহ বোধ করল না। বরং তার বিরক্তি হচ্ছিল। কেন যেন আজ দুপুর থেকে সে অবনীর প্রত্যাশা করছিল। ছ সাত দিনের মধ্যে অবনী আর আসেনি। আজ সে আসবে এই রকম মনে হচ্ছিল।
সুরেশ্বর বলল, পাটনা থেকে কিছু ডাক্তার-টাক্তার আসছে শুনলাম, ভলেন্টিয়ারও আসতে পারে। তাঁবু ফেলে থাকবে। …তা তাড়াতাড়ি এসে পড়লেই ভাল, কি বল? এদের তো সব কিছুতেই গড়িমসি।
হৈমন্তী নীরবে হাঁটতে লাগল। কারা আসবে, কখন আসবে, কোথায় কোথায় তাঁবু পাতবে এর কোনও কিছু জানার জন্যে সে ব্যগ্র নয়। যদি ডাক্তার নার্স ভলেন্টিয়ার ওষুধপত্র আসে–ভালই হবে; আসা উচিত–এই পর্যন্ত সে ভাবতে পারে, তার বেশি আর কিছু নয়। সুরেশ্বরের মতন, সে কি চাতকের মতন পাটনার ডাক্তারদের জন্যে দিন গুনবে নাকি?
