সুরেশ্বর একদিন বলল, হেম, অসুখটা কি সত্যিই ছোঁয়াচে বলে মনে হচ্ছে তোমার?
ঘাড় নাড়ল হৈমন্তী, তাই তো মনে হয়। বুড়ো তিলুয়া যেভাবে মনোহরের রোগশয্যায় আসা-যাওয়া করত তাতেও এরকম সন্দেহ হয়।
অসুখটা কী?
কী জানি! বুঝতে পারছি না।
তবু… তোমার কী মনে হয়?
আন্দাজে রোগ বলা যায় না। আমি চোখের ডাক্তার, এসবের তেমন কিছু বুঝি না।
অতদিন লেখাপড়া করলে—সুরেশ্বর যেন হতাশ হল। সে কিছু জানতে চাইছিল। তার এই ব্যগ্রতা স্বাভাবিক। তার মনে হত, হৈমন্তী অন্তত একটা কিছু অনুমান করতে পারবে। এ-রকম কেন মনে হত সে জানে না। হয়তো এই জন্যে যে, অন্য কোথাও থেকে কিছু জানার উপায় ছিল না; বা সুরেশ্বর ভাবত, হেম কলকাতার ডাক্তারি কলেজে অতদিন ধরে পড়েছে, তার পক্ষে এই অসুখ জানা সম্ভব। হয়তো এ-সবও কিছু না; অন্ধ আশ্রমের মধ্যে রোগটা ঢুকে পড়ায় সে উদ্বেগ বোধ করছিল; যদি এমনই হয়–লোকে যা বলাবলি করছে–এটা একটা নতুন উপদ্রব, এ তল্লাটে দেখা দিয়েছে, তবে কী করে কেমন করে আশ্রমের মানুষগুলোকে নিরাপদে রাখা যায় সুরেশ্বরের সেই দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছিল। তা ছাড়া এখানে এমন কিছু নেই যাতে অন্য কোনও ব্যাধির চিকিৎসা হতে পারে। সাধারণ জ্বর-জালা, এমনকী এ-সময়ে এখানে যেটা হয়–জল বসন্ত–এসবে কোনও ভয়-ভাবনা ছিল না। কিন্তু এখন যা শোনা যাচ্ছে তাতে উদ্বেগ বোধ না করে উপায় নেই।
হৈমন্তীর ওপর সুরেশ্বরকে ভরসা করতে হচ্ছিল। রোগটা কী? রোগটা কি ছোঁয়াচে? সত্যিই এপিডেমিক দেখা দিল? যদি তাই হয় তা হলে কী করা যায় বলতে পার? কি করে এখানের লোকগুলোকে নিরাপদে রাখি? কেমন করে বাঁচাই? অসুখের চিকিৎসারই বা কী হবে? ওষুধপত্র কোথায়? এটা কী ধরনের ছোঁয়াচে রোগ? –এই ধরনের প্রশ্ন, উদ্বেগ তাকে চিন্তিত করছিল, এবং পরামর্শের জন্যে হৈমন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছিল।
প্লেগ বলে মনে হয় তোমার? সুরেশ্বর জিজ্ঞেস করল আর একদিন।
না–না। হৈমন্তী মাথা নেড়ে বলল।
তবে! কী এমন রোগ?
জানি না! কত রকমের রোগ আছে। সব সময় সব রোগ বোঝাও যায় না। মাঝে মাঝে এক-আধটা অদ্ভুত রোগও আসে…।
সুরেশ্বর আর কিছু বলল না।
হৈমন্তী তার সাধ্যমতো ভেবেছে, ভেবে দেখেছে এই বিচিত্র রোগ তার জ্ঞানের বাইরে। রেটিনাইটিস, কেরাটাইটিস, গ্লুকোমা–এসব হলে সে বলতে পারত, কিন্তু এ রোগের সে কী জানে, কী বা বলতে পারে। যদি কেতাবি বিদ্যেতে সন্দেহ করতে হয়, তবে হৈমন্তী সন্দেহ করবে মনোনিউক্লোসিস; অথচ পুরোপুরি তা নয়; স্কারলেটিনারও লক্ষণ পাওয়া যায়। এই দুই রোগ সম্পর্কে তার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। থাকার কথাও নয়। দ্বিতীয় রোগ এক-আধটা তবু দেখেছে
প্রথমটা আদপেই নয়। মনোহরের বেলায় কিছুই বোঝা যায়নি, বুড়ো তিলুয়ার বেলায় কিছু একটা ঠাওর করার আগেই সে নিউমোনিয়া হয়ে মারা গেল, আপাতত যে পড়ে আছে, গির্জা, তাকে দেখেই হৈমন্তীর এই রকম মনে হচ্ছে। তবে তার এই অনুমান ভুল হতে পারে, হওয়াই স্বাভাবিক। এসব রোগে মানুষ ভোগে কিন্তু কদাচিৎ মারা যায়। প্রথমটা তো সাধারণত কমবয়েসীদের। …এ সবই তার নিছক একটা অনুমান, নিজেরই শত সন্দেহ। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত যা শোনা যাচ্ছে তার কতটা গুজব, কতটা সত্যি তা কেউ জানে না। হতে পারে এদিকের এ-মেলা সে-মেলায় দশ বিশ জন মারা গেছে, কিন্তু তারা কোন রোগে মারা গেছে কে বলবে! শীতে দু-চারটে বুড়োবুড়ি অনায়াসেই মরতে পারে : যে রকম ঠাণ্ডা তাতে মেলার ফাঁকা মাঠে প্রায় নির্বস্ত্র কটা গরিব রাত্রের হিমঠাণ্ডায় যে নিউমোনিয়া বাঁধায়নি তাই বা কে জানছে। যে সব খাদ্য মেলায় খাচ্ছে তাতেও দু-পাঁচটা মরতে পারে, বিচিত্র কী! তার ওপর শোনা যাচ্ছে কোথাও কোথাও বসন্ত শুরু হয়ে গেছে, যদি তাই হয় তবে এমনও হতে পারে মেলায় গিয়ে কারও জ্বর হয়েছে, বাড়িতে ফিরেছে বসন্ত নিয়ে, বাড়ি এসে পরে মরেছে। কে জানতে যাচ্ছে কী হয়েছিল? এ তো শহর নয়, ডাক্তারবদ্যিও নেই, চিকিৎসাও হয় না। বিক্ষিপ্ত লোকালয়, ছোট ছোট গ্রাম, কোথাও দশ বিশ ঘর, কোথাও কিছু বেশি বাসিন্দে; এক গাঁয়ের খবর অন্য গাঁয়ে পৌঁছতে একটা বেলা কেটে যায়, এমন অবস্থায় ঠিকঠাক কিছু জানার উপায় নেই। বেচারি অজ্ঞমূৰ্থে কী বলছে সেটা কোনও কাজের কথা নয়। রোগটা মেলা থেকে ছড়াচ্ছে, রোগটা মহামারী হয়ে দেখা দিয়েছে–এসব অজ্ঞেই বলছে। তারা বলছে বলেই মেনে নিতে হবে!
মনোহর এমনভাবে মারা গেল যে কিছুই ধরা গেল না। হৈমন্তী স্তম্ভিত ও বিস্মিত হলেও কোনও কিছু স্থির করে নেয়নি। তারপর গেল বুড়ো তিলুয়া। তিলুয়ার সময়েও রোগ ধরা গেল না কিন্তু কয়েকটা প্রাথমিক লক্ষণ মনোহরের মতন দেখাল, যদিও তিলুয়া শেষাবধি নিউমোনিয়া হয়ে মরল। এবারও কিছু বুঝল না হৈমন্তী। নিজেকে বড় অসহায় মনে হল।
মেলায় অসুখ দেখা দিয়েছে এই গুজবটা তো কানে এসেছিল অন্ধ আশ্রমের কারও কারও, সে গুজবে কেউ কান দেয়নি। মনোহর মারা যাবার পর গুজবের হাওয়াটা আরও জোরে এসে লাগল। তিলুয়া বুড়ো মারা যাবার পর সকলেই ভয় পেয়েছিল। তারপর গিজা। অন্ধ আশ্রমে এখন একটা চাপা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সুরেশ্বরও বেশ বিচলিত, শিবনন্দনজিও। এই আতঙ্ক স্বাভাবিক : অন্ধ আশ্রমের মধ্যে দু দুটো লোক পনেরো বিশ দিনের মধ্যে হুট করে মারা গেল, আর-একটা বিছানায় পড়ে আছে–এ কি উদ্বেগ আতঙ্কের পক্ষে কম হল!
