হৈমন্তী সামনে এগিয়ে ঝুঁকে বলল, আলোর দিকে ফিরুন।
অবনী আলোর দিকে মুখ করল।
হৈমন্তী দেখল, তারপর আস্তে করে আঙুল তুলে দাগের পাশে গলার চামড়ার কাছে রাখল। অবনী ঠাণ্ডা অথচ কোমল আঙুলের স্পর্শ অনুভব করল।
কিছু কামড়েছে?
মনে করতে পারছি না।
ব্যথা আছে?
অবনী আঙুল তুলে ব্যথা অনুভব করতে গেল, হৈমন্তীর আঙুলের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে আঙুলটা থামল। না; তবে জ্বালা করে উঠল যেন।
হৈমন্তী হাত নামাল। দুপলক তাকিয়ে তাকিয়ে অবনীর চোখ মুখ দেখল। কিছু না হয়তো।
পোকা টোকা কামড়াতে পারে…
বোধহয়। ..লালচে দেখাচ্ছে। আমার কাছে ক্রিম আছে, লাগিয়ে নেবেন একটু।
অবনী হাসল। নেব।
হৈমন্তী সামনে থেকে সরে গিয়ে দরজার দিকে তাকাল, তাকিয়ে থাকল কয়েক দণ্ড, তারপর বলল, বেশ ফরসা হয়ে গেছে।
অবনী ঘুরে দাঁড়াল। বাইরের ফরসা দরজার চৌকাঠ পর্যন্ত এসে গেছে।
গুরুডিয়ায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সাড়ে নটা বাজল। লাট্ঠার মোড়ে এসে গাড়ি ঘুরিয়ে নেবার সময় অবনী জিজ্ঞেস করেছিল, কটা বাজল?
ঘড়ি দেখে সময় বললেন বিজলীবাবু, নটা পনেরো।
অফুরন্ত পৌষের রোদ, শিশির-শুকোনো মেঠো গন্ধ, শাল আর পলাশের চারা ঝাঁপটানো উত্তরের বাতাস, কয়েক মুঠো ফড়িং যেন সারাটা পথ পাশে পাশে ছুটে এল। দুহাত বিস্তার করে সেই মাঠ, ঘাট, শিশিরের সজীবতা নিয়ে গাড়িটা অন্ধ আশ্রমের মধ্যে এসে দাঁড়াল।
বিজলীবাবু নামলেন, অবনী নেমে দাঁড়াল। গগনও নেমেছে।
নামতে নামতে হৈমন্তীর চোখে পড়ল সামান্য দূরে একটা ভোলা গরুর গাড়ি ঘিরে ভিড়ের মতন হয়েছে। বিজলীবাবু, অবনী সেদিকে তাকিয়ে ছিল। গগন গাড়ির ভেতর থেকে তাদের হোন্ডঅল আর সুটকেস বের করে নিচ্ছিল।
গাড়ির শব্দে ভিড়ের অনেকেই এদিকে তাকাল। মালিনীকেও দেখা গেল। মালিনী হৈমন্তীকে দেখতে পেয়ে দ্রুত পায়ে আসছিল।
কাছে এসে মালিনী রুদ্ধশ্বাসে বলল, মনোহর ছুটি নিয়ে মেলায় গিয়েছিল না হেমদি, পরশু ফেরার কথা, ফেরেনি। কালও নয়। আজ এতক্ষণে ওকে কারা নিয়ে এসেছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। গা নাকি আগুনের মতন গরম।
কী হয়েছে?
জানি না। ওরা বলাবলি করছে, এই রোগে মেলায় খুব লোক মরছে, এখানে সব জায়গায়… মালিনী বিহ্বল, ভীত, বিচলিত, দাদা একটা ঘর খালি করাতে গেছে, ওকে রাখার জন্যে।
হৈমন্তী অবনীর দিকে তাকাল। অবনী এবং বিজলীবাবু চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। অবনী বলল, সেই এপিডেমিক না কি?
৬. পৌষ ফুরিয়ে মাঘ
২৬.
পৌষ ফুরিয়ে মাঘ এসে পড়েছিল। মধ্যে কদিন মেঘলা মেঘলা, অল্পস্বল্প বৃষ্টিও গিয়েছে, শীত চাপা পড়েছিল সামান্য; তারপর আবার আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ উঠলে মাঘের প্রখর শীত সব কিছু যেন কামড়ে ধরল। পৌষের শীতে কোথাও কিছু চঞ্চলতা ছিল, মাঘে সবই অচঞ্চল, পরিণত। উত্তরের বাতাসে আর তেমন এলোমেলো দমকা নেই, একটানা একই মুখে বইছে; গাছের পাতা ঝরতে শুরু হয়েছিল; রোদের তাতেও শীতের গুঁড়ো যেন জড়ানো; সকালে ঘাস ডোবানো শিশির, রাতে হিম আর কুয়াশা। সব যেন অবশ করে দিচ্ছিল।
গগন ফিরে গেছে; তার যাবার পর সপ্তাহ দুই কেটে গেল। যাবার সময় গগন কিছুটা উদ্বেগ নিয়ে গেছে। সে থাকতে থাকতেই মনোহর মারা গেল। মনোহরের কী হয়েছিল বোঝা যায়নি, ধরা যায়নি। সকলেই বলছিল মেলা থেকে আনা রোগ। আরও কয়েকটা মৃত্যুসংবাদের কথা কানে আসছিল। কেউ বলছিল চাপা বসন্ত, কেউ বলছিল প্লেগ। এর কোনওটাই ঠিক নয়। অসুখটা অদ্ভুত। যাবার আগে গগন হৈমন্তীকে বলেছিল, তোদের এখানে এ কী অসুখ-বিসুখ শুরু হল! সাবধানে থাকবি। আমরা খুব দুর্ভাবনায় থাকব। তেমন কিছু বুঝলে কলকাতায় চলে আসবি। এমনিতেও তো তোর আর এখানে থাকার কোনও মানে হয় না।
কলকাতায় ফেরার দিন গগন অবনীর সঙ্গে দেখা করতে অবনীর বাড়ি গিয়েছিল, সঙ্গে হৈমন্তী। অবনী তখন প্রায় শয্যাশায়ী; তার সেই গলা-ঘাড়ের কাছাকাছি লাল ছোট ছোট ফুস্কুড়িগুলো শেষ পর্যন্ত হার্পিস-এ দাঁড়িয়ে ছিল, পিঠ বেয়ে নেমে এসেছিল অনেকটা। হৈমন্তী অনেকটা এই রকম সন্দেহ করেছিল প্রথমে। যে কদিন গগন ছিল, স্টেশনে যেত আসত, অবনীর অসুখের খবরটা সেই নিয়ে আসে। হৈমন্তীও গেল একদিন, ওষুধপত্র লিখে দিয়ে এল। বাকিটা করছিল স্টেশনের কালা ডাক্তার।
গগন যাবার আগে অবনীকে বলে গিয়েছিল : দিদিকে একটু দেখবেন, যে রকম শুনছি তাতে তো ভয় করছে। অবস্থা খারাপ বুঝলে ওকে আর আশ্রমে থাকতে দেবেন না, সোজা কলকাতায় পাঠিয়ে দেবেন। ও বড় জেদি। আর হঠাৎ তেমন কিছু দেখলে অন্তত এখানে নিয়ে আসবেন। হৈমন্তী গগনের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল; সবই শুনল, কিছু বলল না।
গগন যাবার পর পরই অন্ধ আশ্রমের বুড়ো তিলুয়া অসুখে পড়ল। অনেকটা একই ধরনের অসুখ বলে মনে হচ্ছিল। মনোহর জোয়ান গোছের বলে এই অদ্ভুত ব্যাধির সঙ্গে কদিন লড়েছিল, তিলুয়া পারল না, তার বয়েস হয়েছিল, প্রথম ধাক্কাতেই শরীরের কলকবজা বিগড়ে জটিলতা সৃষ্টি হল, মারা গেল নিউমোনিয়া হয়ে।
আপাতত আর-একজন বিছানায় পড়ে আছে–সে যাবে না থাকবে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। এসব চিকিৎসা হৈমন্তীর করার কথা নয়, সে চোখের ডাক্তার, তবু বাধ্য হয়ে তাকে এই অদ্ভুত রোগের চিকিৎসাও করতে হচ্ছে; যথাসাধ্য করছে বটে কিন্তু বুঝতে পারছে না, ভাল করছে না মন্দ করছে। চোখের ছোট্ট একটা হাসপাতাল, সাধারণ চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রায় নেই, ওষুধপত্রও না। তবু চিকিৎসা।
