হৈমন্তী বলল, মেয়েকে আপনি ছাড়তে পারেন না।
অবনীর কেমন অদ্ভুত এক দুঃখ হল। যাকে সে ধরে রাখেনি, তাকে ছাড়ার কথা ওঠে না। তবু, মেয়েকে ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা অন্যরকম। অস্বীকার কি? অবনীর পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।
হৈমন্তী বলল, আপনি বলছিলেন, আপনার মধ্যে কিছু নেই, শুকিয়ে গেছে–পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে…
তাই মনে হত।
এখনও মনে হয়? হৈমন্তী যেন স্নিগ্ধ সুন্দর করে হেসে বলল।
অবনী চুপ করে থাকল। মুখ নিচু করে কিছু ভাবছিল। তারপর যখন চোখ তুলল–হৈমন্তীকে আর দেখতে পেল না।
শুন্য দৃষ্টিতে অবনী কিছু সময় বসে থাকল। কল্পনায় হৈমন্তী এসেছিল। চলে গেছে। অথচ অবনীর মনে হচ্ছিল, এই আসা-যাওয়ার মধ্যে হৈমন্তী হঠাৎ যেন তার বুকের পুরনো বেদনার জায়গায় পরম সহানুভূতিতে হাত বুলিয়ে গেছে।
কুয়ার মধ্যে মুখ ঝুঁকিয়ে দেখার মতন অবনী তার হৃদয়কে দেখার চেষ্টা করছিল। একসময় তার মনে হয়েছিল প্রখর তাপে, অসহ দাহে যেমন করে কুয়ার জল শুকিয়ে যায় এবং অভ্যন্তরে, গভীরে জলস্তরও শুকিয়ে আসে–সেই রকম তার সমস্ত হৃদয় আদ্রতাহীন ও শুষ্ক হয়ে গিয়েছিল। কোথাও কোনও রকম আর্দ্রতা ছিল না। অথচ এখন মনে হচ্ছে, কেমন করে যেন তার শুষ্ক ক্লান্ত হৃদয়ে কিছু আর্দ্রতা সৃষ্টি হয়েছে। হয়তো এই আর্দ্রতার সম্ভাবনা কিছু ছিল, অবনী খেয়াল করেনি। সম্ভবত এখন সেই আর্দ্রতা জলবিন্দুর মতন চুঁইয়ে চুঁইয়ে ক্রমে ক্রমে কিছুটা সঞ্চিত হয়েছে। হয়তো তার পক্ষে এখন এই সজীবতা অনুভব করা সম্ভব হচ্ছে।
কোনও আশ্চর্য সান্ত্বনার মতন, সুখের মতন অবনী প্রসন্ন বোধ করছিল।
দরজা খুলে বাইরে এল অবনী। সবেমাত্র বুঝি প্রত্যুষ হয়েছে। চারদিকে কুয়াশা, কুয়াশা এবং হিমের স্তরে স্তরে ভোরের সাদাটে আলো জমছে, কনকন করছে ঠাণ্ডা, এখনও বড় বেশি কিছু চোখে পড়ছে না, কুয়াশা এবং অস্পষ্টতায় ঢেকে আছে।
শীতে আড়ষ্ট হয়ে কাঁপতে কাঁপতে অবনী কয়েক পা এগিয়ে গগনদের ঘরের দিকে এল। দরজা জানালা বন্ধ। গগনরা এখনও ঘুমোচ্ছে। অবশ্য ঘণ্টাখানেক সময় আছে। তারপর ফিরতে হবে। রোদ ওঠার সময় সময় অবনী বেরুতে চায়।
ঘরের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকার সময় অবনীর চোখে পড়ল দরজার তলা দিয়ে আলো আসছে। গগনরা কি উঠে পড়েছে? নাকি আলো জ্বেলে রেখেই শুয়েছিল? বা এমনও হতে পারে, এই মুহূর্তে কেউ জেগে উঠেছে। অবনী অপেক্ষা করল। চারপাশ এত হিম হয়ে আছে যে অবনী কেঁপে উঠল আবার। গগনদের ঘরের বাতি নিবছে না। তবে কি ওরা জেগে উঠেছে? কে জানে, হয়তো এভাবে নতুন জায়গায় ওদের ঘুম হয়নি, গগনের বা হৈমন্তীর।
ঘরের মধ্যে থেকে কোনও সাড়া শব্দ আসছিল না। অবনীর মনে হল না, দুজনেই জেগে আছে।
দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল অবনী, ইতস্তত করে আঙুলের টোকা দিল দরজায়। কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। শীতের দাপটে আঙুল এত ঠাণ্ডা হয়েছিল যে, জোরে টোকা দেওয়া যাচ্ছিল না। এবার অবনী মুঠো করে দরজায় শব্দ করল।
কে? ভেতর থেকে হৈমন্তীর গলা শোনা গেল।
আমি।
হৈমন্তী দরজার ছিটকিনি নামাল, শব্দ পেল অবনী।
দরজা খুলে দিল হৈমন্তী। গরম চাদরে তার মাথা গলা বুক জড়ানো।
বাতি জ্বলছে দেখে ডাকলাম, অবনী বলল, সকাল হয়ে গেছে। বলে হৈমন্তীর ভোরবেলার বাসি মুখের দিকে তাকাল। সকালের এই মুখে রাত্রের, বালিশের, চুলের, ঘুমের, হয়তো বা জাগরণের কেমন এক অদ্ভুত স্বাদ মাখানো আছে।
হ্যাঁ, আমি জেগে ছিলাম। ঘড়ি দেখেছি।
ঘুমোননি? ঘুম হয়নি? অবনী বলল। বলার সময় নজরে পড়ল তার কথার সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে।
ওই এক রকম। …খুব ঠাণ্ডা, ভেতরে আসুন।
চৌকাঠের কাছ থেকে অবনী ভেতরে পা দিল। গগনবাবু খুব ঘুমোচ্ছন। … আপনার কি নতুন জায়গায় ঘুম হয় না?
খানিকটা। অস্বস্তি হচ্ছিল। ঠাণ্ডাও খুব।
সারারাত জেগে?
না, মাঝে মাঝে ঘুমিয়েছি।
তবে তো কষ্টই হল।
না, কষ্ট কীসের?
আমারও ভাল ঘুম হয়নি; অনেকক্ষণ থেকে জেগে আছি। অবনী হৈমন্তীর চোখের দিকে তাকাল। মনে হল যেন সে বোঝবার চেষ্টা করছে হৈমন্তীর ভাল ঘুম না হবার বা জেগে থাকার অন্য কোনও কারণ আছে কিনা।
বিছানার খানিকটা পরিষ্কার করে হৈমন্তী যেন বসার মতন ব্যবস্থা করল। বলল, আমরা বেরুব?
ছটা সাড়ে ছটার মধ্যে।
হৈমন্তী হাতে ঘড়ি পরে নিয়েছিল, সময় দেখল। সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে।
চুপচাপ। গগন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শব্দ করল।
বাইরে এখন খুব ঠাণ্ডা, না হয় এখানের সকালটা দেখতাম– হৈমন্তী বলল, বসবেন না?
এখন বসে আর লাভ নেই, যাবার আয়োজন করতে হবে।
বিজলীবাবু উঠেছেন?
না। …ওঁকে ওঠাতে সময় লাগবে বোধহয়– অবনী হাসল।
হৈমন্তী হাসল। গগনও ভীষণ কুঁড়ে, শীতকালে ওকে বিছানা থেকে ওঠানো যায় না।
অবনী ফাঁকা চেয়ার এবং হৈমন্তীর বিছানার দিকে তাকাল। তারা দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে, ঘরের মধ্যে আলো জ্বলছে, বাইরে সকাল হচ্ছে বোঝা যায় না, এখানে রাত্রের মতন সব। অবনী বলল, কাল একটা মজার স্বপ্ন দেখলাম, বলে হাসল, সুরেশ্বরবাবু…
কথাটা শোনার আগেই হৈমন্তী বাধা দিয়ে বলল, আপনার গলার কাছে ওটা কী হয়েছে?
গলার কাছে হাত দিল অবনী।
ওখানে নয়, আরও ওপাশে ঘাড়ের দিকে।
কী জানি। … অবনী অন্য জায়গায় হাত রাখল।
