বিছানার ওপর উঠে বসে সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিয়ে নিবিয়ে ফেলল অবনী। বসে থাকল কয়েক দণ্ড। অন্ধকারে তার মনে হল, খুব কাছাকাছি প্রায় মুখের সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। এমনকী এখন তার মনে হল, হাত বাড়ালে সামনের মানুষটিকে সে স্পর্শ করতে পারে। কী কারণে অকস্মাৎ তার বুকে উত্তেজনার তাপ সঞ্চারিত হল, মুহূর্তের জন্যে ভীত এবং সঙ্গে সঙ্গে আবেগবশে অস্থির হয়ে ওঠায় হৃদপিণ্ড দ্রুত হয়ে উঠল। সেই অন্ধকারে অবনী হৈমন্তীর উপস্থিতি অনুভব করল।
অবনীর কেমন সন্দেহ হল। সন্দেহ হল, সে হৈমন্তীর স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছিল। সুরেশ্বরের সেই অদ্ভুত উড়ন্ত অবস্থাটি দেখার পর, হয় সেই বিক্ষিপ্ত স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে, অথবা আলাদা ভাবে হৈমন্তীকে দেখেছিল। যেমন করে চোখ বন্ধ করে ভুরুতে আঙুল রেখে অবনী কোনও প্রয়োজনীয় চিন্তা করে সেইভাবে চোখ বুজে হাতের আঙুলে ভুরু টিপে সে স্বপ্নের দৃশ্যটি মনে করবার চেষ্টা করল।
আশ্চর্য, কিছুই মনে আসছে না। কিছুই নয়। যেন অবনী অন্ধ, অন্ধতাহেতু সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে।
অবনী এতক্ষণে তার ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার কারণটা যেন ধরতে পারল। এরকম হয়, চোখের সামনে অনেক জিনিসের মধ্যে ছিল বলে বোঝা যায়নি যে কিছু হারিয়ে গেছে;হঠাৎ চোখে পড়ল, বা খেয়াল হল, ওটা হারিয়ে গেছে। হৈমন্তীকে অবনী স্বপ্নে দেখেছিল কি না অথবা স্বপ্নে হৈমন্তী তাকে ডেকেছিল কি না–অবনী মনে করতে পারল না; কিন্তু নিঃসন্দেহে অনুভব করল তার সমস্ত অস্থিরতার মধ্যে হৈমন্তী রয়েছে। এই যে ঘুম ভেঙে গেছে, এই যে সে এক টুকরো স্বপ্নে সুরেশ্বরকে গা-হাত-পা এলিয়ে বাতাসে ভাসতে দেখেছে, ললিতার কথা এবং তার বুকের ভাঙা হাড়ের বেদনার কথাও তার মনে আসছে–এ-সবই হৈমন্তীর জন্যে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার নানারকম অদ্ভুত চিন্তা, এক একবার এক এক রকম মনে হওয়া, ঘুম না আসা, অস্থিরতা বোধ সমস্ত কিছুর পিছনেই হৈমন্তী।
হারানো জিনিসটা খুঁজে পেলে যেরকম স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা যায়, অবনী অনেকটা সেই রকম নিশ্বাস ফেলল স্বস্তির। তার উত্তেজনা, অস্থিরতা কমে এল। প্রায় শান্ত স্থির হয়ে বসে থাকল কিছু সময়।
বসে থাকতে থাকতে অবনী মনে মনে হৈমন্তীকে সামনে বসিয়ে রেখে একটা কাল্পনিক কথোপকথন তৈরি করছিল :
আপনি তা হলে ফিরে যাবেন? অবনী বলছিল।
যার।
সুরেশ্বর বোধহয় খুব আশা ভরসা করে এনেছিল।
অন্য কাউকে আনবে।
ডাক্তার…
হ্যাঁ…
আপনাকে ঠিক সেভাবে বোধহয় সুরেশ্বর আনেনি।
কী জানি। নিজের স্বার্থে এনেছিল।
আমার প্রথম প্রথম নানারকম কৌতূহল ছিল; পরে দেখলাম–আপনি ওকে ভালবেসেই এসেছিলেন। …আপনাদের অনেক দিনের পরিচয়…
অনেক দিনের।
ভালবাসা?
হৈমন্তী জবাব দিল না।
অবনী বোধহয় বুঝতে পারল। বলল, সুরেশ্বরকে আমি আকাশে উড়তে দেখলাম। স্বপ্নে। আপনি সার্কাসে ট্রাপিজ খেলা দেখেছেন? ট্রাপিজ খেলোয়াড়রা যেভাবে হাত তুলে পা সোজা করে ঝাঁপ দেয়, অনেকটা সেইরকম ভঙ্গিতে সুরেশ-মহারাজ আকাশ দিয়ে উড়ছে। …বেশ মজার স্বপ্ন।
হৈমন্তী জবাব দিল না; কিন্তু মনে হল সে বর্ণনাটা উপভোগ করল।
অবনী হাসল; হাসতে হাসতে হঠাৎ সে কেমন আক্রোশ অনুভব করল সুরেশ্বরের ওপর। বলল, একটা উড়ন্ত মানুষকে ধরবার জন্যে ছোটাছুটি করাটা ছেলেমানুষি, নিছক খেলা। …আমার ধারণা, এ রকম খেলা কোনও কাজের নয়।
আমি আর খেলছি না।
ফিরে যাচ্ছেন।
হ্যাঁ।
অবনী একটু ভাবল। আর থাকতে পারেন না?
না; কী হবে থেকে।
সুরেশ্বরের অন্ধ আশ্রমে থাকার কথা বলছি না। …অন্য কোথাও।
হৈমন্তী চোখ তুলে তাকাল। তাকিয়ে থাকল। তার দুই চোখ বড় হল, টলটল করে উঠল, ঘনান্ধকার চোখের মধ্যে অতি দূরে বিজলী ঝলকের মতন চোখের তারায় চকিতের জন্যে আলো ফুটল।
অবনী বলল, আপনাকে আমার ভাল লাগে।
জানি, হৈমন্তী অস্ফুটস্বরে জবাব দিল।
অবনী চঞ্চল হল, অস্থিরতা বোধ করল। তা হলে যাবেন না।
হৈমন্তী যেন ভাবল সামান্য, কী যেন বলল, এত ধীরে এবং জড়ানো গলায় যে অবনী শুনতে পেল না। তার মনে হল, হৈমন্তী বলল : আপনার কি মনে হয়, আমি থাকতে পারি?
অবনী সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলতে যাচ্ছিল, হ্যাঁ–পারেন; কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারল না, কী যেন বাধা এল, কথাটা জিবের ওপর থেমে থাকল।
হৈমন্তী তার দিকে অপলকে চেয়ে আছে। অবনী বিব্রত বোধ করছিল। যে বাধা তার মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে শক্ত হয়ে পড়ে আছে সেই বাধা সরাবার জন্যে সে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করল : যেন ঝটকা মেরে এই কুৎসিত হাতটা সরিয়ে দিতে চাইল। পারল না। না পেরে অসম্ভব ক্রোধে এবং ঘৃণায় ললিতা ও কুমকুমের দিকে তাকাল। ওরা দুজন যেন কখন নিঃশব্দে, অবনীর অজ্ঞাতে কাছে এসে গেছে।
অবনী চুপ; হৈমন্তী অপেক্ষা করছে। এতটা বিলম্ব যেন তার প্রত্যাশিত নয়।
আমি জোচ্চোর, প্রবঞ্চক বা শঠ হতে পারি না, অবনী অস্থিরভাবে মাথা নাড়ল, ঠকানো মুশকিল। শেষ পর্যন্ত অবনী বলল, আমার স্ত্রী ছিল, মেয়ে আছে। স্ত্রীর সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। ডিভোর্স চেয়ে নেব।
মেয়ে!
কুমকুম। …কুমকুমকে.অবনী ব্যাকুল চোখে হৈমন্তীর দিকে তাকাল। যেন বলতে চাইল, কুমকুম। বাচ্চা, সে কলকাতায় তার মার কাছে আছে, অযত্নে, নানা অভাব-অসুবিধের মধ্যে, তার মা তাকে নষ্ট করে ফেলছে, কুমকুম দেখতে বড় সুন্দর : ছিপছিপে, ফরসা, তার গলার স্বর খুব মিষ্টি; কাছে রাখলে যত্ন করলে, ভাল শিক্ষা দিলে… পাগলের মতন এবং ভীষণ অস্থিরতার মধ্যে অবনী এইসব ভাবতে ভাবতে বা বলার জন্যে ব্যাকুল হয়েও শেষ পর্যন্ত কিছু বলতে পারল না।
