সিগারেটের টুকরোটা আঙুল থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল, পোড়া সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ নাকে লাগতে অবনী উঠব কী উঠব না করে শেষ পর্যন্ত উঠল। অন্ধকারে লাইটার জ্বেলে আলোর সুইচ দেখল, আলো জ্বালল। পোড়া সিগারেটের টুকরোটা নিবিয়ে বাথরুমে গেল।
ফেরার পথে অবনী ঘড়ি দেখল, সাড়ে চার। তার অনুমান ভুল হয়েছিল তবে। প্রায় ভোর হয়ে আসছে। আর সামান্য পরেই সকাল। আপাতত কী করা যায় অবনী বুঝতে পারল না। তার ঘুম আসবে আর, চুপচাপ বিছানায় শুয়ে সময় কাটানো ছাড়া উপায় নেই। বাতিটা অকারণে ঘরের মধ্যে জ্বালিয়ে রাখতেও তার ইচ্ছে হল না।
শুকনো কাশি কাশল বার কয়েক, পুলওভারটা টেনে নিয়ে গায়ে দিল, ঠাণ্ডা লাগছিল। বাতি নিবিয়ে আবার বিছানায় এল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে অবনী যেন অস্পষ্ট ভাবে অনুভব করল, যে অস্বস্তিবশে সে জেগে উঠেছে সেই অস্বস্তি তার বুকের কোথাও এতক্ষণ লুকিয়ে ছিল, এখন আবার দেখা দিতে শুরু করেছে। ঠাণ্ডা লাগার বেদনার মতন একটি বেদনা অবনী অনুভব করছে। এই বেদনা সম্পূর্ণ শারীরিক হতে পারে, হয়তো রাত্রের দিকে ঠাণ্ডা লেগেছে। বা এই বেদনা শারীরিক নাও হতে পারে, কিছু বোঝা যায় না।
বুকে হাত রেখে অবনী বেদনা অনুভব করল। কখন ঠাণ্ডা লেগেছে, কী ভাবে লেগেছে সে অনুমান করার চেষ্টা করল, পারল না। অগত্যা নিজের বেদনার ওপর সেঁক দেবার মতন গরম হাতটি রাখল, আস্তে আস্তে হাত ঘষল। হাত ঘষার সময় তার বুকের পাঁজরার একটি ভাঙা হাড়ের ওপর বুড়ো আঙুল রেখে স্থির হয়ে থাকল।
তার বুকের পাঁজরার একটি হাড় ভাঙা, কবে ভেঙেছিল মনে নেই, নিশ্চয় খুব ছেলেবেলায়, যখন তার তেমন কোনও জ্ঞান জন্মায়নি, পরে ভাঙলে তার মনে থাকত। হাড়ের জোড়টায় কিছু খুঁত তখন থেকেই থেকে গেছে, জোড়ের জায়গাটা সামান্য উঁচু, আঙুল দিলে বোঝা যায়। অসতর্কভাবে হাত পড়ে গেলে কিংবা জোরে কিছু লাগলে ব্যথা লাগে। না, ঠিক, ব্যথা নয়, বেদনার মতন। হয়তো বাস্তবিকই ওখানে কোনও ব্যথা নেই, তবু কোনও কারণে ছেলেবেলা থেকেই মানসিক একটা বেদনার ভাব ওখানে জমে উঠেছে। একবার, অবনীর মনে পড়ল, ললিতা বিছানার মধ্যে খেলাচ্ছলে তার বুকের ওপর মাথা রেখে গড়াগড়ি করছিল, হঠাৎ সে মাথা তুলে আবার যখন মাথা রাখতে গেল অবনী তীব্র বেদনা বোধ করেছিল। ললিতাকে বলেছিল, এই জায়গাটা বাঁচিয়ে ললিতা আঙুল বুলিয়ে জায়গাটা দেখেছিল; সে পরে অনেকবার ওখানে আচমকা ধাক্কা মেরেছে, হাতের বালা দিয়ে আঘাত করেছে, এমনকী প্রাণপণে হাতের মুঠো ছুঁড়েছে যাতে অবনী ভীষণ কোনও ব্যথা পায়। আশ্চর্য, অবনী যা লুকিয়ে-চুরিয়ে বাঁচাতে চাইত, যে-আঘাত সে ভয় করত, ললিতা তা বাঁচাতে দিত না। ললিতার কাছে অবনীর এই দুর্বলতা কেন যে সুখকর আনন্দ ছিল অবনী বুঝতে পারত না। তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জন্য অবনীর ভয় বা ক্লেশ ছিল না, ললিতা হিংস্রভাবে সেই সব অঙ্গপ্রতঙ্গ দংশন করলেও অবনী অনায়াসে সহ্য করতে পারত।
ললিতার কথায় এবং বুকের বেদনার বিচ্ছিন্ন চিন্তার মধ্যে অবনীর হঠাৎ মনে হল, সে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে; জলের মধ্যে ডুবে সাঁতার কেটে খেলা দেখাবার সময় শরীর যেমন নির্ভার হয় এবং হাত পা গা শিথিল হয়ে ভাসে। অল্পক্ষণ এই রকম মনে হলেও অবনী আবার স্বাভাবিক অনুভবের মধ্যে ফিরে এল। নিজের এই রকম শিথিল নির্ভার অনুভূতি তাকে সুরেশ্বরের কথা মনে করাল। সুরেশ্বরের মতন সেও কী উড়ন্ত কাগজের মতন ভাসবে? অবনী হাসল, মৃদু হাসি।
অথচ, আরও কয়েক দণ্ড পরে, অবনী পুনরায় অনুভব করল তার জাগ্রত ও শায়িত অবস্থার মধ্যেও সে ভেঙে যাচ্ছে, বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। নিজের ভিন্ন দুই অস্তিত্ব অনুভব করার সময় আয়নার সামনে মুখোমুখি দাঁড়ানোর কথা ভাবা চলে। অবনী তেমন কিছু ভাবল না, বরং তার মনে হল, কী যেন তার শরীরের তলা থেকে উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। ছেলেবেলায় অবনী তার মার একটা ছবি দেখত : মা অবশ বিহ্বলা যুবতী হয়ে পালঙ্কে শুয়ে আছে, আর মার মাথা, পা ও পিঠের দিক থেকে কটি বৃহৎ ধূপদানের ধোঁয়া মাকে যেন জড়িয়ে ধরছে। ছবিটা মার থিয়েটারের, রংচঙে, ফ্রেমে বাঁধানো ছিল। ওই ছবি সম্পর্কে মার দুর্বলতা ছিল, কেননা ওইনাটকে মা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং সোনার মেডেল পেয়েছিল। অবনীর বারবারই মনে হত, ছবিটা শ্মশানঘাটে চাপানো চিতার মতন। সতীদাহের কোনও জমকালো দৃশ্য।
অবনী এসময় আবার একটা সিগারেট ধরাল। হয়তো কিছুই নয়, তবু লাইটারের আলো, ঠোঁটের সিগারেট এবং ধোঁয়ার ঘ্রাণ থেকে এই মুহূর্তে নিজের জীবন্ত অস্তিত্বটা পরখ করে নেওয়া হল। চুপচাপ, আস্তে আস্তে সিগারেট খেতে লাগল অবনী। আপাতত তার আর কিছু মনে হচ্ছিল না।
কিছুক্ষণ মানসিক স্থিরতার মধ্যে কাটল। এলোমেলো বিশৃঙ্খল চিন্তা বুদ্বুদের মতন উঠছিল, কিন্তু অবনী তাতে মনোযোগ দিচ্ছিল না। ক্রমশ সিগারেট শেষ হল। সিগারেটটা ফেলে দেবার আগে আর-এক মুখ ধোঁয়া নেবার সময় সহসা সে অনুভব করল, কী যেন এবং কিছু যেন তার মধ্যে থেকে বাইরে আসার জন্যে ছটফট করছে, চাপা এবং অনির্দিষ্ট এক ব্যাকুলতা এতক্ষণে তীব্র হয়ে আসছে। ফলে গলা এবং বুকের কাছে শ্বাস থেমে গিয়ে কেমন কষ্ট হচ্ছে। অবনী সিগারেটের ধোঁয়া গিলে নিল। তার বুকের পুরনো ভাঙা হাড়ের জায়গাটা কনকন করে উঠল।
