হৈমন্তী অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল না, কিন্তু বুকপিঠের ওঠানামা লক্ষ করা গেল।
সামান্য পরে হৈমন্তী হঠাৎ বলল, চলুন, বাইরেটা দেখে আসি।
.
স্বপ্নের মধ্যে দেখা বুঝি; অস্পষ্ট কোমল কেমন এক আচ্ছন্নতার জগৎ যেন স্থির হয়ে আছে। হিম-জ্যোৎস্নায় জড়ানো চরাচর, ব্যাপ্ত শূন্যতার মধ্যে কোনও স্তব্ধ শান্ত বিশাল এক হ্রদ যেন পড়ে আছে, নীচে, দূরে রেখার মতন পার্বত্য অঞ্চল, স্যুইস গেটের পদতলে বিষণ্ণ এক নদী। হৈমন্তী শূন্য দৃষ্টিতে দেখছিল, তার চেতনার কোথাও বুঝি কিছু ছিল যার অদ্ভুত এক অনুভূতি তাকে নির্বাক, পরম দুঃখী, বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ করে তুলেছিল। বাঁধের জলের দিকে চোখ রেখে হৈমন্তী দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল, শীত আবার তাকে শিহরিত করল।
অবনী বলল, ঘরে যাবেন?
হৈমন্তী নীরব। তার মাথায় ঘোমটার মতন শাল জড়ানো, শালের পাড়ের একটা পাতা কপালের কাছে শুকনো পাতার মতন কালচে দেখাচ্ছিল।
চলুন যাই– হৈমন্তী বলল, কেমন যেন লাগে দেখতে—
থাকবেন আর খানিকটা?
না। আমার বেশি ঠাণ্ডা লাগানো উচিত হবে না– হৈমন্তী ফেরার জন্যে পা বাড়াল। ফিরতে ফিরতে বলল, আজ এসে ভালই করেছি। না এলে কত কিছু দেখতে পেতাম না।
অবনীর মনে হল, হৈমন্তী কত কিছু কথাটা যেন কেমন করে বলল।
.
মাঝ এবং শেষরাতের কোনও সময়ে অবনীর ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল, কে যেন তাকে ডাকছে। নেশায় সে কিছু শুনছে কি শুনছে না, অথবা ঘুমের ঘোরে শুনছে, বুঝল না। ঘর অন্ধকার। বিজলীবাবু অঘোরে ঘুমোচ্ছেন, তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
অবনী বালিশ থেকে সামান্য মাথা তুলে শোনবার চেষ্টা করল, কে তাকে ডাকছে।
.
২৫.
গভীর স্তব্ধতার মধ্যে অবনী কিছুক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করল; কোনও সাড়া শব্দ নেই, কেউ তাকে ডাকছে না। মনে হল, সে ঘুমের মধ্যে জেগে উঠেছে, জেগে ওঠার সময় মনে হয়েছিল কেউ ডাকছে; বা স্বপ্নের মধ্যে সে কাউকে ডাকতে শুনেছিল। অথচ কোনও স্বপ্ন অবনীর মনে পড়ল না। সহসা ডাক শুনে ঘুমের মধ্যে জেগে ওঠায় সে সামান্য চঞ্চল ও বিস্মিত হয়েছিল; ভ্রম দূর হলে নিশ্বাস ফেলল।
বালিশে মাথা রেখে চোখের পাতা বুজে অবনী আবার ঘুমোবার চেষ্টা করল। অন্ধকারে কয়েকটা মাছির মতন তার চোখের পাতার তলায়, চেতনায় কী যেন উড়ছিল; তারপর মনে হল, মাছিগুলো উড়ে গেলে সরষের দানার মতন কী যেন বা এক মুঠো তিল তার চোখ, নাক এবং কপালের মাঝখানে ভুরুর কাছাকাছি কেউ ছুঁড়ে দিল। অবনী অস্বস্তি বোধ করল। কিছু না, তবু এই মাছি বা দানার মতন কোনও কিছুর অনুভূতি চোখের ওপর ভুরুর কাছে অনুভব করা অস্বস্তিকর। অবনী চোখ খুলল।
চোখ চেয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে শুয়ে থাকল। মনে করবার চেষ্টা করল, কোনও স্বপ্ন দেখেছিল কি না। কোনও স্বপ্নের কথা তার মনে পড়ল না; এইমাত্র মনে পড়ল যে–ঘুমের মধ্যে কোনও এক সময়ে সে সুরেশ্বরকে দেখেছিল। সুরেশ্বর নির্জন কোন পথ দিয়ে যেন হনহন করে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ মাটি থেকে ওপরে উঠে হাত পা এলিয়ে মাথা উঁচু পা নিচু করে বাতাসে ভেসে যাওয়া মস্ত একটা খোলা খবরের কাগজের মতন ভেসে যেতে লাগল। হাড়গোড়বিহীন রক্তমাংসশূন্য সেই অদ্ভুত মানুষটিকে দেখে অবনী প্রথমে ভীষণ অবাক হল, পরে মশাই মশাই বলে ডাকল। পরের আর কিছু অবনীর মনে পড়ল না! .. সুরেশ্বর তাকে উড়ন্ত অবস্থায় ডেকেছিল বা দেখেছিল বলেও অবনীর মনে হল না।
গায়ের র্যাগ গলার ওপর চিবুক পর্যন্ত তুলে নিল অবনী। ঘরের বাতাস শীতে যেন জমে শক্ত হয়ে আছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। বিজলীবাবু জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন, তাঁর নাক বন্ধ হয়ে গেছে। হুইস্কির গন্ধ ঘরে আছে কি না অবনী বুঝতে পারল না।
কখনও চোখ বন্ধ করে, কখনও চোখ চেয়ে অবনী শুয়ে থাকল, অপেক্ষা করল, ঘুম এল না। শেষে একটা সিগারেট ধরাল। ধীরে ধীরে, গলা ভরতি করে কয়েক টান ধোঁয়া নিল, খেল, হাই তুলল একবার, তারপর পাশ ফিরে শুয়ে থাকল। হাতের আঙুলে সিগারেট জ্বলছে।
ঠিক কেন যে ঘুম ভেঙে গেল অবনী বুঝতে পারল না, কিন্তু তার মনে হল, ঘুম আর আসবে না। তন্দ্রাচ্ছন্ন অথবা আলস্যের কোনও ভাব নেই, তার চোখ বুজে আসছে না, এমনকী সে ক্লান্তি অনুভবও করছে না। অথচ কী যেন তাকে স্থির হতে দিচ্ছিল না, অব্যবস্থচিত্তের মতন সে অস্বস্তি বোধ করছে।
এখন কত রাত হতে পারে অবনী অনুমান করার চেষ্টা করল। তিনের কম নয়, অবনী অন্যমনস্কভাবে হিসেব করল, তাদের শুতে শুতে বারোটা বেজে গিয়েছিল প্রায়, ঘণ্টা তিনেক সে নিশ্চয় ঘুমিয়েছে, হুইস্কির পর আরও ভাল ঘুম হওয়া উচিত ছিল। এখন সে প্রায় কিছুই অনুভব করছে না।
শুকনো গলায় আচমকা এক মুখ সিগারেটের ধোঁয়া টেনে ঢোঁক গিলতে গিয়ে কণ্ঠনালী জ্বালা করল; কাশি এল। অবনী কাশল। নিঃশব্দ অসাড় ঘরে নিজের কাশি কানে শুনে হঠাৎ মনে হল, সে অন্য কারও গলার শব্দ পাচ্ছে। মুহূর্ত কয়েকের জন্যে এরকম মনে হলেও অবনী বিশেষ কিছু ভাবল না, আবার চোখের পাতা বন্ধ করে শুয়ে থাকার চেষ্টা করল।
সুরেশ্বর একটা ছড়ানো মস্ত কাগজের মতন বাতাসে ভেসে যাচ্ছে–এই দৃশ্যটা আবার তার মনে এল! এবং তার পরই হৈমন্তীর কথা। হৈমন্তী নির্বোধ। অবনীর মনে হল, কলকাতা থেকে ছুটতে ছুটতে হৈমন্তী একটা উড়ন্ত কাগজ লুটতে এসেছিল, ঠিক যেভাবে কিছু বাচ্চাটাচ্চা কাটা ঘুড়ির পেছনে পেছনে ঘুড়ি লুটতে ছোটে, আর শেষ পর্যন্ত অনেকটা দৌড়োদৗড়ি করে হাঁপিয়ে ঘুড়ি ধরতে না পেরে ফিরে আসে। হৈমন্তীর জন্যে দুঃখ ও সহানুভূতি বোধ করল অবনী।
