অবনী বিজলীবাবুর চোখের দিকে দু মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল, তারপর বলল, সব খেলাই মজার। …যান, গরম জল ঠাণ্ডা হয়ে যাবে, ঘুরে এসে বসুন।
বিজলীবাবু আর কিছু বললেন না, বাথরুমে চলে গেলেন।
অবনী অন্যমনস্কভাবে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকল।
হৈমন্তীর ঘরে বসে গল্পগুজব হচ্ছিল। ঘরে আগুন রেখে গেছে বেয়ারা, জানলা বন্ধ, দরজাও ভেজানো; বাইরে শীতের প্রচণ্ডতা এখন আর অনুভব করা যাচ্ছিল না। গগন খানিকটা গল্পগুজব করার পর বিজলীবাবুর গান শুনতে উঠে গেল। আসলে গগন বিজলীবাবুর সঙ্গে খানিকটা রঙ্গরসিকতা করতে চায়। তা ছাড়া, সে আপাদমস্তক আবৃত হয়েছে, উদ্দেশ্য : বিজলীবাবুকে টেনে নিয়ে পশ্চিমের ঢাকা বারান্দায় গিয়ে জ্যোৎস্নালোকে বাঁধের জল দেখবে।
.
অবনী আর হৈমন্তী মুখোমুখি বসে, হৈমন্তী বিছানায়, অবনী কাছাকাছি চেয়ারে।
অবনী বলল, আপনিও একবার বাইরে গিয়ে দেখলে পারতেন। এতটা উঁচু থেকে সামনের লেকটা দেখতে এখন ভালই লাগত। চাঁদের আলোয় অতটা জল, আশেপাশে পাহাড় জঙ্গল, অদ্ভুত দেখায়।
দেখব হৈমন্তী বলল, এখন উঠতে ইচ্ছে করছে না, কুঁড়েমি ধরে গেছে ঠাণ্ডায়।
আপনারা দুই ভাইবোনেই ঠাণ্ডায় বেশ কাবু হয়ে পড়েন, অবনী হাসিমুখে বলল।
অভ্যেস নেই। গগনের তো একেবারেই নেই, আমি তবু খানিকটা সইয়ে নেবার সময় পেয়েছি। হৈমন্তীও হাসিমুখে জবাব দিল।
তবু সইছে না– অবনী ঠাট্টা করে বলল।
না। হৈমন্তী মাথা নেড়ে হেসে উঠল।
অবনী চোখ সরাল না, হৈমন্তীর হাসি দেখতে লাগল। তারপর হঠাৎ বলল, আপনি যদি কিছু মনে না করেন তবে একটা কথা বলি–
হৈমন্তী তাকিয়ে থাকল, মুখের হাসি তখনও মুছে যায়নি।
অবনী বলল, আমার আজকাল মনে হয়, এই জায়গাটা আপনার কোনও দিক থেকেই সইছে না।
হৈমন্তীর মুখের হাসি মুছে গেল; ভীরুর মতন, হঠাৎ বিচলিত হয়ে পড়ার মতন তার চোখের কোলে এবং পাতায় কেমন অসহায়তার ভাব ফুটল। দৃষ্টি নত করে নিল।
অবনী অপেক্ষা করল, কেন করল সে জানে না; হৈমন্তী কিছু বলবে এই আশায় হয়তো; বা এই দ্বিধায়, হৈমন্তী অসন্তুষ্ট হল কি হল না?
কিছু মনে করলেন?
হৈমন্তী মাথা নাড়ল, না মনে করেনি।
অবনী সামান্য নীরব থেকে বলল, আপনাকে আমি বন্ধুর মতন একটা কথা বলতে পারি। … প্রথম যখন এসেছিলেন কী রকম, মানে আপনাকে অন্যরকম দেখাত; আমার মনে হয়েছিল, আপনিও ডেডিকেটেড, সুরেশ্বরবাবুর মতন, ওই ধরনের কিছু…। আমি বোধহয় ঠিক বোঝাতে পারছি না, নয়– অবনী দ্বিধার হাসি হাসল। সে যাই হোক, আপনাকে এখন তা মনে হয় না। …আপনার এখানে ভাল লাগছে না, আনহ্যাপি। অন্ধ আশ্রমে আপনার কোনও টান নেই। আপনি ডেডিকেটেড নন।
হৈমন্তী নিস্পন্দ বসেছিল; অবনীর দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছিল। তার কোথাও ক্রোধ নেই, বিরক্তি নেই, অসন্তোষ নেই।
অবনী মুহূর্তে কয় অপেক্ষা করল। আমি ভেবে পাই না, ঘরবাড়ি মা ভাই ছেড়ে কেন আপনি এখানে এলেন? …নিজের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে আপনি খুব জীবন্ত। … সুরেশ্বরবাবুর কাজকর্ম আপনি বিশ্বাস করেন না, তাঁর সেবা-টেবা দয়া-ধর্ম এসবেও আপনার মতি নেই। …ক্রিশ্চান নান আমি দেখেছি, আপনি নান নন।
হৈমন্তী পায়ের ওপর থেকে শাল সামান্য তুলে নিল। তার ঈষৎ কুঁজো হয়ে নত মুখে বসে থাকা, তার নীরবতা, অসহায় আড়ষ্ট ভঙ্গি এখন কেমন ছেলেমানুষের মতন দেখাচ্ছিল। যেন এই হৈমন্তীর মধ্যে বয়সের দৃঢ়তা নেই; তার সেই গাম্ভীর্য, পেশার পৃথক মর্যাদা, ব্যক্তিগত সংযম ও গোপনতা আর নেই।
যেখানে আপনার মন নেই, যা ভাল লাগে না, যাতে বিশ্বাস নেই–সেখানে আপনি কেন এলেন আমি জানি না। অবনী যেন ধৈর্য হারাচ্ছিল।
হৈমন্তী হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল। বেশিদিন আর থাকব না।
অবনীর মনে হল হৈমন্তীর গলার স্বরে শীতের বাতাসের মতন ঠাণ্ডা কনকনে একটা ভাব ফুটল।
আমার কথায় রাগ করলেন?
না।
আমার পক্ষে হয়তো এসব কথা বলা উচিত হল না। তবু বললাম। …আপনাকে আমার অদ্ভুত মনে হয়…কেন এসেছেন, কেন আছেন…
কিছু না। হয়তো শখ…
শখ নয়।
তা হলে কিছু ভেবে এসেছিলাম। …আপনি কি শুধু চাকরির জন্যে এখানে এসেছেন?
অবনীর চোখ মুখের ওপর প্রবল জোরে যেন কেউ ফুঁ দিল, চমকে ওঠার মতন হল অবনীর। হৈমন্তীকে দেখল, বলল, সত্যি কথা শুনবেন?
হৈমন্তী তাকিয়ে থাকল।
আমি পালিয়ে এসেছি।
হৈমন্তী কথা বলল না, কিন্তু তার চোখে গভীর কৌতূহল ও প্রশ্ন ছিল, যেন তার দৃষ্টি বলছিল : পালিয়ে এসেছেন? কিন্তু কেন?
অবনী হৈমন্তীর চোখের বিস্ময় ও প্রশ্ন লক্ষ করতে করতে বলল, আমার আর কিছু ভাল লাগত না, চাকরিবাকরি, বন্ধুবান্ধব, বাড়ি কিছু না। সব কেমন একঘেয়েমির মতন হয়ে উঠেছিল। খুব ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলাম। অবনীর মুখে ক্লান্তি ও বিরক্তির ভাব ফুটছিল, গলার স্বরে হতাশা। বোঝানো মুশকিল, ঠিক যে কী বোঝাতে চাইছি তাও জানি না– অবনী ম্লান একটু হাসল, আমার মনে হত, আমার মধ্যে আর কিছু নেই, শুকিয়ে গেছে, বা যা ছিল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জীবনের এই অবস্থাটা এত খারাপ…অসহ্য..
হৈমন্তী অপলকে তাকিয়ে থাকল। মনে মনে যেন বোঝবার চেষ্টা করছিল।
কিছু সময় দুপক্ষই নীরব। শেষ পর্যন্ত অবনী এই বিষণ্ণ স্তব্ধতা কাটাবার জন্যে নড়েচড়ে বসল, সিগারেট ধরাল, তারপর বলল, আমার আসার সঙ্গে আপনার আসার কোনও মিল নেই। আমি যেন অনেকটা পালিয়ে কোথাও মাথা লুকোতে এসেছিঃ আপনি তো তা নন–আমার ধারণা, আপনি কোনও আশা নিয়ে এসেছিলেন।
