ততক্ষণে সন্ধে হয়ে গেছে। চারপাশে কেমন একটা ময়লা আলোর ভাব, টিলা আর পাহাড়, গাছপালার অন্ধকার, কৃষ্ণপক্ষের শুরু, চাঁদ উঠে আসছে, দুরে দুরে বাতি জ্বলছে, যেন একটি আলোর মালা সমস্ত উপত্যকার গলায় ঝোলানো, বাতাসের ধারালো চোট গায়ে লাগছে, কুয়াশা ঝাপসায় ডান দিকের বাঁধটি মাঝরাতের তেপান্তরের মাঠের মতন দেখাচ্ছিল।
হৈমন্তীর শীত করছিল, গগন কুঁকড়ে গিয়েছে। বিজলীবাবু কান মাথা ঢেকে নিয়েছেন চাদরে। খানিকটা পথ চড়াই উঠে ইনসপেকশান বাংলো।
গগন শীতের চোটে সিগারেট ধরাল। বলল, ভেতরে যতক্ষণ ছিলাম মনেই হয়নি বাইরে এ রকম ঠাণ্ডা।
বিজলীবাবু বললেন, একে উঁচু জায়গা, পাহাড়ি; তার ওপর ওই বেঁধে রাখা জলকুল কিনারা দেখছি না; শীতের দাপট রাত্রে বোঝাবে।
হৈমন্তীর মনে হচ্ছিল একটা স্কার্ফ কিংবা মাথায় গলায় জড়ান কিছু যেন না নিয়ে এসে সে ভুল করেছে। নিয়ে নিলেই হত। গাড়ি থেকে নেমেই তারা সটান চলে এসেছিল। জিনিসপত্র যা, বেহারা-খানসামাগুলো ঘরে নিয়ে চলে গেল। বাংলোয় তারা ঢোকেনি পর্যন্ত। …একটা জিনিস হৈমন্তী লক্ষ করল, অবনীর চাকরির মর্যাদা এখানে বেশ। তার পরিচয়–অন্তত সরকারি পরিচয় এরা জানে হয়তো, খাতির কিছু কম করল না। সাধারণের জন্যে যা নিষিদ্ধ, নানা বিষয়ে যে কড়াকড়ি তার কিছুই তাদের পোয়াতে হল না। দিব্যি সব ঘুরে ফিরে বেড়িয়ে দেখে এল।
রাস্তাটা সুন্দর, পাহাড়ের গায়ে গায়ে ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে, তফাতে তফাতে বাতি, পাশে গাছপালা, নীচে তাকালে স্টাফ কোয়ার্টার্সের আলো চোখে পড়ে। ওপাশে দৈত্যের মতন ড্যাম।
অবনী বলল, আপনার বোধহয় কষ্ট হচ্ছে?
হৈমন্তী হাঁটতে হাঁটতে জবাব দিল, তেমন কিছু নয়; একটু ঠাণ্ডা লাগছে।
আর বেশি হাঁটতে হবে না, কাছেই…
আপনি এখানে মাঝে মাঝে আসেন?
না; বার দুয়েক কাজে আসতে হয়েছে।
আপনাকে চেনে…
ঠিক সেভাবে নয়। তবে এখানের যিনি কর্তা ছিলেন মিস্টার মজুমদার তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। কাজের ব্যাপারেই হয়েছিল। চমৎকার মানুষ। তিনি এখন নেই। বদলি হয়ে গেছেন।
বিজলীবাবু ও গগন অন্যপাশে কথা বলছিল।
কথা বলতে বলতে পথটুকু পেরিয়ে এসে ওরা বাংলোয় উঠল।
.
দুটো ঘর, প্রায় মুখোমুখি। মাঝখানে ঢাকা বারান্দা। ঘরে আসবাবপত্রের বাহুল্য না থাকলেও মোটামুটি খাট, টেবিল, চেয়ার ছিল; দেওয়ালে গাঁথা র্যাক। ঘরের লাগোয়া বাথরুম। ঘরের জানলায় কাঁচ আর খড়খড়ি।
বেয়ারা-খানসামাগুলো জিনিসপত্র ঘরে তুলে রেখেছিল।
চায়ের পাট বসল পুবের ঘরটায়। জানলা বন্ধ, দরজা ভেজানো, বাতি জ্বলছে, ঘরের আবহাওয়ায় অনেকটা স্বস্তি পাচ্ছিল হৈমন্তী।
গরম জল, রাত্রের খাওয়া-দাওয়া, ঘরে আগুন তুলে দেবার ব্যবস্থা ইত্যাদির তদারকি শেষ করে এসে অবনী বলল, আপনাদের বিছানাপত্র পেতে দিক; গরম জল দিচ্ছে বাথরুমে মুখহাত ধুয়ে বিশ্রাম করে নিন খানিক। আমরা ওঘরে আছি।
অবনী আর বিজলীবাবু তাদের ঘরে চলে গেল।
.
ঘরে এসে বিজলীবাবু বললেন, মিত্তিরসাহেব, সবই তো ভাল হল, কিন্তু শেষরক্ষা হবে তো?
অবনী বুঝতে পারল না, সিগারেট ধরাতে ধরাতে তাকাল।
বিজলীবাবু হেসে বললেন, অমন হুইস্কিটার একটা গতি করা দরকার।
অবনী হেসে ফেলল।
বিজলীবাবু চাদর বালিশ বের করতে করতে বললেন, আমি ভেবেছিলাম উনি আসবেন না। …যখন শুনলাম আসছেন তখন থেকেই ঝিমিয়ে পড়েছি। মানে, আর কিছু নয়, আমাদের হল চোরের মন, সিদ দেবার আগে ধরা পড়ার ভয় থাকে।
অবনী হাসতে হাসতে জানলা-ঘেঁষা খাটের ওপর গিয়ে বসল, বসে পায়ের ওপর পা তুলে নিয়ে জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে বলল, আপনি তো গুণী লোক, বুঝেসুঝে ব্যবস্থা করুন।
বিজলীবাবু ঘরের চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন, বললেন, তা তো করতেই হবে, কোলের ছেলে বয়ে এনেছি বাঁধের জলে ভাসিয়ে দিয়ে যেতে তো পারব না।
অবনী জুতোজাড়া খুলে ফেলে গায়ের কোট খুলল। খোলা হোন্ডঅল থেকে র্যাগ, স্লিপার এটা ওটা বের করতে লাগল।
খানসামাটাকে সোড়ার কথা বলেছিলেন? বিজলীবাবু শুধোলেন।
আনিয়ে রাখবে।
তা হলে আমার বিবেচনায়, দুটো মুখে দিয়েও ঘরের দরজা বন্ধ হলেই শুরু করা যাবে।
অবনী মাথা হেলিয়ে সায় দিল।
বাথরুমে জল দিয়ে দিয়েছে বেয়ারা, অবনী চোখে মুখে জল দিতে গেল। বেয়ারা এসেছিল। ঘরদোর বিছানা গুছিয়ে দিয়ে চলে গেল।
বিজলীবাবু তাঁর বিছানাটা হাতে করে ঝাড়লেন, অকারণে, তাঁদের আনা চাদর বালিশই বিছানায় পাতা হয়েছে। বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে আপন মনে গুন গুন করে গাইছিলেন : সে দেখা দেয়, দেয় না, ধরা দিয়ে হায় ধরা দেয় না। বিজলীবাবুর চোখেমুখে কিছু অন্যমনস্কতা; কী ভেবে ভেবে যেন কোনও হাসিও ঠোঁটে লেগে ছিল। স্যুটকেস টেনে দু-একটা কী যেন বের করলেন, মাথার গরম টুপিটাও।
অবনী বাথরুম থেকে সামান্য পরে বেরিয়ে এল, ট্রাউজারস বদলে পায়জামা পরেছে, গায়ে পাঞ্জাবির ওপর পুরু পুলওভার। বিজলীবাবু তখনও চেয়ারে বসে গুন গুন করে গাইছেন :সে যে ধরা দিয়ে ধরা দেয় না, শুধু আশার ভাষায় ফিরে চায় না।
অবনী হেসে বলল, আপনার সেই গান?
সুরটা একবার আনবার চেষ্টা করছিলাম, বিজলীবাবু হেসে হেসে জবাব দিলেন, ঠিক আসে না। বুঝলেন মিত্তিরসাহেব, এও ওইরকমধরা দিয়ে ধরা দেয় না। বলে তাঁর সকৌতুক চাপা চোখ নিয়ে অবনীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন, পরে বললেন, জগতে এ বড় মজার খেলা, না মিত্তিরসাহেব, ধরা দিয়েও ধরা দেয় না।
