গাড়ি চলতে শুরু করল। অল্প এগিয়েই অতি শীর্ণ এক নদী, নদীতে জল নেই, বালির ওপর ছায়া নেমেছে, ধীরে ধীরে যেন বনাঞ্চলের মধ্যে রাস্তাটা হারিয়ে যাচ্ছে, বড় বড় শালগাছ, অজস্র হরীতকী আর নিম। শীতের বাতাস এসে গাছপাতায় ক্ষণে ক্ষণে কাঁপুনি তুলেছে, আমলকী বন যেন হঠাৎ ছুটে এসে পালাল, আর কোথাও গাঁ-গ্রাম চোখে পড়ছে না, শুধু জঙ্গল, বিচিত্র গাছপালা, পথে মানুষজন নেই, গাড়ি নেই, নির্জন নিস্তব্ধ এক জগতে যেন ক্রমশই গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছে।
বিজলীবাবু তাঁর হাতে-পাকানো সিগারেট ধরিয়েছেন। হৈমন্তীর শীত ধরতে শুরু করেছিল, গায়ের কোটটা জড়িয়ে নিল। গগন ঝুঁকে পথঘাট দেখছে, অন্যমনস্ক।
অবনী বলল, বিজলীবাবু, আপনার কপিলকে দিয়ে ক্লাচটা একবার দেখাবেন তো, মাঝে মাঝে বড় ডিস্টার্ব করে…।
বিজলীবাবু অবনীর পায়ের দিকে তাকালেন।
গগন হঠাৎ বলল, আমরা কি পাহাড়ের তলায় এসে পড়লাম?
হ্যাঁ, বিজলীবাবু জবাব দিলেন, আর একটু এগিয়েই দুদিকে পাহাড় পড়ে যাবে, মাঝ দিয়ে রাস্তা। …চন্দ্রগিরির এক গল্প আছে।
কী গল্প?
এখন তো বলা যাবে না…চেঁচাতে হবে; পরে বলব।
গগন চুপ করে গেল।
সামান্য পরেই চারপাশ থেকে পাহাড়ের আড়াল উঠে এল, যেন বনবৃক্ষ ও লতাগুল্মপূর্ণ পাথরের এক মস্ত ঝাঁপি তাদের দুপাশে। দীর্ঘশীর্ষ গাছ, কুণ্ডলী পাকানো জটাজুটধারী অশ্বথ, ভূপীকৃত ছায়া, কদাচিৎ কোনও সূর্যরশ্মির রেখা, গভীর খাদ, আর পরিপূর্ণ স্তব্ধতা; শুধু গাড়ির শব্দ শ্বাসপ্রশ্বাসের মতন কানের পরদায় মিশে আছে।
তারপর কখন যেন এই ঝাঁপি খুলে যেতে লাগল, মাথা তুলে দাঁড়ানো আড়াল সরে যাচ্ছে, বনজঙ্গল বিচ্ছিন্ন ও দূরবর্তী হয়ে আসতে লাগল, সামনে উতরাই, শেষ বিকেলের ম্রিয়মাণ আলোয় ঝাঁক বেঁধে পাখি উড়ে যাচ্ছে, নিমফুলের গন্ধের মতন কেমন এক গন্ধ এল, কয়েকটি বনজ কুসুম।
গগন এতই মুগ্ধ ও উচ্ছ্বসিত হয়েছিল যে সে হঠাৎ গাইতে শুরু করল :বুঝি বেলা বয়ে যায়, কাননে আয় তোরা আয়…।
গগন গানে পারদর্শী নয়; তবু তার মোটা সাদামাটা গলা, তার উচ্ছ্বসিত মুগ্ধ হৃদয় গানটিকে কেমন সুন্দর ও জীবন্ত করে তুলল।
বিজলীবাবু ঘাড় পিছু দিকে হেলিয়ে দিয়ে গান শুনতে লাগলেন। অবনী একবার ঘাড় ফেরাল। হৈমন্তী হাঁটুর ওপর কনুই রেখে গালে হাত দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকল।
গান শেষ হলে বিজলীবাবু বললেন, বাঃ।
গগন যেন এবার লজ্জা পেল। হৈমন্তীর দিকে চকিতে চেয়ে বলল, হঠাৎ কেমন ফিলিং চলে এল বিজলীদা, আমি গাইয়ে নয়।
না হলে গাইয়ে, কিন্তু বেশ গেয়েছ। দেখো ভাই, গান হল আধা-গাইয়েদের জন্যে; আর সুর হল পাকা-গাইয়েদের জন্যে।
গগন কেমন অবাক হয়ে বলল, সে কী! মানেটা তো বুঝলাম না।
বিজলীবাবু হেসে বললেন, মানেটা সহজ। একটা হল অন্তরের জিনিস, অন্যটা যন্তরের।
ঠিক যেন গোধূলি বেলায় মাদাউআলের কাছে ওরা পৌঁছে গেল। কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সরকারি জঙ্গল দুপাশে, মনে হল এক সময়ে এই জঙ্গল কেটে মাঠ হয়েছিল, আবার নতুন করে সামনের দিকটায় গাছের চারা পোঁতা হয়েছে। ছোট ছোট গাছ, সাজানো, গোছানো, একটা সজারু ছুটে গেল, কিছু পাখি, শীতের ধূসরতা নেমে গেছে, আকাশ গড়িয়ে গোধূলির আলো মেঘের আড়ালে ডুবে যাচ্ছে, ঠাণ্ডা কনকনে মুঠো ক্রমশ শক্ত হয়ে আসছে শীতের।
দেখতে দেখতে এই বনের মধ্যে মানুষের পদচিহ্ন ফুটে উঠল। হলুদ রঙের কোয়াটার্স, মস্ত মস্ত লোহার থাম, ওভারহেড লাইন, নদীর রেখা, অন্যদিকে পাহাড়ের দেওয়াল। যেতে যেতে সরকারি জঙ্গলে গগন একটা হরিণ দেখতে পেল। আঙুল দিয়ে হরিণটা দেখাবার আগেই সে অদৃশ্য।
অবনী ডাইনে বেঁকল, তারপর আবার বাঁয়ে। সামান্য পথ এগিয়েই চোখের সামনে বাঁধটা দেখা গেল। এপাশ ওপাশ যেন আর দেখা যাচ্ছে না স্পষ্ট করে, অন্ধকার হয়ে এসেছে, বাতি জ্বলছে, দুরন্ত তীক্ষ্ম এক বাতাসের দমকা এসে সর্বাঙ্গ শিহরিত করল।
বিজলীবাবু বললেন, বছর পাঁচেক আগে একবার এসেছিলাম মিত্তিরসাহেব, তখন কাজ চলছে। এখন দেখছি ভোল পালটে ফেলেছে।
অবনী বলল, আসতে তো চাইছিলেন না, জোর করে নিয়ে এলুম।
গগন বলল, ইস, এখানে এসে সাতটা দিন থাকলেই হত। মার্ভেলাস সাইট। …কী রে দিদি, ভাল লাগছে না?
হৈমন্তী ঘাড় কাত করল। তার ভাল লাগছিল।
.
যতক্ষণ ভেতরে ছিল মনে হচ্ছিল এ এক রহস্যপুরী, যা দেখা যায় তার চেয়েও যা দেখা যায় না তার চিন্তাই যেন বিহ্বল করে, আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় উদাসীন বিরাটাকার কত যন্ত্র ধ্যানীর মতন বসে আছে, কোথাও তার ভ্রূক্ষেপ নেই, অথচ তার আভ্যন্তরিক রহস্যের পরিচয় শুনলে বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। দুর্বোধ্যের সামনে দাঁড়ালে চমৎকৃত হবার যে স্বাভাবিক আবেগ, গগনরা সেই আবেগে চমৎকৃত ও বিহ্বল হচ্ছিল। অবনীর পক্ষে বিমূঢ় অথবা বিস্মিত হবার কোনও কারণ ছিল না। বরং পাওয়ার হাউসের ছোকরা মতন শিফট ইঞ্জিনিয়ার শ্রীবাস্তব যা দেখাচ্ছিল এবং বোঝাচ্ছিল অবনী তার বিস্তৃত ও সরল ব্যাখ্যা করে গগনদের কৌতূহলকে মোটামুটি পরিতৃপ্ত করছিল। যন্ত্রের সেই জটিল জগৎ, যেখানে কেমন একটি নিরবচ্ছিন্ন গুঞ্জন ছিল, যেখানে প্রত্যক্ষের চেয়ে অপ্রত্যক্ষে এবং অন্তরালে কত বিচিত্র কিছু হয়ে যাচ্ছিল, যেখানে আলোকিত মঞ্চে কয়েকটি মাত্র কুশীলব দৈত্যসদৃশ লৌহপিণ্ডকে করতলগত করে রেখেছিল–সেই জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে গগন বলল, এসব দেখলে মানুষের ওপর ভক্তি বেড়ে যায়। জলস্থল তাও তার হাতে বাঁধা পড়ল।
