হাসপাতালে বসে থাকতে থাকতে হৈমন্তী স্থির করে ফেলল : সে যাবে। আসার সময় যুগলবাবুকে বলে এল, কাল আসতে তার বেলা হবে, রোগী এলে যেন বসিয়ে রাখা হয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে গগনকে বলল, আমরা আজ থাকছি না তোর সুরেশদাকে বলে আয়।
পথটা নতুন; এর আগে হৈমন্তী আর এদিকে আসেনি। ছড়ানো কালো ফিতের মতন পথ, যত যাও ততই যেন ফিতেটা খুলে যাচ্ছে, আঁকবাঁক তেমন একটা নেই, পরিষ্কার ছিমছাম, ডাইনে বাঁয়ে ঢেউ-ভাঙা প্রান্তর, দূরে গায়ে গায়ে কোথাও পাহাড়ের টিলা, কোথাও বা তরুলতায় আচ্ছাদিত ছোট ছোট পাহাড়। শীতের মরা রোদ পার্বত্য পাদদেশকে ক্রমশই নিষ্প্রভ করে আনছিল। ছায়া নেমেছে তরুমূলে, ছোটখাটো দেহাতি গ্রাম, অল্পস্বল্প ক্ষেত খামার, সবজি মটরশুটি, কাঁচা কুয়ো থেকে জল তুলছে বউ ঝি, কুল ঝোপ, দু-একটা কুকুর। কদাচিৎ এক আধটা বাস চলে যাচ্ছিল।
সামনে অবনী, পাশে বিজলীবাবু। পেছনে হৈমন্তী আর গগন। নেব না নেব না করেও কয়েকটা জিনিস হয়ে গেছে। তার মধ্যে বিছানার ব্যবস্থাই প্রধান, ছোটখাটো স্যুটকেসও। হৈমন্তীর জন্যে গগন কম্বল নিয়ে নিয়েছিল, আর দুই ভাইবোনের কিছু গরম বস্ত্র। গগনরাও সুটকেস নিয়েছে একটা। জল আর চায়ের ফ্লাস্ক, টিফিন কেরিয়ার–এসব বিজলীবাবুর ব্যবস্থা। উপরন্তু বিজলীবাবুর আরও একটি ব্যবস্থা ছিল, হৈমন্তী আসছে শুনে তিনি সঙ্কুচিত ও বিব্রত হয়ে আগেভাগেই সেটা লুকিয়ে ফেলেছিলেন।
দেখতে দেখতে অনেকটা পথ চলে আসা গেল।
বিজলীবাবু বললেন, মিত্তিরসাহেব এবার একটু রেস্ট দিন। বিকেলের চা-টা খেয়ে ফেলা যাক।
ক মাইল এলাম? গগন শুধোল।
প্রায় আধাআধি, মাইল পঁচিশ হবে– বিজলীবাবু জবাব দিলেন।
বিজলীদার দেখছি মাইলেজ পর্যন্ত মুখস্থ, গগন হেসে বলল।
এখানকার দেহাতি লোক ভাই, কোথায় কী তার একটা মোটামুটি জ্ঞান না থাকলে চলে। বলে বিজলীবাবু ডান হাত তুলে দূরে একটা পাহাড় দেখালেন, বললেন, ওই পাহাড়টা হল চন্দ্রগিরি, এখানকার লোকে বলে চাঁদওআরি, ওর নীচে দিয়ে আমাদের যেতে হবে।
পাহাড়টা তো কাছেই, গগন বলল।
মাইল ছয়েক বিজলীবাবু বললেন।
গগনের বিশ্বাস হল না, বলল, ছ মাইল? কী বলছেন! …এখানের মাইলের হিসেবটাও কি দেহাতি?
বিজলীবাবু হেসে জবাব দিলেন, পাহাড় জিনিসটা ওই রকমই মনে হয় পাই পাই তবু তারে পাই না।
বিজলীবাবুর বলার ভঙ্গিতে গগন জোরে হেসে উঠল। হৈমন্তীও হেসে ফেলল। অবনী হাসতে হাসতে বলল, বিজলীবাবু, এটা ওমর খৈয়াম নয়। বলে চা খাবার জন্যে গাড়ি দাঁড় করাল।
বিজলীবাবু সহাস্য মুখে জবাব দিলেন, না, ওমর খৈয়াম নয়। এ হল পুরনো দিনের বাংলা গান । সে যে দেখা দিয়ে দেখা দেয় না, ধরা দিয়ে হায় ধরা দেয় না। জংলা কারফা।
অবনী গলা ছেড়ে হেসে উঠল। গগনও হাসতে লাগল।
অবনী বলল, বিজলীবাবুর তা হলে পুরনো বাংলা গানও জানা আছে।
গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলেন বিজলীবাবু, পথে দাঁড়িয়ে গায়ের জামাটা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, একটু আধটু আছে। আমার বাবার মুখে শুনেছি। হারমোনিয়াম বাজিয়ে ডুগি তবলার সঙ্গে সঙ্গত করে গাইতেন। বলে বিজলীবাবু গাড়ির মধ্যে হাত বাড়ালেন, হৈমন্তীকে বললেন, দিন তো দিদি, চায়ের ফ্লাস্কটা। ওই যে হলুদ মতন কাপড়ের থলে ওর মধ্যে কাপ টাপ আছে।
গগনও নীচে নেমে দাঁড়িয়েছিল। অবনী রাস্তায় দাঁড়িয়ে জিপগাড়িটার সামনে চাকায় বার কয়েক জুতোর ঠোক্কর মেরে কী যেন দেখে নিল।
হৈমন্তী চায়ের কাপ বের করল। বিজলীবাবুর সব কাজ ব্যবস্থা মতন, কোথাও এতটুকু ভুল হবার জো নেই। চায়ের কাপ, জলের গ্লাস, কলাপাতায় মোড়া পান। হৈমন্তী গাড়ির পিছন দিক থেকে জলের ফ্লাস্ক নিয়ে কাপ ধুতে ধুতে বলল, বাড়ি থেকে সব গুছিয়ে দিয়েছে না?
বিজলীবাবু হাসলেন। ওইটুকুই সুখ, কোথাও যাব বললে আর রক্ষে নেই, মরণকালে মুখে দেবার গঙ্গাজলটুকু পর্যন্ত এগিয়ে দেবে।
হৈমন্তী হাসিমুখে ভর্ৎসনা করল, ছি, ও কথা বলবেন না।
গগন বলল, আপনি এমন তোফা আছেন বিজলীদা যে আপনাকে দেখে ম্যারেজ সম্পর্কে আমার প্যানিকটা কেটে যাচ্ছে।
ফক্কড়….! হৈমন্তী ধমক দিল যেন।
হাসাহাসির মধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া হল। হৈমন্তী নামল না।
মাঠ ঘাট থেকে রোদ এবার উঠতে শুরু করেছে, যেন এতক্ষণ সারাটা সকাল দুপুর ধরে আকাশ এসে মাটিতে রোদ মেলে দিয়েছিল, এবার বেলা পড়ে যাওয়ায় দ্রুত হাতে তা তুলে নিয়ে কোলে জড়ো করছে।
অবনী এসে গাড়িতে বসল, ঠোঁটের ডগায় সিগারেট। বিজলীবাবু পান মুখে পুরেছেন, জিবের ডগায় একটু চুন চুঁইয়ে ধীরে ধীরে গাড়ির মধ্যে উঠে এলেন। গগনও সিগারেট টানতে টানতে উঠে পড়ল।
প্রায় সাড়ে চার বাজছে। রোদ পালাচ্ছে বলে বুঝি শীতের দমকা উত্তরের বাতাস তাকে তাড়া করতে শুরু করে দিয়েছিল। গাছের ছায়াগুলি এখন বেশ দীর্ঘ এবং মাটির রঙের সঙ্গে ছায়ার রং মিশে আছে।
অবনী গাড়িতে স্টার্ট দিল।
কতক্ষণ লাগবে পৌঁছতে? গগন জিজ্ঞেস করল।
ঘণ্টাখানেক, অবনী বলল; বলে বিজলীবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, নাওদা না কী বলে যেন, ওখান থেকে একটা কাঁচা রাস্তা ধরলে নাকি শর্টকাট হয়।
বিজলীবাবু মাথা নাড়লেন, রাস্তা খুব খারাপ, আমার চেনা নেই; পুরনো রাস্তাই ভাল।
