হৈমন্তী হাসবার চেষ্টা করল, পারল না। অবনীর সামনে সাধাসিধে মুখে গল্প-টল্প করতে গিয়েও সে পারছে না। মাথাটা সত্যিই ধরে আছে। দুপুর থেকে ক্রমাগত সে কেন যে এত ভাবছে, কী আছে এত ভাববার, সুরেশ্বরের জীবনে কত ঘটনাই তো ঘটতে পারে, তাতে তার কী আসে-যায়!
আপনাকে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি অবনী হঠাৎ বলল।
হৈমন্তী সচকিত হয়ে তাকাল।
অবনী বলল, আমায় পাটনা যেতে হচ্ছে না!
হৈমন্তী খুশি হল। খুশির পরক্ষণেই তার চোখে বিমর্ষ ভাব ফুটল। গেলেই পারতেন; এভাবে জীবনের উন্নতি নষ্ট করতে নেই।
আমার জীবন খুব ছোট– অবনী হাসল, উন্নতি আর চাই না, একটু স্বস্তি চাই।
এখানে স্বস্তিতে আছেন?
অনেকটা।
অবনী অবশ্য আগেও অনেকবার বলেছে কথাটা। হৈমন্তী চুপ করে থাকল, কী ভাবল, তারপর বলল, আপনারা সবাই দেখছি এই জায়গাটায় খুব স্বস্তি পাচ্ছেন। তার কথাটা শেষ হয়েও হল না যেন।
অবনী প্রথমটায় বুঝতে পারেনি, পরে বুঝল। বলল, আমরা কে কে সুরেশ্বরবাবু আর আমি! ওঁর কথা আলাদা, আমি তো ছোটখাটো সুখ-স্বস্তিতেই বেঁচে যাই।
তা হোক, তবু এটা জায়গার গুণ.. হৈমন্তী পরিহাস করে বলতে গেল।
অবনী পূর্ণদৃষ্টিতে হৈমন্তীকে লক্ষ করল, বলল, আপনার বোধহয় তেমন স্বস্তি হল না।
হৈমন্তী চেষ্টা করল অবনীর দিকে তাকাবার, কোনও রকম অদ্ভুত এক ভয়ে তাকাতে পারল না। আলোর দিকে মুখ করে বসে থাকল।
অবনীও কোনও কথা বলছিল না।
শেষ পর্যন্ত হৈমন্তী নিজেকে যেন কোনও অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বাঁচাবার জন্য বলল, আজ স্বস্তি স্বস্তি করছেন, পরে আফশোস, করবেন।
কেন?
হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলছেন বলে?
অবনী হাসল না, হাসির মতন মুখ করল; বলল, আফশোসের কথা বলবেন না, ওটা আমি সারা জীবনই প্রায় করে যাচ্ছি। এতদিনে গা সওয়া হয়ে গেছে। বলে অবনী চেয়ারে পিঠ হেলিয়ে গা সামান্য ছড়িয়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকাল। কী ভেবে সামান্য পরে বলল, লক্ষ্মী-অলক্ষ্মী দুইয়ের জন্যই তো দেখি মানুষের আফশোস। …তার বাইরেও কত রকমেরই আফশোস আছে! অবনী যেন কথার শেষে হাসতে চাইল।
হৈমন্তী নীরব থাকল। অবনী ঠিকই বলেছে। আফশোসের কি অন্ত আছে জীবনে!
পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল অবনী, হৈমন্তীর দিকে তাকাল, তারপর মুখ নিচু করে সিগারেট ধরাল। কে যেন বলেছিল– অবনী মুখ তুলে বলল, জগৎটাকে গড়ার সময় বিধাতা ভদ্রলোকের কাণ্ডজ্ঞান বিশেষ ছিল না, কাঁচা হাতে বোকার মতন এই সংসারটা গড়ে ফেলেছেন; মোস্ট ইমপারফেক্ট…। কথাটা বন্দ বলেনি, কী বলেন? খানিকটা ভদ্রলোকের মন গড়তে পারলে এত আফশোস-টাফশোস থাকত না…অবনী এবার হাসল। হাসিটা ছাই চাপা আগুনের মতন, ওপরে হাসি ভেতরে যেন কীসের আঁচ রয়েছে।
হৈমন্তী গায়ের চাদর খুলে আবার গুছিয়ে নিল, নিজের এই স্থির অনড় ভাবটা যেন তার ভাল লাগছিল না। সামান্য নড়েচড়ে বসল। শেষে হেসে বলল, সংসারের গড়নটা আপনার তা হলে পছন্দ নয়?
মাথা নাড়ল অবনী, না। কোনওকালেই ছিল না।
কিন্তু কিছু করতেও পারলেন না।
কিছু না; শুধু বসে বসে আফশোস।
কী জানি….! আফশোস করেই বা কী লাভ! হৈমন্তী অন্যমনস্কভাবে বলল।
কিছু না। বিজলীবাবু হলে ওমর খৈয়াম শোনাতেন। আমার কাব্য-টাব্য জানা নেই। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, কোনওদিন ছাদ ফুড়ে দুম করে যদি কিছু পেয়ে যাই–অমূল্য রতন, তবে আর আফশোস, করব না। অবনী হাসছিল।
গগন এল। ঘরে এসে বলল, চা দেয়নি? ..আনছে তা হলো… বুঝলি দিদি, সুরেশদাকে বলে এলাম। বললাম, কাল আমাদের স্টেশনে নেমন্তন্ন, মেলায় যাচ্ছি না। …ভেরি বিজি সুরেশদা, লোকজন রয়েছে। বলে কী মনে হওয়ায় গগন অবনীর দিকে তাকাল, আপনি ঠিকই বলছিলেন স্যার, কোথায় যেন কীসের একটা এপিডেমিক ব্রেক-আউট করেছে। ওখানেও শুনলাম।
.
২৪.
পথ মাইল পঞ্চাশের কিছু বেশি। অবনী দুপুর নাগাদ এসেছিল, বেরুতে বেরুতে তিনটে বাজল।
হৈমন্তীও যাচ্ছে। তার যাবার কিছু ঠিক ছিল না; বরং বরাবরই সে বেশি দূর পথ যেতে, বাইরের ঠাণ্ডায় রাতে ঘোরাঘুরি করতে অনুৎসাহ দেখিয়েছে। গুরুডিয়া থেকে অতটা পথ জিপে করে গিয়ে মাদাউআলের বনজঙ্গল পাহাড়ের মাঝখানে হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার হাউস দেখার উৎসাহ তার ছিল না। তা ছাড়া সারারাত সেখানে কাটাতে হবে। অসুবিধেও ছিল। তবু সে শেষ পর্যন্ত যাচ্ছে।
গতকাল, অবনীর বাড়িতে গগনের সঙ্গে বড়দিন করতে এসে সারাটা দিন ভালই কেটেছিল। গল্পগুজব, হাসিঠাট্টা, বিজলীবাবুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, অনেক দিন পরে হঠাৎ গগনের পাল্লায় পড়ে তাস খেলা–এসব যেন মনের কোনও গুরুভার সাময়িকভাবে অনেকটা হালকা করে দিয়েছিল। ফেরার সময় অবনী বলল, আপনিও চলুন কাল, সাইটটা খুব সুন্দর, বাঁধের গায়ে পাহাড়ের ওপর ইনসপেকশান বাংলো, চমৎকার লাগবে। একটা তো রাত। অসুবিধে খুব হবে না। পরশু দিন বেলা নটার মধ্যে যথাস্থানে পৌঁছে দেব আপনাকে।
গগন বলল, চল দিদি, এই চান্স। পরে আর তোর যাওয়া হবে না।
হৈমন্তী তখনও স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। সে গগন নয়, যাব বললেই যেতে পারে না। কিছু যেন ভাবার ছিল।
আজ সকালে হাসপাতালে রোগী ছিল না; অনেকটা বেলায় দুজন এল : একটার চোখ উঠেছে, অন্যটার ঠাণ্ডায় চোখ মুখ ফুলে টসটসে। তারপর এল সুরেশ্বর, সঙ্গে শিবনন্দনজি। দুজনেই যেন ব্যস্ত; কথা বলতে বলতে এসেছিল, কথা বলতে বলতেই চলে গেল, কেন এসেছিল বোঝা গেল না। কিন্তু মনে হল, যেন এই আসা-যাওয়ার মধ্যে হৈমন্তীকে দেখে গেল।
