কী ঘটনা?
কী জানি! কিছু বলল না। …তুই কিছু জানিস?
হৈমন্তী মাথা নাড়ল, না জানে না। কিন্তু সে বিস্মিত হয়েছিল এবং ভাবছিল।
সেদিন অবনীর আসতে দেরি হল; যখন এল তখন আর বিকেল ছিল না, পৌষের অপরাহ্ন ধূসর হয়েছে, অন্ধকার হয়ে এল প্রায়। উত্তরের বাতাসটাও আজ সারাদিন প্রখর, মাঠে-ঘাটে শনশন ছুটে বেড়াচ্ছিল। আকাশের রোদ দুপুর থেকেই ঘোলাটে হয়ে গিয়েছিল, মাঝে মাঝে জমছিল, আবার ভেসে যাচ্ছিল।
গগন বলল, আমরা ভেবেছিলাম আজ আর আপনি এলেন না।
অবনী বলল, আজ তো কোথাও যাবার কথা নেই, দেরি করেই এলাম। কাল ছুটি, পরশুও; কাজকর্ম সেরে বাড়ি ফিরেছি দুপুরে।
গগন অবনীকে নিজের ঘরে এনে বসাল। বলল, আজকের ওয়েদারটা কী রকম যেন। শীত খুব, কিন্তু ডাল।
বৃষ্টি হতে পারে।
এই শীতে বৃষ্টি–
এ-সময় একটু-আধটু হয়। …আচ্ছা শুনুন, পরশুদিন আমরা কিন্তু হাইড্রো-ইলেকট্রিক ইনস্টলেশান দেখতে যাচ্ছি, ইনস্পেকশান বাংলো পাওয়া যাবে।
বাঃ, ওয়ান্ডারফুল। ওটা হলেই আপাতত হয়ে যায় আমার– গগন হাসল, তারপরই ঘরের ছেলে ঘরে।
কবে ফিরছেন?
পয়লা…
এত তাড়াতাড়ি! সেকি, আরও থেকে যান কদিন।
গগন হেসে মাথা নাড়ল। না; আর থাকা যাবে না। এসেছিও তো দশবারো দিন হয়ে গেল। বসুন, দিদিকে ডেকে আনি। গগন হৈমন্তীকে ডাকতে গেল।
সামান্য পরেই ফিরল গগন। বলল, আমি তো ভাবছিলাম কাল আপনাদের ওখানে যাব। আমার একটা নেমন্তন্ন পাওনা রয়েছে। গগন হাসল।
অবনী ততক্ষণে সিগারেট ধরিয়েছে, জবাব দিল, চলে আসুন। বলা তো আছেই—
বিজলীদা মুরগি-টুরগি খাওয়াবেন বলেছেন
বিজলীবাবুর রান্নার হাতযশ আছে; অবনী হেসে বলল। ঠিক আছে, ব্যবস্থা করা যাবে, আপনারা চলে আসুন।
দিদি কি যাবে?
যাবেন না? কেন?
জানি না। ওদের হাসপাতাল বন্ধ থাকলে যাবে। আমি সকালবেলাতেই পালাতে চাই। নয়তো ঝামেলায় পড়ব।
অবনী কিছু বুঝল না।
গগন নিজের থেকেই বলল, সুরেশদারা কোথায় কোন মেলায় গিয়ে চক্ষুরোগের প্রতিকার না কি তার স্লাইড দেখাবে। আমায় বলেছে, চল। ধ্যত, ওসব আমার পোয় নাকি? তার আগেই পালাতে চাই। গগন সরল গলায় হেসে হেসে বলল।
অবনী হেসে ফেলল। এই ব্যাপার?
আপনি কি মেলাটায় গিয়েছেন নাকি, স্যার? মাঝে মাঝে গগন মুখফসকে রসিকতা করে স্যার বলে ফেলে, এটা তার অভ্যেস।
না। অবনী মাথা নাড়ল; তারপর বলল, মেলা-ফেলায় এখন যাওয়া রিসকি। সেদিন কোথায় যেন শুনলাম বিদঘুটে এক রোগে কোন মেলায় দুটো লোক মারা গেছে।
কী জানি! অফিসে কে বলছিল। ..এ সময়টা এদিকে গাঁয়েটায়ে স্মল পক্সটা খুব হয়, প্লেগও শুনেছি হত।
এমন সময় হৈমন্তী এল। ঘর বেশ অন্ধকার হয়ে আসছে জেনেই যেন সে বাতি এনেছিল। বাতিটা নামিয়ে রাখল।
গগন বলল, দিদি, কাল তোর হাসপাতাল?
কেন?
না, তা হলে সকালের দিকে স্টেশনে চলে যেতাম। বড়দিনটা ওখানেই করা যেত।
তুই বুঝি নিজেই পাকা ব্যবস্থা করে ফেলেছিস!
তা করেছি। সুরেশদার সঙ্গে মেলায় যাওয়ার চেয়ে নেমন্তন্ন খাওয়া কি খারাপ?
গগন হাসতে লাগল।
হৈমন্তী গগনের বিছানার পাশ ঘেঁষে বসল।
অবনী বলল, কাল আপনারা আসুন।
হৈমন্তী হাসপাতালের কথা তুলল না, মাথা হেলিয়ে বলল, যাব।
গগন কেমন যেন অবাক হল। তোর হাসপাতাল?
ওরা দেখবে, হৈমন্তী সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, তার জবাব শুনে মনে হল প্রসঙ্গটা তার আর আলোচনা করার ইচ্ছে নেই।
গগন চুপ করে গেল। অবনীও কথা বলছিল না। হঠাৎ কেমন একটা স্তব্ধতা নামল ঘরে।
শেষে গগনই কথা বলল। চায়ের কথা বলেছিস?
না, মালিনীকে পেলাম না। দেখ তো ফিরেছে কিনা?
গগন উঠল, ঘরের এক কোণে টুলের ওপর তার সুটকেস, সুটকেসের ওপর রাজ্যের গরম জামা-টামা পড়ে আছে, পুরোহাতা পুলওভারটা টেনে নিয়ে পরে নিল, যদিও ভেতরে তিন প্রস্থ জামা আগেই পরেছে। বলল, আমি এই ফাঁকে বোঁ করে সুরেশদাকে বলে আসি, কাল মেলায় যাওয়া হবে না। বলে মালিনীর খোঁজ করতে চলে গেল।
অবনী হৈমন্তীর মুখের দিকে তাকাল, দেখল, চোখ ফেরাল, তারপর আবার তাকাল। অন্য দিনের তুলনায় হৈমন্তীকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। অবনী বলল, আপনার কি শরীর খারাপ?
হৈমন্তী চোখ ফিরিয়ে তাকাল। না; কেন?
মনে হল… অবনী হাসল, খুব গম্ভীর…
গম্ভীর থাকলে শরীর খারাপ বোঝায়?
জানি না, লোকে বলে, বোধহয় ওটা অভ্যেস। আপনিই বেশি বুঝবেন, ডাক্তার বদ্যি লোক।
হৈমন্তী অন্যমনস্ক চোখে অবনীর সকৌতুক মুখভঙ্গি লক্ষ করছিল। অবনীর সম্পর্কে তার নানাবিধ গভীর কৌতূহল জাগে আজকাল। এখন অবশ্য সেরকম কোনও কৌতূহল জাগছিল না, বরং অবনীর দিকে তাকিয়ে থাকলেও অন্য কিছু ভাবছিল। হৈমন্তী বলল, মাথাটা বিকেল থেকে ধরে আছে; হয়তো ঠাণ্ডা লেগেছে। আজ খুব ঠাণ্ডা।
অবনী মাথা নাড়ল, হ্যাঁ, বেশ শীত; বৃষ্টি বাদলা হতে পারে সামান্য।
হৈমন্তী এমন একটা মুখভাব করল, মনে হল শীতের বৃষ্টি তার বিন্দুমাত্র পছন্দ নয়।
দুজনেই প্রায় চুপচাপ। অল্প পরে অবনী বলল, গগনবাবু তো চললেন–
আপনি গগনকে বাবুটাবু বলে যেরকম বাড়িয়ে দিলেন– হৈমন্তী হালকা হবার চেষ্টা করল, ও কত ছোট, আমার চেয়েও ছোট…
অল্প দিনের পরিচয়, বেশিদিন থাকলে হয়তো গগন বলেই ডাকতাম।
কিছু না, আপনি অনায়াসেই ডাকতেই পারেন। আপনার আড়ালে ও মাঝে মাঝে যেরকম ঠাট্টা করে।
তাই নাকি?
