গগন বলল, বরং আমি ভাবছি কাল স্টেশনে গিয়ে থাকব। ওঁরা তো বলেছিলেন সেদিন।
হৈমন্তী গলার তলায় লেপ সরিয়ে দিয়ে এবার পাশ ফিরল, গগনের মুখোমুখি হয়ে থাকল।
অবনীবাবুর ওখানে দিব্যি থাকা যাবে, আমাদের বিজলীদা আছেন, খুব একটা হইহই করে ক্রিসমাস করা যাবে। …আমার, বুঝলি দিদি, তোদের এই আশ্রম আর পোযাচ্ছে না।
হৈমন্তী বুঝতে পারছিল গগন ঠিক যে কথাটা বলতে চায় তা বলতে পারছে না, না পেরে ভূমিকা করছে।
হৈমন্তী বলল, তুই কবে কলকাতায় ফিরছিস?
পয়লা…
ছুটি শেষ হচ্ছে কবে?
ওই রকমই, দু তিন তারিখে। গগন পকেট হাতড়ে সিগারেট বের করল। তার আগে সে উঠে গিয়ে জল গড়িয়ে নিয়ে খেল।
হৈমন্তী কখন যেন গালের তলায় হাত রেখে শুয়েছে।
গগন সিগারেট খেল খানিক, তারপর বলল, বুঝলি দিদি, আমি সেদিন সুরেশদাকে বলছিলাম, ব্যাপার যাই হোক, আমাদের মধ্যে যেন ভুল বোঝাবুঝি না হয়। বলছিলাম বটে, কিন্তু এসব বলার কোনও মানে হয় না। সুরেশদাকে আমি খারাপ বলছি না, কিন্তু আমার আর তাকে ভাল লাগছে না। মানে আগে যেমন ভাল লাগত এখন আর তেমন লাগছে না। আমি তাকে অ্যাভয়েড করছে চাইছি।
হৈমন্তী বলল, জানি।
গগম দিদির মুখের দিকে তাকাল। তার মনে হল, দিদি হয়তো আরও একটু বেশি জানলে ভাল হত। জানলে এখানে আসত না। কী রকম বোকার মতন এসেছে, অন্ধের মতন!
কাউকে ভাল না লাগার সঙ্গে হয়তো মানুষের স্বার্থ থাকে– গগন বলল, কেনই বা থাকবে না। তবে সুরেশদাকে আমার এ রকম মনে হয়নি।
হৈমন্তী নীরব, পায়ের দিকের লেপটা সামান্য নড়ল,দুপুরের রোদ সরে গেছে–ঘরে কোথাও রোদ নেই, জানলায় নেই, পরদার আড়াল দিয়ে কিছু দেখাও যাচ্ছে না, সারা মাঠে আজ সকাল থেকে উত্তরের খেপা বাতাস : সেই বাতাসের শব্দ, কুয়ার লাটাখাম্বা উঠছে নামছে তার শব্দ, কখনও কাকের ডাক, কদাচিৎ কোনও পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল।
গগন আবার বলল, সেদিন আমার মনে হল, সুরেশদা নিজের দামটাই বেশি দেয়। …একটা লোক সব সময় নিজের পাওনা হিসেব করবে এটা আমার কাছে অসহ্য।
হৈমন্তী হঠাৎ বলল, সেদিন কী বলল?
গগন যেন না-চেয়েও শেষ পর্যন্ত অবাঞ্ছিত প্রসঙ্গটায় চলে এসেছে। ইতস্তত করে বলল, কী আর, তোকে তো বলেছি।
না, তুই বলিসনি। …তুই আমার কাছে লুকিয়েছিস।
আমি তো বললাম, সুরেশদার কথাবার্তা থেকে মনে হল না তার আর কোনও আগ্রহ আছে।
তুই কী বললি তা শুনেছি, ও কী বলল তা বলিসনি। তোর মুখ দেখে আমার সেদিনই সন্দেহ হয়েছে, এমন কিছু ও বলেছে যা তুই বলতে পারছিস না।
আমার সঙ্গে সুরেশদার এব্যাপারে কথা খুব কমই হয়েছে, বিশ্বাস কর…
গগন– হৈমন্তী যেন ধৈর্যহীন হয়ে ধমকে উঠল।
গগন সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিল, বলল, একটা লোক মুখে কখন কী বলে সেটা বড় কথা নয়, মুখের কথার সত্যিই তেমন কোনও দাম নেই। তবে তুই ঠিকই ধরেছিলি, সুরেশদা আর সে-মানুষ নেই। ভালবাসাটা তার কিছু নয়। ..সুখ-টুখ…আনন্দ এইসব কী যেন বলছিল। আসলে কিছুই বলছিল না। চুপ করে ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এসব জ্ঞান তোমার এতদিনে হল? জবাবে বলল, না আগেই হয়েছে…। আমি কিছু বুঝলাম না। জ্ঞান যদি আগেই হবে তবে এতদিন ধরে এইভাবে ধোঁকা দেওয়া কেন? তার কোনও জবাব নেই। মামুলি কথা : আমার ভুল হয়েছে…। ওটা কোনও জবাব নয়, কৈফিয়ত নয়। … যাকগে, এ একপক্ষে ভাল, যা হবার হয়ে গেল। সেই যে–মামা বলে, মামলার তারিখ পড়ার চেয়ে জজের রায় ভাল, কথাটা ঠিক…। গগন যেন শেষের দিকে তার হতাশা ও ক্ষোভ দমন করার চেষ্টায় কোনওরকম সান্ত্বনা খুঁজল।
হৈমন্তী কথা বলল না, অল্প একটু শুয়ে থেকে এবার উঠে বসল, হাঁটু মোড়া, কোমর থেকে পা লেপে ঢাকা রয়েছে।
বসে থাকতে থাকতে গগন বলল, সুরেশদা যখন আনন্দ-টানন্দ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে তখন আমার মনে হয় না তোর আর এখানে থাকা চলে। মাও রাজি হবে না। …আমি চলে যাই, তুইও কয়েকটা দিন পরে আয়।
হৈমন্তী এবারও কথার কোনও জবাব দিল না, কপাল এবং মুখের পাশ থেকে এলোমেলো চুলের গুচ্ছ হাতে করে সরিয়ে নিতে লাগল।
গগন কেমন অপরাধীর মতন একবার দিদিকে দেখল কয়েক পলক, তারপর গলা উঁচু করে জানলার বাইরে তাকাল। শেষে ইতস্তত করে বলল, দেখ দিদি, কথায় বলে ভালবাসা মরে যাবার পর ভালবাসার ভানটা সাঙ্ঘাতিক, ওর চেয়ে বিচ্ছিরি আর কিছু হতে পারে না। …আমায় যদি বলিস আমি বলব, সুরেশদার ও ব্যাপারটা আর নেই, আমার তো তাই মনে হল… বোধহয় তোর দিক থেকেও এখন আর কোনও… কথা গগন শেষ করল না।
গগনের চোখে চোখে তাকিয়ে ছিল হৈমন্তী। মনে হচ্ছিল, হৈমন্তী যেন তার অভ্যস্ত দক্ষ দৃষ্টিতে গগনের চোখের সবটুকু দেখে নিচ্ছিল। দৃষ্টি তীব্র, স্থির, প্রখর। গগন রোগীর মতন তার চোখ খুলে বসে থাকল।
হৈমন্তী বলল, যতক্ষণ মুখফুটে না বলছিল ততদিন বুঝি তোর মনে হচ্ছিল ওর ভালবাসা আছে? গগন এবার নীরব থাকল, মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকাল।
আর কী বলল–! … বলল না যে, আমার বড় অন্যায় হয়েছে, তোমরা আমায় ক্ষমা করো, মাসিমাকে বোলো তিনি যেন কিছু মনে না করেন– ব্যঙ্গ করে করে হৈমন্তী বলছিল।
গগন মাথা নাড়ল ধীরে ধীরে, বলল, ভুলের কথা বলছিল। …একটা কথা আমি বুঝতে পারলাম না, কী বলছিল–একবার এক ঘটনা থেকে হঠাৎ তার সব কেমন হয়ে গেল, দ্বিধা-টি চলে এল…
