এখানে থাকতেও যে গগনের আর তেমন ইচ্ছে করছিল তাও নয়। কিন্তু হঠাৎ চলে যাওয়া আরও দৃষ্টিকটু হত। ভেতরের গোলমালটা আরও প্রকাশ্য দেখাত, অন্তত সুরেশদার কাছে তাদের বিরক্ত, বীতস্পৃহ, ক্রোধের মনোভাব সরাসরি প্রকাশ হয়ে পড়লে যেন কোথাও একটু খেলো হয়ে থাকতে হত। গগন ভাবছিল, আর কয়েকটা মাত্র দিন কোনও রকমে কাটিয়ে সে নতুন বছরের শুরুতেই কলকাতায় ফিরে যাবে।
গগনের অন্য দুশ্চিন্তা দাঁড়িয়েছিল হৈমন্তী। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে, না আপাতত রেখে যাবে।
সেদিন সুরেশ্বরের কাছ থেকে আসার পর হৈমন্তী স্পষ্ট করে জানতে চেয়েছিল সব। তার ইচ্ছে ছিল না গগন যায়; গগন ঝোঁকের মাথায় চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে গগনের বোধহয় মনে হয়েছিল, সুরেশদা যা যা বলেছে অবিকল তা বলা হয়তো রূঢ় হবে। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছিল :তোর পক্ষে এখানে থাকার আর কোনও মানে নেই।
হৈমন্তীর না বোঝার কিছু ছিল না; সে অন্য কিছু আশাও করেনি। তবু গগনের এই ছুটে যাওয়া এবং ফিরে আসার মধ্যে যে-গ্লানি তাকে অপ্রসন্ন, অধোবদন করে রাখল।
তারপর একদিন এই ঘোরাঘুরি হচ্ছিল। গগন মনে মনে মুষড়ে ছিল, তবু মুখে হাসিখুশি নিয়ে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছিল; হৈমন্তী যে ঠিক কী ভাবছিল বোঝা যেত না–মুখ দেখে মনে হত তার উৎসাহ কিছু কম নয়।
মনে মনে দুই ভাইবোনে পরস্পরের কাছে কিছু যেন লুকোবার চেষ্টা করছিল। গগন বুঝি জানতে দিতে চাইত না, সুরেশ্বরের প্রত্যাখ্যানের মধ্যে কতটা নির্মমতা আছে; হৈমন্তীও যেন বুঝতে দিতে চাইত না, সে কতটা অসম্মানিত বোধ করছে, কী প্রচণ্ড গ্লানি এবং বিতৃষ্ণা। সম্ভবত ওরা দুজনে নিজেদের মনোভাব লুকোবার জন্যে তৃতীয় এমন কিছু চাইছিল, যা সাময়িকভাবে তাদের অন্যমনস্ক করে রাখে। ওরা হয়তো কেউই এটা চাইছিল না, এখানে এমন কিছু সহসা ঘটুক যাতে সুরেশ্বর এবং তাদের মধ্যেকার ব্যক্তিগত ব্যাপারটা অন্যদের চোখে কৌতূহল ও সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে। হঠাৎ তারা কলকাতা চলে যেতে পারে না, অবনীর সঙ্গে ঘুরে বেড়াবার সব ব্যবস্থা ঠিক করে এসে আজ আচমকা দুই ভাইবোনে, তা বাতিল করতে পারে না, তারা সুরেশ্বরকেও হয়তো বুঝতে দিতে চায় না, সুরেশ্বর তাদের মনের সুখ আনন্দ হাসিখুশি সব কেড়ে নিয়েছে। এমন কিছু যেন না হয় যা প্রকট, যা কুৎসিত, যার লজ্জা তাদের দুই ভাইবোনকে মাটিতে মেশায়। বরং এই ভাল, সুরেশ্বর দেখুক–তারা সৌজন্য ভোলনি, তারা কোথাও ইতরতা প্রকাশ করল না। তারা কলহ করল না–ক্রোধ বা তিক্ততা দেখাল না। এমনকী সুরেশ্বর এ কথাই মনে করুক, তারা স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করছে, বেড়াচ্ছে, আশ্রমে যাচ্ছে। কিছুই যেন হয়নি, বা যা হয়েছে তার গুরুত্ব যেন ওরা কেউ দিচ্ছে না।
ক্রিসমাসের আগের দিন দুপুরবেলায় গগনের হঠাৎ খেয়াল হল, সুরেশ্বর তাকে কোথায় যেন নিয়ে যাবে বলেছিল, কোন মেলায়।
হাসপাতাল থেকে ফিরে স্নান খাওয়া-দাওয়া শেষ করে হৈমন্তী বিশ্রাম করছিল। গগন এসে বলল, কী রে, ঘুমোচ্ছিস নাকি?
হৈমন্ত গায়ে লেপ টেনে কাত হয়ে শুয়ে ছিল, বালিশে তার মাথা, মুখ ওপাশে ফেরানো–দেখা যাচ্ছিল না। বালিশের পাশে একটা বই পড়ে আছে।
সাড়া দিয়ে হৈমন্তী বলল, না, ঘুমোইনি। বলল কিন্তু মুখ ফেরাল না। তার গলার স্বর উদাস, নিরাবেগ।
গগন জানলার দিকে গিয়ে দাঁড়াল একটু, ফিরে এসে রেডিয়োর সুইচ টিপল, নব ঘোরাল, সেতার বাজছিল, রেডিয়ো বন্ধ করল, আবার জানলার দিকে সরে এসে দাঁড়াল। এসবের মধ্যে প্রায়ই চোখ তুলে সে দিদিকে দেখছিল। হেম যেভাবে পাশ ফিরে শুয়েছিল সেইভাবেই শুয়ে আছে, গগন তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত গগন বসল, তুইও কি কাল মেলায় যাচ্ছিস?
হৈমন্তী মুখ না ফিরেই বিস্ময়ের গলায় জবাব দিল, কীসের মেলা!
কী জানি! তোদেরই তো জানার কথা…….তুই কি দেওয়াল দেখছিস? শেষের কথাটা ঠাট্টা করে বলা।
হৈমন্তী একটু চুপচাপ, তারপর পাশ ফিরে সোজা হয়ে শুল, কীসের মেলার কথা বলছিলি..?
আমি জানি না। সুরেশদা বলেছিল। ভাবলাম তুই জানিস। কোন মেলায় নাকি তোরা স্লাইড দেখাবি?
হৈমন্তী এবার বুঝতে পারল; সে যে ব্যাপারটা জানে তা নয়, তবে শুনেছে। বলল, তা মেলায় কী?
তুই যাবি নাকি?
না। আমি কেন যাব! হৈমন্তী যেন উপেক্ষার সঙ্গেই বলল, ওরা যাবে।
সুরেশদা আমায় যেতে বলেছিল। বিরাট নাকি মেলা মতন হয়: নাচ-ফাচ, গাধার পিঠে চড়া…
বলেছে তো চলে যা। হৈমন্তীর বলার ভঙ্গিটা ব্যঙ্গের মতন শোনাল।
দূর…র, আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই ওসব মেলা-ফেলায়।
তা হলে যাস না।
তাই ভাবছি। …মুশকিল কী জানিস, না বললে কী আবার ভাববে–তাই মহা ঝামেলায় পড়েছি।
হৈমন্তী কোনও জবাব দিল না। গগনের সঙ্কোচটা যে কোথায় এ যেন খানিকটা অনুমান করতে পারছিল সে।
মনের মধ্যে কোনও খুঁত খুঁত থাকলে যেভাবে মানুষ এলোমলো করে কথা বলে গগন সেইভাবে কথা বলল; বলার আগে শব্দ করল জিবের। একটা কিছু বলে দেব কী বল? শরীর ফরীর খারাপ বললেই হবে।
আমি কী বলব! হৈমন্তী ওপর দিকে চোখ তুলে বলল।
গগন কিছুক্ষণ আর কথা বলল না। তার মনে যেসব কথা ক্রমাগত আজ কদিন ধরে তাকে অস্বস্তি দিচ্ছিল, এবং যা বলে ফেললে তার স্বস্তি হত সেসব কথা বলতে না পারার জন্যে তার কোনও একরকম অশান্তি ছিল। সুরেশ্বরের সঙ্গও তার এখন কাম্য ছিল না। গগন সব সময় মাথা ঠাণ্ডা করে কথা বলতে পারে না, কী প্রসঙ্গে কোন কথা উঠবে, গগন মাথা গরম করে কী বলে ফেলবে–এইসব ভয় বা খুঁতখুঁতুনি তার ছিল। তা ছাড়া বাস্তবিকই তার ওই দেহাতি মেলায় যাবার আগ্রহ নেই।
