বরং আবির দিই একটু…।
আমি দেব, না তুমি এনেছ..
সুরেশ্বর হাসল, তুমিই দাও।
নির্মলা তার ঘরের কোন কোণ থেকে কাঠের পাউডার-কৌটোয় রাখা লাল আবির এনে দিল। আবিরের সঙ্গে গন্ধ মেশানো।
চশমাটা খোলো…সুরেশ্বর বলল।
মুখে দেবে নাকি? না না
কপালে দেব; চশমার কাছে পড়তে পারে। …
নির্মলা চশমা খুলে হাতে রাখল।
সুরেশ্বর আবিরের একটি ছোট টিপ পরিয়ে দিল, তারপর বলল, বাঃ! বেশ দেখাচ্ছে।
নির্মলা হেসে ফেলল। তোমায় একটু দিই, পায়ে দিই।
না; পা ছোঁবে না।
তুমি আমার চেয়ে বয়সে বড়, আমি ছোট; তোমার পায়ে হাত দিতে আমার লজ্জা নেই।
কপালে দাও।
নির্মলা শেষ পর্যন্ত অবশ্য পায়ে আবির দিল। দিয়ে অল্প একটু দাঁড়িয়ে থেকে দু-চারটে কথা বলে শেষে বলল, বসো, চা নিয়ে আসি।
নির্মলা চলে যাবার পরও যেন তার দুধের মতন সাদা শাড়ির, তার আঁচল চাপা এলো রুক্ষ চুলের, তার কপালের আবিরের ছোট টিপটির সৌন্দর্য এবং পবিত্রতা সুরেশ্বরের চোখে ভাসছিল।
হঠাৎ কেমন একটা অদ্ভুত, অবর্ণনীয় বীভৎস আতঙ্কের চিৎকার ভেসে এল। শব্দটা ঠাওর করে ছুটে যাবার আগে যা ঘটার ঘটে গেছে। বাড়ির রাঁধুনিদিদির নাবালিকা মেয়েটি রান্নাঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছে, তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে, আর রান্নাঘরে নির্মলা তখনও তার শাড়ি এবং চুলের আগুন নেভাবার চেষ্টা করছে।
হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় নির্মলা অজ্ঞান ছিল।
পরে দিন দুয়ের মাথায় তার জ্ঞান হয়েছিল; এই জ্ঞান কুয়াশাচ্ছন্নচেতনার। অবশিষ্ট কয়েকটি দিন নির্মলার ওই ভাবেই কেটেছে। কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, পারত না; অস্পষ্ট করে কিছু বলত, কিছু বলতে বলতে থেমে যেত। কয়েকটি দাহের জ্বালা যেন তার দুর্বল শীর্ণ দেহটিকে শববাহকের মতন বহন করে ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কাছে নিয়ে গেছে। কিন্তু এই সরল সমাপ্তির আগেই নির্মলা অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কী করে হয়েছিল সেটা রহস্য। হয়তো সেদিন রান্নাঘরে চাকরার সময় সে হঠাৎ তার চোখের সামনে সব আলো নিবে যেতে দেখে বিহ্বল হয়ে চলে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে শাড়ির আঁচলে আগুন ধরিয়ে ফেলেছিল, হয়তো সে দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতাবশত এবং অসতর্কতাহেতু শাড়িতে আগুন লাগিয়ে ফেলেছিল আগেই–তারপর সহসা আতঙ্কে তার স্নায়ু আহত হয়ে পড়েছিল, সেই আঘাত তার অতি দুর্বল দৃষ্টিশক্তির পক্ষে অসহ্য হয়ে পড়ে। অন্য কিছুও হতে পারে… কে জানে! নির্মলা মনে করে কিছু বলতে পারেনি। বলা যায় না হয়তো।
নির্মলার মৃত্যু সুরেশ্বরের পক্ষে দুঃসহ হয়ে পড়েছিল। কী যেন তাকে সর্বক্ষণ তাড়িত করে নিয়ে। বেড়াত; অন্তরের কোনও নিভৃত যন্ত্রণা ও প্রশ্ন তাকে ব্যাকুল ও বিভ্রান্ত করত; এই জীবন মূল্যহীন অর্থহীন মনে হত; কোনও সান্ত্বনা ছিল না। এমন নিঃস্ব, রিক্ত, শূন্য আর কখনও মনে হয়নি নিজেকে।
সুরেশ্বর বুঝি কিছু অন্বেষণের আশায় বিভ্রান্তের মতন কলকাতা ছেড়ে চলে যায় তারপর। কয়েক মাস পরে ফিরে আসে, আবার চলে যায়। এইভাবে তার কলকাতায় আসা-যাওয়া ছিল। প্রমথও আর কলকাতায় ছিল না। ক্রমে সুরেশ্বর কলকাতা ছাড়ল।
.
সুরেশ্বর যেন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে দেখতে জেগে উঠল, জেগে উঠে দেখল নির্মলা আর নেই। অন্ধ আশ্রমের ঘরে সে শুয়ে আছে, রাত কত বোঝা যায় না, টাইমপিস ঘড়িটার শব্দ বাজছে, নিকষ কালো অন্ধকার, পৌষের অসহ শীত তার ঘর জুড়ে বসে আছে।
.
২৩.
দেখতে দেখতে ক্রিসমাস এসে পড়ল।
এ কদিন গগনরা কাছাকাছি জায়গাগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। অবনী প্রায় নিয়মিত আসত, দুপুরের পর পর; নিজের অফিসের কাজকর্ম এবং হৈমন্তীর হাসপাতালের কথা ভেবে এই সময়টা সে ঠিক করে নিয়েছিল। কোনও অসুবিধে হত না হৈমন্তীর, সে যেতে পারত। ইতিমধ্যে ওরা শহরে গিয়েছিল। শহরটা কিছু কম পুরনো নয়, সেকালের মিশনারিদের বোধহয় খুব পছন্দ হয়েছিল জায়গাটা, ঢালাও স্কুল কলেজ আর চার্চ করেছে, এখনও তার যথেষ্ট গরিমা; চাঁদমারির দিকে সরকারি অফিস-আদালত, ওদিকটায় ছবির মতন পথঘাট কাঁকর ছড়ানো রাস্তা, দুপাশে গাছপালা, উঁচুনিচু মাঠ ময়দান, বাংলো বাড়ি। রিফরম্যাটরি স্কুল, বিহার গভর্নমেন্টের এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনসটিটিউট…এসবও আছে। শহরের একটা অংশ এই রকম, বাকিটা ঘিঞ্জি আর নোংরা, যত ধুলো তত মাছি।
আর একদিন যাওয়া হল সহদেও পাহাড়ে বেড়াতে। পাহাড়টা তেমন কিছু নয়, পাহাড়তলিটা চমৎকার। দূর থেকে দেখলে মনে হবে শাল আর মহুয়ার সবুজ জঙ্গল অঞ্জলিবদ্ধ হয়ে বৃক্ষলতাকীর্ণ পাহাড়টি উধ্বাকাশকে নিবেদন করছে। পাহাড়তলিতে হরিণ আর অজস্র বুনো পাখি।
তারপর গগনরা গেল রাম-সীতাকুণ্ড দেখতে। গরম জলের এই কুণ্ডের কাছে মেলা বসে পৌষের শেষে, মেলার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছিল।
এইভাবে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল গগনরা। এমনকী একদিন রিজার্ভ ফরেস্টও বেড়িয়ে এল রাত করে। সেদিন বিজলীবাবুও সঙ্গে ছিলেন। বিজলীবাবুকে গগন যেন আলাপে চিনত, আসল মানুষটিকে জানত না। সেদিন জানল। জেনে বিজলীবাবুর পরম ভক্ত হয়ে গেল, এমন রসিক-মানুষ বড় একটা তার চোখে পড়েনি। বিজলীবাবু অচিরেই তার বিজলীদা হয়ে গেল।
যদিও গগন ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিল, মুখে হাসিখুশি ছিল, তবু মনে তার বিন্দুমাত্র সুখ ছিল না। এখানে আসার প্রধান উদ্দেশ্য তার ব্যর্থ হয়েছে। আসার পর তার যদি বা সন্দেহ হয়েছিল, তবু দিদির কথাবার্তা এবং মনোভাব থেকে সে দিদিকে যতটা বুঝেছিল সুরেশদাকে ততটা নয়। দিদি কী বলছে না বলছে এটা কলকাতায় ফিরে গিয়ে মাকে বলার জন্যে সে আসেনি, সেটা অর্থহীন হত; সুরেশদার কী বলার আছে তা জানতেই এসেছিল। এখন তার সবই জানা হয়ে গেছে। কলকাতায় ফিরে মাকে কীভাবে কথাটা বলবে সে বুঝতে পারছিল না। বেচারি মা একেবারে ভেঙে পড়বে।
