মার দুঃখ যেন অত্যন্ত ব্যক্তিগত, অসাধারণ রূপ ছিল অথচ মা তার স্বামীর অনুরাগ ও সাহচর্য পায়নি, মা অবজ্ঞা পেয়েছে। এই দুঃখ মা পেত না যদি বাবা মার ওপর অনুরক্ত হতেন। আর সমস্ত দুঃখই একজনের বঞ্চনা থেকে এসেছে।
বাবা ঠিক দুঃখী নয়, হতভাগ্য। বাবার কোনও দুঃখবোধ ছিল না, বা বাবাকে দেখলে দুঃখ পাবার কারণও ছিল না। অনাচারী মানুষকে দেখলে যে ধরনের করুণা হতে পারে বাবাকে দেখলে বড় জোর সেই রকম করুণা হত।
এক সময় হেমকেও দুঃখী মনে হত সুরেশ্বরের : যখন হেম অসুস্থ, যখন হেম হাসপাতালের বিছানায় অসহায় হয়ে পড়ে ছিল। সেসময় হেমের বিবর্ণ খড়িমাটি ওঠা চেহারা, তার কোটরগত করুণ দুটি চোখ দেখলে সুরেশ্বর ব্যাকুল ও অভিভূত হত। এত অল্প বয়সে ভয়ংকর এক ব্যাধি তার জীবনীশক্তিকে তিলে তিলে শুষে নিচ্ছে–এই চিন্তা সুরেশ্বরকে কাতর ও পীড়িত করেছিল। তার মনে হয়েছিল : এ-ভাবে জীবনের অপচয় ঘটতে দেওয়া অর্থহীন। হেমকে নীরোগ করে তোলা তার কর্তব্য বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু হেমের অসুস্থতা, তার রোগশয্যা, অসহায় ও দুঃখ, সুরেশ্বরকে বৃহৎ কোনও বেদনার সঙ্গে পরিচিত করায়নি। তার কখনও মনে হয়নি, হেম সাংসারিক রোগশোকের ভোগ ছাড়া আর কিছু ভোগ করছে। তারপর হেম সুস্থ হয়ে গেল। তার আরোগ্যলাভের পর হেমের দুঃখের চেহারাটা ধুয়ে গেছে। এক সময় কিছু ময়লা পড়েছিল, এখন তা পরিষ্কার হয়ে স্বাভাবিক মানুষটি ফুটে উঠেছে এর বেশি কিছু হেমকে দেখে মনে হয় না।
নির্মলার মধ্যে যে-বেদনা তা যেন তার ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়। সুরেশ্বর বুঝতে পারত না কিন্তু অনুভব করত, নির্মলা যেন মানুষের এমন একটি অবস্থাকে ইঙ্গিত করছে যার ওপর তার কোনও হাত নেই। আয়ত্তাতীত এই অদৃষ্ট, অথবা সেই পরিণতি যাকে রোধ করার ক্ষমতা মানুষের নেই–নির্মলা যেন সেই পরিণতির অসহায়তা প্রকাশ করছে। শেষাবধি মানবজীবন মৃত্যুর কাছে পরাজিত, ভাগ্যের কাছে তার সমস্ত উদ্যম মিথ্যা হয়ে যেতে পারে, এই মুহূর্তের সুখ পরমুহূর্তে বিষাদ হতে পারে। শৃঙ্খলাহীন, যুক্তিহীন, স্বৈরাচারী নির্মম কি যেন এক আছে। তার কাছে জীবনের সমস্ত কিছুই যেন আকস্মিক, অর্থহীন। দুঃখ বই জীবনে বস্তুত কিছু নেই, যন্ত্রণা ও ক্ষোভ বিনা মানব-ভাগ্যের অন্য পরিণতি নেই।
সুরেশ্বরের মনে ক্রমশ এক নৈরাশ্য দেখা দিতে শুরু করেছিল। নিরর্থক জীবনধারণ, অস্থায়ী এই সুখ, অকারণ এই আত্মরক্ষার কী যে প্রয়োজন সে বুঝে উঠতে পারত না। অথচ এই নৈরাশ্য সুরেশ্বরের স্বভাবজাত নয়। সে অদৃষ্টবাদী ছিল না। নির্মলার বেদনা তার মনে এই নৈরাশ্য কেমন করে সংক্রামিত করছিল সে জানে না, কিন্তু নির্মলার কোথাও নৈরাশ্য ছিল না। নির্মলার সহিষ্ণুতা, ধৈর্য এবং বিশ্বাস মাঝে মাঝে সুরেশ্বরকে এত বিচলিত করত যে সে ক্ষুব্ধ ও অপ্রসন্ন হত।
তুমি সব বুঝেও বোঝো না, নির্মলা বলত, আমাদের দুটো হাত, সবদিকে লড়াই করা যায়, যায় না।
তবে তো সংসারে আমরা খুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকতে পারি।
না, তা পারি না।
কেন? …
জানি না। সাধ্য আর অসাধ্য বলে দুটো কথা আছে। ..যা অসাধ্য তা না করতে পারলে আমার দুঃখ হয় না।
সুরেশ্বর যে এইসব সহজ কথাগুলো না বুঝত এমন নয়, বুঝেও কোনও মানসিক চাঞ্চল্যের জন্যে অকারণে ক্ষোভ প্রকাশ করত। সে বুঝতে পারত, এতকাল তার জীবনের যেদিকে গতি ছিল, এখন সেদিকে তার জীবন বইতে পারছে না। প্রকৃতপক্ষে সে অকর্মণ্য, অকারণ জীবন যাপন করে যাচ্ছিল। তার জীবনের প্রয়োজন অথবা অর্থ সম্পর্কে তার কোনও জিজ্ঞাসা ছিল না। কখনও আবেগ, কখনও অভ্যাসবশে, কখনও স্বাভাবিক দুর্বলতায় সে গা ভাসিয়েছে। কখনও স্বার্থ, কখনও অহঙ্কার, কখনও সামাজিক লোকলজ্জায় সে উদার হয়েছে। কিন্তু এর কিছুই তার অন্তরের নয়। জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক যেন নিরপেক্ষ দর্শকের, সক্রিয়তার নয়।
মানসিক এই অশান্তি এবং চাঞ্চল্যের সময় সুরেশ্বর একদিন নির্মলার বিদায়পর্বটা নির্বোধ, অক্ষম পশুর মতন লক্ষ করল।
সেদিন দোল পূর্ণিমা, সারাদিন কলকাতার পথে রঙের ছড়াছড়ি গেছে, লাল বেগুনি নীলের ছোপ ধরা রাস্তা, বাতাসে ফাগের ডো উড়ছে, ছেলেমেয়েগুলোর মাথার চুল রুক্ষ, গালে-গলায় রঙের ছোপ, বাড়ির দেওয়ালে পানের পিচের মতন বিচিত্র রং সব ছিটোনো, বিকেলে চৈত্রের বাতাস বইতে শুরু করল, চাঁদ টলটল করে ফুটে উঠল আকাশে।
সুরেশ্বর হেমদের বাড়ি হয়ে প্রমথদের বাড়ি পৌঁছল যখন তখন সন্ধেরাত। প্রমথ ঘরে বসে তার কলেজের কজন বন্ধুর সঙ্গে হা হা করে গল্প করছে, ঘরের মধ্যে অট্টনোল।
নির্মলা বলল, এসো, তুমি বরং আমার ঘরে বসো; ওঁরা একটু পরেই চলে যাবেন।
সুরেশ্বর প্রমথকে মুখ দেখিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে বসল।
নির্মলা দুধ-সাদা খোলের শাড়ি পরেছিল, পাড়টা ছিল কালোর ওপর মুগা করা। নির্মলা কোনও কালেই যত্ন করে চুল বাঁধত না, কোনও রকম খোঁপা জড়িয়ে নিত, সেদিন বুঝি মাথা ঘষে ছিল, রুক্ষ চুল তার পিঠময় ছড়ানো, শাড়ির আঁচলে চাপা দেওয়া।
সুরেশ্বর বলল, ব্যাপার কী, আজকের দিনে এরকম সাদা শাড়ি?
ব্যাপার আবার কী, পরেছি। কেন?
আজকে সাদা কিছু দেখলেই হাত কেমন করে…
রং দেবে! দাও!
