জীবনে এই ধরনের আনন্দের সঙ্গে সুরেশ্বরের পূর্বপরিচয় ছিল না। বাল্যাবধি সে যাদের মনে করতে পারে বাবা, মা, বিনুমাসি–কেউই তার কাছে আনন্দের মূর্তি নয়। বাবা তার কাছে সব সময়েই নিরানন্দ ও বিতৃষ্ণার–এমনকী করুণার পাত্র ছিল। মা ছিল দুঃখের মূর্তি; অবজ্ঞাত বলে মার মধ্যে অভিমানের বেদনা পুঞ্জীভূত হয়ে ছিল; মার কোথাও আনন্দ ছিল না, মা তাকে আনন্দ বিলোতে পারত না। মার মধ্যে একটা জলুস ছিল, এই জলুস মার অহঙ্কার। সুরেশ্বর আবাল্য আনন্দ দেখেনি, আনন্দ জানেনি–এই যেন প্রথম দেখছে নির্মলার মধ্যে।
হেমের কথা তার এ সময় খুব মনে হত। হেমের বাড়ি তার আসা-যাওয়াও ছিল। হেম বেশ সুন্দর হয়ে উঠেছিল, ডাক্তারি পড়ছিল। হেমের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথাও সুরেশ্বর চিন্তা করত। হেম যে মাত্র সে-দিনও তার কাম্য বস্তু ছিল, সুখ ছিল–এ কথা সে অস্বীকার করতে পারত না। হেমের প্রতি তার মমতা ও স্নেহ কোনও অংশে কমেনি। কিন্তু সুরেশ্বর হেমের মধ্যে কোনও গভীর আনন্দ খুঁজে পেত না। কিংবা বলা ভাল, নির্মলার মধ্যে যে আনন্দ পাওয়া যেত, হেমের মধ্যে তা ছিল না। কেন ছিল না, কেন সুরেশ্বর হেমের মধ্যে তার আনন্দ পেত না–সে জানে না।
এ সময় কলকাতায় থাকলেও সুরেশ্বর হেমদের বাড়ি আসা-যাওয়া ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছিল। যেন তখন সে কোনও দ্বিধার মধ্যে পড়েছে। বুঝতে পারত না তার এই দ্বিধার যথার্থ কারণ কী? অথচ হেমের প্রতি তার মমতা বা স্নেহ হ্রাস পায়নি।
নির্মলার কাছে হেমের কথা মাঝে মাঝে গল্প করত সুরেশ্বর। হেমের অসুখ, তার হাসপাতালে থাকা, আরোগ্যলাভ, লেখাপড়া–এই সব গল্প। নির্মলা সহানুভূতির সঙ্গে শুনত, শুনতে শুনতে হেম যেন নির্মলার অতিপরিচিত হয়ে উঠেছিল।
সুরেশ্বর বলত, হেমকে একদিন এ বাড়ি নিয়ে আসবে। কিন্তু আনা হত না।
মাঝেমধ্যে নির্মলাই তাগাদা দিত, কই, হেমকে তো আনলে না?
আনব। …পড়াশোনা নিয়ে খুব ব্যস্ত দেখি।
একদিন তো আনতে পার।
তা পারি।
আমার কী মনে হচ্ছে জানো–?
কী?
আনতে তোমার ইচ্ছে নেই।
না, ইচ্ছে নেই যে তা নয়, তবে……আনব একদিন…।
তুমি ভাবছ, আমি তাকে ভাল করে দেখতে পাব না? ঠিক পাব। নির্মলা যেন স্নিগ্ধ কৌতুক করল।
সুরেশ্বর ভেবেচিন্তে আস্তে করে বলল : তুমি পাবে, হেম হয়তো পাবে না।
এমন করেই দিন কাটছিল। সুরেশ্বর সেবার পুজোর সময় দেশে যাবে ঠিক করল। অনেক দিন দেশবাড়ি যাওয়া হয়নি, ঘরদোরের অবস্থা কেমন হয়ে আছে কে জানে, দেশ থেকে হালদারমশাই চিঠি লেখেন, তাগাদা দেন যাবার জন্যে, যাওয়া হয়ে ওঠে না।
প্রমথকে বলল সুরেশ্বর, এবার পুজোর সময় আমাদের ওখানে চলো।
চলো, ভালই হবে।
চিঠি লিখে দিচ্ছি তা হলে!
দাও। তোমাদের বাড়িতে সাপখোপ আর সিঁড়ি বেশি নেই তো?
সুরেশ্বর অবাক। কেন? হঠাৎ সাপখোপ আর সিঁড়ির দুশ্চিন্তা হল কেন?
সাপখোপে আমার ভীষণ ভয়– প্রমথ হাসতে হাসতে বলল, আর সিঁড়িওলা বাড়িতে নির্মলাকে নিয়ে থাকতে ভয় হয়।
সাপখোপের দুশ্চিন্তা সুরেশ্বরের হয়নি, কিন্তু সিঁড়ির দুশ্চিন্তা হয়েছিল। নির্মলার কথা ভেবে যাওয়ার ব্যবস্থাটা হয়তো সে বন্ধ করত, নির্মলা হতে দেয়নি।
পুজোর সময় দেশে গিয়ে সুন্দর লেগেছিল। অত বড় বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে, নীচের মহলে একটা প্রাইমারি স্কুল বসেছে, ঠাকুরদালান অব্যবহৃত, জঞ্জাল জড়ো হয়েছে অনেক। তবু হালদারমশাই যথাসাধ্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিয়েছিলেন। দোতলায় ওরা থাকত। পুবের জানলা খুললে নদীর চর আর আদিগন্ত মাঠ দেখা যেত। সেই আমবাগান আর ছিল না। রথতলার মাঠ তখনও ছিল।
নির্মলাকে ধরে ধরে ছাদে নিয়ে যেত সুরেশ্বর। ছাদের সিঁড়িটা বরাবরই কেমন ছোট ও অন্ধকার মতন ছিল। ছাদে এসে নির্মলা হাত ছাড়িয়ে নিত; ধীরে ধীরে পায়চারি করত, সকাল অথবা বিকেলের বাতাস তার খুব পছন্দ ছিল। নদীর চরে বেড়াতে নিয়ে যেত নির্মলাকে, মাঠের সবুজের দিকে তাকাতে বলত, আকাশের দিকে চোখ তুলে সাদা ভাসন্ত মেঘ দেখতে বলত। দৃষ্টিশক্তিকে যতদূর সম্ভব ছড়িয়ে দেবার জন্যে নির্মলার ব্যগ্রতা অপেক্ষা সুরেশ্বরের ব্যর্থতা ছিল বেশি। ক্ষণে ক্ষণে সে আঙুল তুলে কাছের কিছু দেখাত; ওটা কী গাছ বলো তো? বক দেখতে পাচ্ছ ওখানে, পাচ্ছ না? তোমার পায়ের কাছে ফড়িংটা ধরো…
নির্মলা এক একদিন বলত, তোমার ডাক্তারিতে আমি মরে যাব।
ডাক্তারি কোথায়! এসব তো চোখের পক্ষে ভাল।
মাঝে মাঝে আমি ভাবি, আমার চোখ দুটো যেন তোমার, নিজের চোখ নিয়েও মানুষ বোধহয় এত করে না…
সুরেশ্বর কোনও জবাব দিত না।
একদিন নির্মলা সন্ধেবেলায় ছাতে বসে কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলল, আমি কতদিন তারা দেখি না, তারা দেখতে বড় ইচ্ছে করে…।
প্রমথ আপনমনে গান গাইছিল, গান থামিয়ে বলল, আজ তারা নেই। চাঁদের খুব আলো, কাল পূর্ণিমা। তার কথা থেকে যেন মনে হবে, আকাশে তারা নেই বলে নির্মলা দেখতে পাচ্ছে না, তারা থাকলেই দেখতে পেত।
এমন কিছু কথা নয়, তবু সুরেশ্বর কোথায় যেন এক বুকভাঙা বেদনা অনুভব করল। এত বড় বিশ্ব, মাথার ওপর অনন্ত আকাশ, এই চাঁদের আলো-সব যেন মলিন ও অর্থহীন মনে হল। সুরেশ্বর পরে বলল, নীচে যাওয়া যাক হিম পড়ছে যেন।
আনন্দের মতন নির্মলা সুরেশ্বরের কোনও বেদনারও উৎস ছিল। জীবনের নানা দুঃখের সঙ্গে সুরেশ্বরের বাল্যাবধি পরিচয়। তার বাবা, মা, বাবার উপপত্নী, বিনুমাসি, এমনকী হেম সংসারের কোনওনা-কোনও দুঃখের ছবি। এরা যে দুঃখী–তাতে সুরেশ্বরের সন্দেহ নেই। এদের দুঃখ সুরেশ্বর বোঝে। কিন্তু তার মনে হয় না, সেই সব দুঃখ আর নির্মলার মধ্যে যে বেদনার উৎস আছে তা এক।
