একবার, রাঁচির দিকে বেড়াতে এসে হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল নির্মলার। ডান দিকের চোখে দুদিন প্রায় কিছু দেখতে পেল না। তৃতীয় দিনে নির্মলার পক্ষে স্বাভাবিক দৃষ্টি ক্রমে ফিরে আসতে লাগল। প্রমথ বিচলিত হয়ে পড়েছিল, সুরেশ্বর আরও বেশি বিচলিত, শঙ্কিত। সে চেয়েছিল কলকাতায় ফিরে যেতে। নির্মলা রাজি হয়নি।
কয়েক দিনের মধ্যে মোটামুটি সুস্থ হয়ে ওঠার পর নির্মলা একদিন বলল : তুমি নাকি বলছ, কলকাতায় গিয়ে চোখটা অপারেশন করিয়ে নিতে?
সেই রকমই তো শুনেছিলাম, প্রমথ বলে–কোন ডাক্তার যেন বলেছেন অপারেশন করে একবার চেষ্টা করা যেতে পারে…
আগেও দুবার হয়েছে…কই কিছু তো হয়নি…
তবু…
তোমার খুব ভয়, না?
হ্যাঁ, চোখ চলে গেলে তোমার কী থাকবে?
আমার চোখ দুটোই কি আমি?
সুরেশ্বর অবাক হয়ে নির্মলার দিকে তাকিয়ে ছিল : কথাটা বুঝেও যেন বুঝছিল না।
নির্মলা ধীরে ধীরে বলল, আমার এই হাত দুটো, কিংবা শুধু এই মুখ, এই চোখ যদি আমি হই তবে সে আমি কিছু না। … তুমি সেই গল্পটা জানো না?
নির্মলা এক রাজা আর সন্ন্যাসীর গল্প বলেছিল, রাজা এসেছিলেন একা এক সন্ন্যাসীর আশ্রমে মৃগয়াক্লান্ত হয়ে। সন্ন্যাসী যথোচিত রাজসম্মান প্রদর্শন করেননি, কেননা তিনি রাজাকে চিনতে পারেননি। এই অপরাধে রাজা সন্ন্যাসীকে রাজসভায় ডেকে পাঠালেন। সেই সভায় রাজা এবং সন্ন্যাসীর মধ্যে পরিচয় নিয়ে কূট তর্ক হল। সন্ন্যাসী বলেছিলেন : হে রাজন, যদি আপনার কর্তিত একটি বাহু পথে পড়ে থাকে কেউ কি সেই বাহুকে রাজন বলে সম্বোধন করবে? যদি আপনার বিচ্ছিন্ন পদযুগল নদীর জলে ভেসে যায় আপনার কোন প্রজা তাকে চিনে নিতে পারবে? আপনার রথের অশ্ব কি আপনি? আপনার রাজদণ্ড কি আপনি? সর্ব পরিচয়যুক্ত হলেই আপনার পরিচয়, অন্যথা আপনার কোনও পরিচয় নেই। আমার আশ্রমে আপনি রাজবেশে রাজরথে অমাত্যদল নিয়ে উপস্থিত হননি। আমার ভ্রম হয়েছিল। এই ভ্রম সত্য ও স্বাভাবিক।
গল্প বলা শেষ করে নির্মলা বলল, আমার চোখ দুটো চিরকাল থাকবে না। সুরেশ্বর কোথাও যেন পরাস্ত হয়েছিল, তবু বলল, চিরকাল কিছুই থাকে না। জানি। তবু আজীবন কিছু কি থাকে না?
কী থাকে?
থাকে। তুমি ভেবে দেখো কী থাকে?
একটা কথা বলবে?
কী কথা?
তোমার ভয় করে না? চোখ হারালে তোমার কতখানি যাবে তা ভেবে দুশ্চিন্তা হয় না?
নির্মলা মাথা নাড়ল, এক সময় হত। এখন বোধহয় সহ্য হয়ে গেছে। বলে সামান্য থেমে হাসির মুখ করে বলল, সংসারে কতশত অন্ধ আছে, বলো! তারাও তো রয়েছে।
তারাই তোমার ভরসা?
তোমরাও আমার ভরসা।
আমরা যদি না থাকি?
আমি তর্ক করতে জানি না। এত বড় জগতে কেউ না কেউ থাকবে।
ভগবান নাকি?
ভগবানে আমার ভক্তি আছে। মানুষেও আমার বিশ্বাস আছে। …সেদিন পার্ক থেকে তুমি তো আমার হাত ধরে নিয়ে এসেছিলে। কেন এনেছিলে?
সুরেশ্বর কোনও জবাব দিতে পারেনি।
রাঁচির সেই সাময়িক দৃষ্টিহীনতাকে কাটিয়ে উঠলেও পরের বছর এক বসন্তের সন্ধ্যায় কী যেন ঘটে গেল।
.
২২.
পরের বছর যা ঘটল তার সঙ্গে রাঁচির ঘটনার সম্পর্ক হয়তো ছিল, কিন্তু বোঝা যায়নি। কলকাতায় ফিরে প্রমথ নির্মলাকে তাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি নির্মলার চোখে কোনও নতুন। উপসর্গ খুঁজে পাননি। রাঁচিতে যা ঘটেছিল তা এতই বিচিত্র ও সাময়িক যে তার কোনও চিহ্ন আর ছিল না।
প্রমথ নিশ্চিন্ত হল।
নির্মলা যেন সামান্য পরিহাস করেই সুরেশ্বরকে বলল, দেখলে…!
পরিহাসের কারণ অবশ্য ছিল। রাঁচিতে থাকতে সুরেশ্বরের কেমন একটা সদা-আতঙ্কের ভাব হয়েছিল। তার আচরণ দেখলে মনে হত, যে-কোনওদিন, যে-কোনও সময় নির্মলার চোখের শেষ দৃষ্টিশক্তিটুকু ফুরিয়ে যাবে এ দুশ্চিন্তায় সে শঙ্কিত হয়ে আছে। নির্মলা কাছে থাকলে সুরেশ্বর এমনভাবে তাকে লক্ষ করত, মনে হবে প্রতি মুহূর্তে সে নির্মলার নতুন কোনও অস্বাচ্ছন্দ্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করছে। নির্মলা পথে বেরুলে সুরেশ্বর তার পাশে পাশে ছায়ার মতো থাকত, মনে হত যেন কোনও পঙ্গু শিশুকে সে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি সকালে ঘুম থেকে উঠে যতক্ষণ না নির্মলার গলা শুনত ততক্ষণ আড়ষ্ট ও সন্ত্রস্ত হয়ে থাকত, ঘরের বাইরে আসত না।
রাঁচি থেকে কলকাতায় ফিরে সুরেশ্বরের এই সদাশঙ্কিত অবস্থাটা কাটল। অথচ তখনও তার আচরণে উদ্বেগ ভাবটা ছিল।
একদিন কি কথায় যেন নির্মলা বলল, তোমার মতন মানুষ আমি দেখিনি।
কেন?
দাদাকে কী বলেছ?
কী বলেছি।
ঘড়ির কাঁটা দেখতে আমার ভুল হয়।
সেদিন হয়েছিল।
না, কাঁটা দেখতে হয়নি; বলতে ভুল হয়েছিল। আমি অন্যমনস্ক ছিলাম।
তবে আমারই ভুল। …
তোমার স্বভাবে আগে এসব ছিল না। আজকাল যেন কেমন অস্থির-অস্থির ভাব হয়েছে।
হয়েছে নাকি! … মানুষ বদলায়।
সুরেশ্বর হাসত। সুরেশ্বর যে বদলাচ্ছিল এটা হয়তো তারও জানা ছিল।
এই সময় সুরেশ্বর নিত্য অনুভব করতে শুরু করেছিল, নির্মলা তার কাছে এই আশ্চর্য আনন্দ ও অদ্ভুত বেদনার মিশ্রণ। এই আনন্দের কোনও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সে করতে পারত না। তার মনে হত, এ-আনন্দ অবারিত, স্ফুর্ত; সে ভেবে দেখতে, নির্মলা তার দেহ ও মন নিয়ে যতটুকু সীমিত, যদি সেটা তার স্থূল অস্তিত্ব হয়–তবে এই অস্তিত্বের বাইরেও নির্মলার এক আনন্দ-স্পর্শ আছে; যেমন জ্যোৎস্নালোকের থাকে। সুরেশ্বর একদা এই ধরনের এক স্বপ্নও দেখেছিল : দেখেছিল, সে যেন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, আশেপাশে কোথাও নির্মলা নেই, তবু তার নির্মলার কথা মনে হচ্ছিল, এবং সে নির্মলাকে মনে মনে খুঁজছিল। হঠাৎ সে নিজের সর্বাঙ্গে জ্যোৎস্নালোক অনুভব করল, তার খেয়াল ছিল না যে জ্যোৎস্নার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ তুলে সুরেশ্বর চাঁদ দেখতে গেল, আড়ালে কোথাও বুঝি চাঁদ ছিল, দেখা গেল না। সহসা তার চারপাশে সে নির্মলার উপস্থিতি অনুভব করল, মনে হল নির্মলা কোনও অলৌকিক শক্তিবলে চাঁদের কিরণ হয়ে তার চতুর্দিকে বিরাজ করছে।
