প্রমথ তার পরিচয় দিল। যৎসামান্য পরিচয়। বেসরকারি কলেজে পড়ায়, থাকে কাছাকাছি এক ভাড়াটে বাড়িতে। গলির মধ্যে। বিপত্নীক, সংসারে আত্মীয়-পরিজন বলতে এই বোন।
জল ঠেলে গলির মধ্যে রিকশা ঢুকল। বাতি জ্বলছে কি জ্বলছে না। চারপাশ চাপা, আকাশে তখনও মেঘ ডাকছে, দুঃসহ গরমটা বৃষ্টির জলে যেন ধুয়ে গেছে।
ঘরে এনে বসাল প্রমথ। সুরেশ্বর রিকশায় ওঠার সময় প্রথম যা আপত্তি জানিয়েছিল তারপর আর আপত্তি জানায়নি। ঠিক যে কী হয়েছিল সুরেশ্বর জানে না, কিন্তু কোনও অদ্ভুত আকর্ষণবশে অথবা কৌতূহলে সে প্রমথদের সঙ্গে চলে এসেছিল। এই আকর্ষণ কীসের, অথবা তার কৌতূহল কতটা যুক্তিযুক্ত সে কথা তখন ভাবেনি।
আকস্মিকভাবে যা ঘটেছিল সাধারণভাবে তা শেষ হতে পারত। পার্কের উলটোদিকের সেই লন্ড্রিতে দাঁড়িয়ে, কিংবা রাস্তায় নেমে, এমনকী রিকশাতে যেতে যেতেও সৌজন্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রমথ এই তুচ্ছ ঘটনার সমাপ্তি ঘটাতে পারত। ঘটালে তাকে দোষ দেওয়ার কিছু থাকত না। কিন্তু প্রমথ তা দেয়নি। সদালাপী, সরল মানুষ ছিল প্রমথ, তার চরিত্রে সুহৃদজনোচিত আন্তরিকতা ছিল। বয়সে সুরেশ্বরের চেয়ে কিছু বড় হলেও প্রমথ চরিত্রমাধুর্যে সুরেশ্বরকে বন্ধুর তুল্য করে নিয়েছিল। কিন্তু উভয়পক্ষের পরিচয় ক্রমশ যে ঘনিষ্ঠতায় দাঁড়ায় তার মূলে সম্ভবত নির্মলার আকর্ষণই ছিল প্রধান।
জীবনের কিছু সরল সাধারণ নিয়ম অনুসারে নির্মলা কোনও যুবকের আকর্ষণের বস্তু হতে পারে না। নির্মলার বাহ্য কোনও রূপ ছিল না। তার গায়ের রং ময়লা, শরীর শীর্ণ লতার মতন ক্ষীণ, সে দুর্বল ও শিশুর মতন অসহায় ছিল। শাঁখের মতন লম্বা মুখ, দীর্ঘ কপাল, সরু চিবুকে রূপের এমন কিছু কারুকার্য ছিল না যা দৃষ্টিকে নিষ্পলক করতে পারে। নির্মলা পুরু কাচের চশমা পরত, চশমার তলায় তার চোখের পাতা মোটা দেখাত, মনে হত চোখ বুজে আছে। ওর চোখের মণির রং ছিল ধূসর, নির্মলা প্রায় সব সময়ই আনত-চোখে তাকাত, যেন এই আলো বড় প্রখর, তার চোখে সহ্য হচ্ছে না।
নির্মলার রূপ ছিল না, কিন্তু আশ্চর্য এক সৌন্দর্য ছিল। এই সৌন্দর্য তার শরীরে নয় এটা বোঝা যেত, কিন্তু বোঝা যেত না ঠিক কোথায় এই সৌন্দর্য আছে। কৃষ্ণপক্ষের দুর্বল চাঁদের আলোর মতন একটি আভা যেন তার ময়লা গায়ের রঙে মেশানো থাকত, এবং কখনও কখনও মনে হত, এই আভা বুঝি কোনও নিভৃত স্থান থেকে উৎসারিত হচ্ছে। নির্মলার শঙ্খসদৃশ মুখ কখনও কখনও এমন একটি বেদনা সঞ্চার করত যা হৃদয়ের কোনও অজ্ঞাত স্থানে অনুভব করা যেত, অথচ তাকে ব্যক্ত করা যেত না। সুরেশ্বর অনেক দিন বোঝেনি নির্মলার প্রতি তার আকর্ষণ কেন। পরেও যে বুঝেছিল তা নয়–তবু একটা ধারণা হয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, নির্মলা কখনও তার অদৃষ্টের কথা বলত সহিষ্ণুতার, এ সংসারে মানুষের যে নির্দিষ্ট নিয়তি–সেই বেদনাদায়ক স্থির পরিণতির জন্যে সে অপেক্ষা করে আছে, অথচ তার আচরণে ক্ষিপ্ততা অথবা ভীতি নেই; নির্মলা কখনও তার অদৃষ্টের কথা বলত না। সুরেশ্বরের কেন যেন মনে হত, নির্মলার পক্ষে এতটা সহিষ্ণুতা অনুচিত।
প্রমথ বলেছিল, নির্মলা ক্রমশ অন্ধ হয়ে আসছে, শেষ পর্যন্ত অন্ধ হয়ে যাবে।
ঠিক কী কারণে নির্মলার চক্ষুরোগ দেখা দিয়েছিল–এ কথা কেউ বলতে পারেনি। নানা মুনির নানা মত ছিল। শিশুকাল থেকেই নির্মলার চোখে কষ্ট ছিল, বয়স বাড়ার পর সেটা ব্যাধি হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম প্রথম সাধারণ চিকিৎসা ও চশমা পরিয়ে ব্যাধিটাকে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে আরও নানা রকম চিকিৎসা হয়েছে, প্রমথ সাধ্যাতীত চেষ্টা করেছে, কিন্তু এই ব্যাধির কোনও প্রতিকার হয়নি। এখন প্রমথ নিরুপায়, শুধু অক্ষমের মতন অপেক্ষা করে আছে। বস্তুত তার কিছু করার ছিল না, এক শুধু বোনকে আগলে আগলে রাখা ছাড়া, আর ছুটিছাটায় নির্মলাকে সঙ্গে করে বাইরে বেড়াতে যাওয়া ছাড়া। প্রমথ প্রায় প্রত্যেকটি ছুটিতে নির্মলাকে সঙ্গে করে বেড়াতে বেরুত। কে যেন তাকে বলেছিল, বাইরের খোলামেলা আকাশ বাতাসে নির্মলা সাময়িক একটা উপকার পেতে পারে। উপদেশটা প্রায় সংস্কারের মতন প্রমথকে ভর করেছিল। ছুটি পেলেই সে নির্মলাকে নিয়ে বাইরে ছুটতে চাইত। নির্মলা বাইরে যেতে ভালবাসত, তবে দাদার বাড়াবাড়ি তার শরীরে সইত না। প্রমথর ইচ্ছে ছিল, সে কলকাতা ছেড়ে বাইরে কোথাও চলে যায় চাকরি নিয়ে, নির্মলার পক্ষে সেটা উপকারের হবে; কিন্তু তার ভয় ছিল বাইরে হঠাৎ কোনও গণ্ডগোল ঘটলে নির্মলার চিকিৎসা সম্ভব হবে না, বরং কলকাতায় সেটা সম্ভব; কলকাতায় তাদের পুরনো ডাক্তার ছিল। প্রমথ এই দোটানায় পড়ে মতিস্থির করতে পারত না।
সুরেশ্বর এ সময় প্রমথদের সঙ্গে বাইরে যেতে শুরু করেছিল। কখনও কখনও এমনও হয়েছে, সুরেশ্বর প্রথমে যায়নি, ওরা চলে গেছে, তারপর কয়েক দিন যেতেই সুরেশ্বর ওদের কাছে এসে পড়েছে। নির্মলার ওপর সুরেশ্বরের যে দুর্বলতা জন্মে গিয়েছিল তা ভালবাসা কি না স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। হয়তো ভালবাসা, হয়তো এমন কোনও অনুরাগ যা ব্যাখ্যা করে বলা যায় না।
নির্মলা জানত, তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে, অবশেষে সে অন্ধ হয়ে যাবে। এ নিয়ে তার যেন আর কোনও উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা ছিল না। সুরেশ্বর ঠিক এভাবে নির্দিষ্ট ও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি মেনে নিতে পারত না। সে অস্থির ও কাতর হত, ক্ষোভ প্রকাশ করত প্রমথর কাছে।
