সুরেশ্বর অপলকে, নিশ্বাস প্রশ্বাস স্তব্ধ করে নির্মলাকে যেন দেখল। নির্মলার সেই শীর্ণ, নিবন্ত প্রদীপের শিখার মতন অনুজ্জ্বল, বিষণ্ণ মূর্তিটি বুঝি সুরেশ্বেরের দিকে কেমন এক স্তিমিত আলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
সুরেশ্বর অপেক্ষা করল। নির্মলা ক্ষীণদৃষ্টি ছিল; সে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আসতে পারত না; পা ফেলে ফেলে চারপাশে দেখে অত্যন্ত ধীরে ধীরে আসত। আজ, এই মুহূর্তেও সুরেশ্বর যেন নির্মলাকে তার অভ্যাসমতন কাছে আসতে দিল।
নির্মলা কাছে এলে সুরেশ্বর তার মুখটি আর নিবিষ্ট চোখ লক্ষ করল; ওই মুখে এমন কিছু ছিল যা রূপ নয় অথচ যার আকর্ষণ রূপের অধিক। নির্মলাকে এখন এত স্পষ্ট ও একান্ত করে দেখতে পেয়ে সুরেশ্বর খুব খুশি হল।
নির্মলার সঙ্গে সুরেশ্বরের পরিচয়ের মধ্যে একটা আকস্মিকতা ছিল। সুরেশ্বর এখনও সেই পার্কের কৃষ্ণচূড়ার গাছটি যেন দেখতে পায়, যার তলায় কালবৈশাখীর ভয়ংকর ঝড়ের মধ্যে নির্মলা দাঁড়িয়ে ছিল।
তখন বৈশাখ, কলকাতা শহরের গাছপালা মাটি পথ যেন কয়েক দিন ধরে পুড়ে যাচ্ছিল; সারাদিন গুমট, কোথাও একটু বাতাস বয় না, গাছের পাতা নড়ে না। সেই দুঃসহ গ্রীষ্মে একদিন বিকেলের পর সুরেশ্বর পার্কে এসে বসে ছিল। আশেপাশে অজস্র মানুষ, বাতাসের আশায় পার্কে এসেছে, বসে আছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাবুগাছের পাতাগুলি নিশ্চল, বেড়া দেওয়া কলাফুলের ঝোপে একটিও ফুল নেই, আকাশ যেন সারাদিন পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে মাথার ওপর ভস্মতূপের মতন পড়ে আছে।
সুরেশ্বর মাটিতে মরা ঘাসের ওপর চুপচাপ বসে ছিল। গরমে তার নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ তার মনে হল, চারপাশে কেমন অদ্ভুত একটা থমথমে ভাব হয়ে এসেছে, সমস্ত বিশ্বচরাচর যেন এই সন্ধ্যার মুহূর্তে হঠাৎ কেমন অচেতন হয়ে গেছে, গাছপাতা কাঁপছে না, ধুলো উড়ছে না, পাখিদের স্বর স্তব্ধ, শূন্যতার মধ্যে শুধু অদ্ভুত এক শোষণ চলেছে, সমস্ত অবশিষ্ট আর্দ্রতাও শুষে নিচ্ছে। সুরেশ্বরের চোখ কান জ্বালা করছিল। গায়ের চামড়াও যেন কীসের আঁচ লেগে পুড়ে যাচ্ছে। …হঠাৎ, সন্ধের ঠিক মুখে একরাশ ধুলো উড়ে গেল। কেউ খেয়াল করেনি আকাশের এক কোণ ইতিমধ্যে সেজে উঠেছে। ধুলোর ঝাঁপটা থেমে যাবার পর পরই গাছের মাথায় পাতাগুলো কাঁপতে লাগল। বাতাস এল কয়েক ঝলক। তার পরই হু হু করে আকাশ ভাসিয়ে কালো মেঘ আসতে লাগল, অন্ধকার হল, ধুলোর ঝড় এল ঝাঁপটা মেরে। লোকজন ততক্ষণে পার্ক থেকে পালাচ্ছে। সুরেশ্বর উঠল না, আরও একটু অপেক্ষা করে যাবে। আসন্ন ঝড়টুকু গায়ে সামান্য মেখে নিতে তার আপত্তি নেই।
দেখতে দেখতে কালবৈশাখীর ঝড় এসে গেল। সাবুগাছের পাতার কুঁটি টেনে শনশন বাতাস বইছে, ধুলো উড়ছে, বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল। পার্ক তখন শূন্য। সুরেশ্বর কোনও রকমে চোখ বাঁচিয়ে চলে যেতে যেতে হঠাৎ দেখল পার্কের ফটকের কাছে কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায় একটি যুবতী মেয়ে দুহাতে চোখ মুখ আড়াল করে কোনও রকমে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে। চলে যেতে যেতেও সুরেশ্বর কেমন থমকে দাঁড়াল। তার মনে হল, মেয়েটি এত দুর্বল যে এই ঝড়ে পা বাড়াতে সাহস করছে না।
বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়তে শুরু করেছিল, তপ্ত শুষ্ক মাটি থেকে গরম ভাপ উঠছে, মাটির গন্ধ, গাছের ডাল বুঝি ভেঙে পড়বে। পার্কের দু-চারটি বাতি জ্বলতে জ্বলতে নিবে যাবার অবস্থা, আকাশে বিজলী।
সুরেশ্বর কৃষ্ণচূড়া গাছের কাছে এসে মেয়েটিকে সাবধান করে দিয়ে কী যেন বলতে গিয়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
নির্মলা ভেবেছিল তার দাদা প্রমথ এসেছে।
প্রমথ যতক্ষণে পার্কে এল ততক্ষণে সুরেশ্বর নির্মলাকে নিয়ে পার্কের উলটো দিকে এক ডাইংক্লিনিংয়ের দোকানের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
বৃষ্টির মধ্যেই প্রমথকে পার্কে ঢুকতে দেখে বোঝা গিয়েছিল মানুষটা বিভ্রান্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে এসেছে। নির্মলা বলেছিল : দাদা আসবে। অনেক কষ্টে প্রমথকে ডেকে নিতে হয়েছিল দোকানে।
ঝড়বৃষ্টি থেমে গেলে রিকশা করে যেতে যেতে পরিচয় হল। নির্মলা সামনের রিকশায়, পেছনে প্রমথ আর সুরেশ্বর।
প্রমথ বলল, ও চোখে খুব কম দেখে। আমার ভীষণ ভয় হয়ে গিয়েছিল।
সুরেশ্বর বলল, বলছিলেন বটে চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন না।
কী করে বুঝব, হঠাৎ এরকম কালবোশেখী উঠবে। …আমারই ভুল হয়েছিল ওকে এভাবে রেখে দিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি।
কোথায় গিয়েছিলেন?
বেশি দূরে নয়। ওর চশমার ডাঁটি খুলে গিয়েছিল, সারিয়ে আনতে গিয়েছিলাম।
উনি তাই বলছিলেন।
বিকেলে ওকে একেটু বেড়াতে নিয়ে এসেছিলাম। যা গরম, সঙ্গে করে না আনলে হয় না, বুঝলেন না…। তবু রক্ষে ও একলা পার্ক থেকে চলে যাবার চেষ্টা করেনি করলে নির্ঘাত গাড়ি চাপা পড়ত।
সুরেশ্বর কৌতূহল বোধ করলেও নির্মলার দৃষ্টিক্ষীণতার কথা তখন কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
প্রমথ নিজের থেকেই বলছিল, ঝড় উঠেছে প্রথমটায় আমি বুঝতেই পারিনি। দোকানটাও আবার সেই রকম, অন্দরমহলে প্রায়, ভেতরে বাড়ির মধ্যে ছিলাম, কিছু দেখাও যায় না, বোঝাও যায় না, তারপর যখন বুঝলাম, ছুটতে ছুটতে আসছি। ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, মশাই। …আপনার নামটা যেন কী?
সুরেশ্বর নাম বলল।
