গগন আবার বলল, মা বড় ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। মামা বলছিল, এভাবে দিদিকে এখানে রেখে দেওয়া যায় না। ..ওদের কোনও দোষ নেই। তুমি বুঝতে পারছ–দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছে, নানা দুর্ভাবনা নিয়ে থাকে। দিদির কথাটা তারা ভুলে থাকতে পারে না। হাজার হোক মেয়ে তো, তার একটা ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত মনে শান্তি পাবে না। গগন যেন এলোমেলোভাবে বলছিল।
সুরেশ্বর চায়ের কাপটা মাটিতে নামিয়ে রাখল। গগনের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত; তারপর বলল, হেম কি তোমাদের কিছু বলেনি, গগন?
না…, গগন মাথা নাড়ল, কী বলবে?
আমি ভেবেছিলাম কলকাতায় গিয়ে সে হয়তত কিছু বলবে মাসিমাকে।
আমি জানি না। গগন সুরেশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, দিদির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। কিন্তু সেটা তার কথা, তোমার তরফের কথা নয়।
সুরেশ্বর চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ, ভাবছিল; শেষে বলল, গগন, আমার আজকাল মনে হয়, আমি কয়েকটা বড় রকম ভুল করেছি। হেমকে এখানে টেনে আনা আমার উচিত হয়নি। সে যে-জন্যে এসেছে আমি তাকে সে-উদ্দেশ্যে আনিনি। এখানে আমার কাছে তাকে বরাবর রাখা যাবে না। তোমরা যা ভাবছ তা হয় না। তাতে আরও অশান্তি বাড়বে। আমার এমন কিছু নেই যাতে হেমকে আর আমি সুখী করতে পারি।
গগন যেন কিছু সময় কেমন দিশেহারা হয়ে বসে থাকল, ভাবতে পারছিল না, কথা বলতে পারছিল না। অদ্ভুত এক বেদনা এবং আঘাত তাকে নির্বাক করে তুলছিল। শেষ পর্যন্ত কোনও রকমে নিজেকে সামান্য সামলে নিয়ে গগন বলল, তোমার কিছু নেই?
না। সুরেশ্বর মাথা নাড়ল।
দিদিকে তুমি ভালবাসতে…
বাসতাম। কিন্তু সে-ভালবাসায় আনন্দ পাইনি…
গগন অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। রুক্ষ গলায় বলল, এতদিন পরে হঠাৎ তোমার সেই জ্ঞানটা হল নাকি?
না– সুরেশ্বর শান্ত গলায় বলল, না গগন, আগেই হয়েছিল। তুমি বিশ্বাস করবে না, তবে জীবনে হঠাৎ হঠাৎ কিছু হয়। বাইরে থেকে ওটা হঠাৎ, ভেতরে ভেতরে হয়তো হঠাৎ নয়। …একবার এক ঘটনা থেকে আমার মনে নানা সংশয়, দ্বিধা দুর্বলতা আসে। আমার মনে হয়েছিল–ওই ভালবাসায় আমার সুখ নেই, আনন্দ নেই।
তুমি শুধু নিজেকেই দেখছ।
সুরেশ্বর প্রতিবাদ করল না। সে নিজেকেই দেখছিল : যেন অতীতের কোনও ঘটনার সামনে সে দর্শক হয়ে বসে আছে।
৫. গগনের গলার স্বর
২১.
গগন অনেকক্ষণ হল চলে গেছে। যাবার আগে সুরেশ্বরকে কী যে বলেছিল সুরেশ্বর খেয়াল করে শোনেনি। গগনের গলার স্বর থেকে মনে হয়েছিল তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে; ক্রুদ্ধ, বিরক্ত হয়ে সে চলে গেছে। গগন আশা করেছিল সুরেশ্বর আরও কিছু বলবে, আশায় আশায় সে অপেক্ষা করেছে। সুরেশ্বর কিছু বলেনি। অস্পষ্ট, অসংলগ্ন দু-একটা মামুলি কথা যে যথেষ্ট নয়, এমনকী কোনও কৈফিয়তও নয়– গগন সম্ভবত সুরেশ্বরকে সেই কথাটা উচ্চস্বরে জানিয়ে চলে গেছে।
গগন চলে যাবার পর সুরেশ্বরও আরও কিছু সময় একই ভাবে বসে থাকল। গগনের শূন্য আসন, গগনের রেখে যাওয়া চায়ের কাপ তার চোখে পড়ছিল; অথচ গগনের কথা সে ভাবছিল না। গগন অসন্তুষ্ট হয়েছে একথা বুঝেও যেন সে চঞ্চল নয়।
পৌষের রাত যে কতটা হয়েছে সুরেশ্বরের খেয়াল ছিল না। ভরতুর বদলে অন্য কে যেন ঘরে এসে রাতের খাবার রেখে গেল। সুরেশ্বর অন্যমনস্কভাবে লক্ষ করল, গগনের টেনে আনা চেয়ার পাশের ঘরে রেখে, চায়ের কাপ ধুয়ে মুছে লোকটা চলে গেছে।
শেষ পর্যন্ত সুরেশ্বর উঠল। বাইরের ঘরে দরজা ভেজানো, বাতি জ্বলছে, টেবিলে এলোমেলো কাগজপত্র। দরজা বন্ধ করল সুরেশ্বর; খোলা জানলা দিয়ে কনকনে ঠাণ্ডা ঢুকছে, জানলাটাও বন্ধ করল। কাগজপত্র গুছিয়ে, বাতি নিবিয়ে ভেতরের বারান্দায় এল। বারান্দার একপাশে ছোট কলঘর, জলে হাত দেওয়া যায় না। চোখ মুখ ধুয়ে সামান্য আরাম পাওয়া গেল, গলাটা কেন যেন জ্বালা করছে।
শোবার ঘরে ফিরে এসে সুরেশ্বরের মনে হল, গগন যেন একবার তাকে কী একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিল। কী কথা? কথাটা মনে করতে পারল না সুরেশ্বর, তবে অনুমান করল গগন তার কথায় সন্দেহ প্রকাশ করে তার স্বার্থপরতা সম্পর্কে কোনও একটা কটু মন্তব্য করেছিল।
টাইমপিস ঘড়িটাতে রাত দশটা বেজে গেছে। অন্যদিন এসময় তার খাওয়া-দাওয়া হয়ে যায়। আজ কেন যেন আর খেতে ইচ্ছে করছিল না। দুধটুকু সুরেশ্বর খেয়ে নিল।
ঘরের জানলা ভেজিয়ে সুরেশ্বর তার বিছানার মশারিটা টাঙিয়ে ফেলল। গগন কি রাগ করে কলকাতায় ফিরে যাবে? কথাটা হঠাৎ মনে হল সুরেশ্বরের। পরক্ষণেই আবার মনে হল, হেমও কি হঠাৎ গগনের সঙ্গে চলে যাবে?
লণ্ঠনটা নিবিয়ে দেবার আগে সুরেশ্বর তার টর্চটা খুঁজে নিল, নিয়ে বাতি নিবিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।
ঘন অন্ধকারের মধ্যে কিছুক্ষণ চোখের পাতা বন্ধ করে থেকে সুরেশ্বর যেন নিজেকে শিথিল করে রাখল, স্রোতে গা ভাসানোর মতন তার মন ও চিন্তাকে যত্রতত্র ভেসে যেতে দিল। অথচ সামান্য পরেই সুরেশ্বর অনুভব করল কোনও স্থায়ী ক্ষতের বেদনার মতন তার মন ঘুরেফিরে সেই একই চিন্তার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। চোখের পাতা খুলে অন্ধকারে তাকাল সুরেশ্বর, গভীর অন্ধকারে দৃষ্টি যেন আরও নিখুঁত হয়ে সেই একই বিষয়ের ছবিগুলি সাজিয়ে নিচ্ছে। গগনের সামনে যাকে স্পষ্ট করে দেখতে পায়নি সুরেশ্বর, যে অত্যন্ত ধূসর হয়েছিল, অতি ম্লান, এখন সে অতি স্পষ্ট। মনে হল, নির্মলা তখন এমন কোনও স্থানে ছিল যেখানে অন্যের উপস্থিতির জন্যে তাকে স্পষ্ট করে দেখা যায়নি, এখন দেখা যাচ্ছে।
